আমার মানুষ সত্তা  না বিলীন হয়ে যায়

প্রকাশিত: ১:২৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২১

আমার মানুষ সত্তা  না বিলীন হয়ে যায়

কাবেরী রায় 

ক’দিন থেকে মনটা এত খারাপ হয়ে আছে যে সবকিছু অর্থহীন মনে হচ্ছে ।কেন এত বিরোধ? কেন এত জিঘাংসা? আমরা মানুষেরা কতভাগে বিভক্ত ! নৃতাত্ত্বিক,ভৌগলিক,ধর্ম ,সাদা/কালো,আর কত বিভক্তি?
ধর্মীয়গ্রন্থ বোঝার মত মেধা,গভীরতা আমার নেই তাই মানবধর্মকেই বেছে নিয়েছি জীবন চলার পাথেয় হিসেবে, পরিবারের শিক্ষাই ছিল তাই।
একটা ঘটনা আজ খুব মনে পরছে-আমার বাবা গুরুদীক্ষিত হবার পরে গুরুদেবকে বলেছিলেন শুক্রবারে উনি কোন ব্রত বা নিরামিষ খেতে পারবেন না কারণ ঐদিন তাঁর মুসলিম ছাত্রদের বিয়ের অনুষ্ঠান থাকে, ওখানে আশীর্বাদ করতে যেতে হবে কাজেই না খেয়ে আসাটা সমিচীন হবেনা এবং তাই করেছিলেন আজীবন । যদি না ওইদিন দূর্গা পূঁজা,মহোৎসব (কীর্তনের) না থাকতো।এই ছিল তাঁর জীবনবোধ । আবার নাম সংকীর্তন করা নিয়ে ছিলেন খুবই আবেগতাড়িত।
এই দুই ধারার,চিন্তার মধ্যেতো কোন বিরোধ ছিলনা , সহজভাবেই জীবনটা চালিত করেছিলেন তাই পেয়েছিলেন সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বাবার তৈরী করা এই আবহেই আমি বেড়ে উঠেছি । আত্নীয়তার অকৃত্রিম বন্ধন তৈরী হয়েছে (বাবা,মা,ভাইয়ের তৈরী করা সম্পর্ক ) হিন্দু/অহিন্দু সবার সাথে সমান ভাবে , যা এখনও চেষ্টা করছি ধরে রাখতে কারণ আমি তো তাদের স্মৃতিচারণে,ভালোবাসাতে আমার বাবা-মা-ভাইকে খুঁজে পাই।
মৌলভীবাজার, ছোট্ট একটা শহর কিন্ত সামাজিক বন্ধন ছিল গভীর ,বিশাল যা আমার পরিবারের অভিজ্ঞতাতে আছে কিন্ত আজ যখন শুনি এই শহরের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আতংকে দিন কাঁটাচ্ছে, রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে আতংক, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ।আমি আমার শহর নিয়ে চিন্তিত,উৎকণ্ঠিত ।এ তো আমার প্রিয় শহরের চিরচেনা চেহারা নয়।
আমি জানি আমার চারপাশে অসংখ্য অসাম্প্রদায়িক মানুষ আছেন যারা লেখা দিচ্ছেন প্রতিবাদ করছেন,লজ্জা বোধ করছেন, ধিক্কার জানাচ্ছেন ।আমি তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।আমি শাহ ফখ্রুল ইসলাম আলোকের লেখা পরে আশাবাদী হয়ে উঠি । সে লিখেছে “হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা যেখানে বসবাস করেন, সেই এলাকার স্থানীয়রা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। ভাইয়ের মত পাশে দাঁড়ান।
এটিই সর্বোত্তম সমাধান।”
কিন্ত আমাকে কষ্ট দেয় যখন দেখি চলমান এই কদর্য সামাজিক পরিস্থিতি যে অন্যায়,অমানবিক এই সত্যটা যারা নিতে পারছেন না । নানা অজুহাতে জাস্টিফাই করছেন এমনকি বিভিন্ন প্লাটফরম থেকে যে প্রতিবাদ হচ্ছে সেটা শুনতেও তাদের ভালো লাগছেনা,আমি তাদের এই মানসিকতাকে ভয় পাই । এই যে পারষ্পরিক অবিশ্বাস,সন্দেহ তৈরী হচ্ছে এটা কিসের অশনি সংকেত? এমনিতেই করোনা পরিস্থিতি মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে তার মধ্যে এই সহিংসতা যোগ করেছে আরো দূরত্ব যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংস্কৃতি গঠনে ধর্ম একটা উপাদান মাত্র । একমাত্র নয়।
আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখতে চাই কিন্ত ক্রমশ হিন্দু হয়ে উঠছি, সে তো আমি চাইনি।ধর্ম মানুষকে শুদ্ধতার চর্চা করতে শিক্ষা দেয় সত্য কিন্ত একটা মানুষ তার চারপাশ যেমন পরিবার, প্রতিবেশ থেকে গ্রহণ করে নিজেই নিজের শিক্ষক হতে পারে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে এটাই আমার বিশ্বাস ।
আমরা সমাজে বাস করি,বিচ্ছিন্ন কোন দ্বীপে নয় যেখানে একে অন্যেকে প্রভাবিত করি জানতে/অজান্তে । তাই ভয় পাচ্ছি, আমার মানুষ সত্তা  না বিলীন হয়ে যায় । আমি তো তা চাইনা।

 

কাবেরী রায়  ঃ শিক্ষক , প্রবাসী 

ছড়িয়ে দিন