আমার গুরুগণ: সাতষট্টি

প্রকাশিত: ১:৫২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২৪

আমার গুরুগণ: সাতষট্টি

মোস্তফা মোহাম্মদ

 

আজ তুমি জাগায়ে দিলা প্রভু,
জাগালে আমায়,
আমারই ভেতর সমুদ্র পাহাড় নদী তেপান্তর;

 

ক্ষুধাময় পৃথিবীতে সুধাময় সব,
হুতাশন সাগর অগ্নি সমান,
ভাসমান পানা-পতঙ্গ-জীবন ক্ষীয়মাণ;

 

অগ্নিস্ফূলিঙ্গ খেলে যায় বুকের ভিতর,
কামের কোদণ্ড শাখা আর প্রশাখার নরক;

 

আগুন তুমি নেভাতে পারো,
জ্বালিয়ে দাও সমধিক,
আমারই ভেতর তুমি,
আমি আছি,
তোমার-আমার-আমাদের জীবনের অধিক;

 

স্থূলদেহের আধারে,
আধেয়ের মধু করে যারা পান,
তিনি তো জ্ঞানী গুণী,
জগতের মানুষ হয়ে তিনি ততোধিক সম্মানিত,
আপনা-আপন;

 

—-পঞ্চ-ইন্দ্রিয় বাঁধনের মধ্য দিয়ে সূক্ষ্ম-জ্ঞান অন্বেষণ করার প্রক্রিয়াই সাধনা। সাধু-সন্ত বলে কোনোকিছু আলাদা নয়; কিংবা ব্যক্তির ব্যক্তিচরিত্র চরিতার্থ করা বড় কথা নয়, অথবা ব্যক্তিচিন্তা যখন ব্যক্তিগত সুখের বাইরে গিয়ে সামষ্টিক সুখের কথা মাথায় নিয়ে কাজ করে, তখন ব্যক্তি আর ব্যক্তি থাকে না; ব্যক্তি তখন সমষ্টির সম্পদে পরিণত হয়—দেহ থেকে দেহাতীতে যাবার পথ খুঁজে পায়।
এই সাধনার আরেক নাম জীবন, অর্থাৎ জীবনসাধনা; জীবনব্যাপী যিনি তার কর্ম এবং চিন্তা দ্বারা সার্বক্ষণিক সাধনায় নিমজ্জিত থাকেন তিনি মানবের নদীতে মহত্বের ধীবর, জীবনসাধক।

 

—মানুষের জীবনচেতনা নিয়ে দীর্ঘ ফিরিস্তিসহ জ্ঞানগম্যি বক্তব্য দিয়ে বসলো সুবোধ, বন্ধু ইসমাইলকে কাছে পেয়ে বহুদিন পর।
বক্তা আর শ্রোতা—সমানে সমান; এক গাছে দুই পাখি, অথবা দুই পাখির এক সুর। এই পাখিডা উইড়া যায় কেন?
কেন যায় উইড়া খাল-বিল-নদী-নালার উপর?

—-এই জীবনসাধনা কর্মের নিরিখে নানাকাণ্ডে বিভক্ত: আলোচনার সুবিধার্থে এবং ক্ষেত্রবিশেষে নানা বাদ-বিসম্বাদ তৈরি হয়েছে; ক্ষমতার নিমিত্তে হয়েছে দেশভাগ, স্বাধীনতা, পতাকা, কাঁটাতার: সমুদ্র-পাহাড়-নদীর বিভাজিত নাতিদীর্ঘ ইতিহাস। সর্বৈবভাবে বলতে দ্বিধা নাই যে, প্রকৃতি কিন্তু একটাই, মানুষ তার অনুষঙ্গ—পৃথিবী একটাই, একই আকাশ, সীমাহীন শূন্যতায় ভরা আলোজলবায়ুর গতিময় লীলালাস্যের ইতিহাস। এই আলোটা কী? এবং কেন?

—-নানাবিধ চিন্তা এবং বিষয়ের দোলাচালে চেয়ারে বসে ইসমাইল যখন ভাবনায় প্রায় ডুবে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনি সুবোধ কলপাড় থেকে স্নান সেরে বেরোতেই ইসমাইলের চোখে চোখাচোখি হয়। কাকীমা সকালের নাস্তা প্রস্তুত করে রেখেছিলো আগেই। খাবার টেবিলে কাকীমার আহ্বানে সাড়া দেয় দুইবন্ধু—একজন মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট আর অন্যজন হিতবাদী মুসলমান। দুইজনেরই সাধনার একক মানুষ এবং মানবতা; একজন পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রোজা করে এবং কোরান তেলায়াত করে কৃষিকাজের উন্নতির মাধ্যমেই মানুষের জীবনের উন্নতি চায়; আর অন্যজন হিন্দুর ঘরে জন্মানো সাম্যবাদী কম্যুনিস্ট—হিন্দু-মুসলমানই শুধু নয়, অবিভক্ত ভারতবর্ষের সরকার-রাষ্ট্র-রাজনীতি সকলেরই চোখের বিষ এই সুবোধ।

 

ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো কমরেড সুবোধ লাহিড়ী আজ যমুনার চর এলাকার লুকিয়ে বেড়ানো জীবনের ইতি টানিয়ে সারিয়াকান্দি থানার চন্দনবাইশা ইউনিয়নের চানবাড়িয়া গ্রামের ইজতুল্লা পরামাণিকের বাড়ি হয়ে গোসাইবাড়ি, সরাপাড়া, শিমুলিয়া পাড়ি দিয়ে নিমগাছির পেছনে এসে বাঙ্গালী নদীতে অপেক্ষাকৃত পাঠবোঝাই নৌকায় উঠে বসে শেরপুরের কথা মাথায় রেখে; অপেক্ষা করছে সুবোধের মা।

 

সুবেহ-সাদিকের সময় ধুনটের বেড়েরবাড়ি না হেউট নগর গ্রামের পাটের ব্যাপারি হেকমতুল্লা পরামানিকের নৌকায় করে সারারাত পর বাঙ্গালী নদীর ধারা বেয়ে ক্যাশপাথারের খালবিল পার হয়ে বগুড়া শহরের দক্ষিণে মাদলার কাছে এসে করতোয়ার ধারে মিশে ভাটির টানে শেরপুর থানার গাড়ীদহ ইউনিয়নের কানুপুরের বাঁকে এসে নেমে পায়ে হেঁটে শেরপুর শহরের উলিপুর মসজিদ-সংলগ্ন মায়ের বাড়িতে মুখ লুকায় সুবোধ।

 

‘মানুষ আসলে সৃষ্টিকর্তাকেই পাওয়ার সাধনা করে, যদি সেই মানুষটি প্রকৃত মানুষ হয়’
—সুবোধ আর ইসমাইল যখন নাস্তার টেবিলে ঘিয়েভাজা পরোটা, আলুর কচুরি, ডিমসেদ্ধ আর পায়েস যোগে নাস্তা সারছিলো, তখন কাকীমা অর্থাৎ সুবোধের মা প্রশ্নটি আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে পাশে বসে দুই পুত্রের খাওয়া দেখে পুলকিত হয়।

পায়েসের বাটি থেকে চামচে পায়েস তুলে ঠোঁটের আগা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই সুবোধ আর ইসমাই একসাথে বলে ওঠে: ‘সেই প্রকৃত মানুষটা কে এই দুনিয়ায়?
কেমন দেখতে সেই প্রকৃত মানুষ?’

—-আলোচনা-পর্যালোচনা জমে ওঠে বেশ; সুবোধের মাথায় পুলিশি চাপও কম নয়, যদি ধরা পড়ে যায়, তবে তো নাকাল অবস্থা হবে সুবোধ আর ইসমাইলের।

 

নাস্তা শেষে চা-পানের এক ফাঁকে সুবোধ আর ইসমাইল ব্যক্তিগত আলাপে মেতে ওঠে। আর কাকীমা ইসমাইলকে দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে বলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

 

প্রায় সাড়ে তিনমাস পর দেখা হলো দুইবন্ধুর। জামালপুর-না-শেরপুরের রবি নিয়োগী, নেত্রকোণার কমরেড মণি সিংসহ—স্বাধীনতাযোদ্ধা কমরেডদের প্রসঙ্গে একটানে বলে যায় সুবোধ।
পুবের ধুনট, কাজীপুর, বরশিভাঙ্গা, রয়াদহ, কামালপুর ইত্যাদি গ্রামের ধানক্ষেতের আইল, পাটক্ষেতের গুমোটের এবরো-খেবরো লুকানো জীবন; কৃষকদের সাথে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে, মাথাল মাথায় দিয়ে, কাঁচি-পাঁচুন দিয়ে ধানকাটা, পাটক্ষেত-ধানক্ষেত নিড়ানি দেওয়ার বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সুবোধ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে বাংলার মানুষের জন্য।