আমার মাস্টারমশাই

প্রকাশিত: ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৫, ২০২৩

আমার মাস্টারমশাই

 

 

– কাজী তামান্না

 

আমরা ভাইবোনেরা আমাদের শৈশব এবং কৈশোরে এমন একজন মানুষকে গৃহশিক্ষক পেয়েছিলাম যাঁকে ”মাষ্টারমশাই” বলে ডাকতাম তিনি আমাদের শুধু সুশিক্ষা দেননি, আমাদের চিন্তাধারা, বোধ, মানসিকতাকে তীক্ষ্ম এবং শুদ্ধ করে তুলতে সাহায্য করেছেন, যার ঋণশোধ করা যায় না।

সেই ১৯৫৫ সালের জুলাই অথবা আগষ্টে প্রথম দিকে একদিন আমাদের আব্বা সাংবাদিক সাহিত্যিক কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস সদ্য কারামুক্ত সন্তোষ গুপ্তকে বাড়িতে এনে বললেন আমাদের বড় তিন ভাইবোনকে পড়াবেন। স্যার না বলে কেন আমরা উনাকে মাষ্টারমশাই বলে সম্বোধন করেছিলাম জানি না। তারপর থেকে সন্তোষ গুপ্ত আমাদের পুরো পরিবারের মাষ্টারমশাই হয়ে গেলেন। মাষ্টারমশাই লম্বা পাতলা দেহের অধিকারী ছিলেন। একমাথা এলোমেলো চুল পাজামা শার্ট পড়ে আসতেন। অত্যন্ত সাধাসিধে মানুষ কোনকিছুতে বাহুল্য নেই। সেসময় মাষ্টারমশাই সদ্য জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।
মাষ্টারমশাই এসে বাড়িতে সুবাতাস বইয়ে ছিলেন। আমার দুই ভাইবোন কাজী মদিনা ও কাজী মোহাম্মদ শীশ লেখাপড়ায় ভালো লক্ষীমন্ত শিক্ষার্থী তাদের পড়াতে মাষ্টারমশাইয়ের বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু আমাকে পড়াতে গিয়ে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু আমিই মাষ্টারমশাইয়ের সবচাইতে আদরের ছাত্রী ছিলাম। মাষ্টারমশাইয়ের আপন বলতে তেমন কেউ ছিলো না। একমাত্র মা, তিনি তখন বরিশালে থাকতেন। ৫ বছর বয়সে বাবাকে হারান। তিনি ছিলেন বাবা মার একমাত্র সন্তান। মাসিমা, মাষ্টারমশাইয়ের মা অসম্ভব ধৈর্যশীলা সাহসী এবং আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মহিলা ছিলেন। অকাল বৈধব্য, অনটন তাঁকে কখনো নিজের জীবনবোধ থেকে টলাতে পারেনি। পুত্রকে কখনো আদর্শচ্যুত করার কথা ভাবেননি।

কারাগার থেকে মুক্তি পাবার পর কোথাও চাকরি না পাওয়াতে মাষ্টারমশাইকে প্রচন্ড আর্থিক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয় সেসময়েই আমাদের বাড়িতে ৪০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু তিনি অল্পসময়ের মধ্যেই আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেলেন। ’মাষ্টারমশাই’ ডাকটা এদেশ থেকে প্রায় বিলুুপ্ত হয়ে গেছে, এ ডাকটা আমি অন্যকারও কন্ঠে শুনিনা। এদেশের চেনাজানা অনেকেই জানেন- মাষ্টারমশাই বলতে সন্তোষ গুপ্তকেই বোঝানো হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ”মাষ্টারমশাই” গল্পে দেখানো হয়েছে অসমবয়সী ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে দারুণ শ্রদ্ধা ও ¯েœহের সর্ম্পক গড়ে উঠতে পারে। মাষ্টারমশাইয়ের সাথে আমার সেরকম সর্ম্পক গড়ে উঠেছিল। আগেই বলেছি আমার ভাইবোন খুব ভালো ও মনোযোগী ছাত্র ছিল আমি যেমন অমনোযোগী তেমনই দুষ্টু যে আমাকে পড়াতে খুব বেগ পেতে হতো। এখনও মনে আছে আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখে অংক শেখাতেন। ¯েœহের বসে রাগও করতে পারতেন না। তবু তাঁর হাতে দু-চারদিন পিটুনি খেয়েছি। ঠিকমত যাতে পড়াশোনা করি তাই পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে কাঁচা আম, তেতুল, কামরাঙ্গা, জলপাই এসব রেখে যেতেন। যাবার সময় চুপি চুপি বলে যেতেন যদি তার কথা শুনি তাহলে আরও দেবেন। ছাত্রীকে ঘুষ দিয়ে পড়ানোর উদাহরণ বুঝি আর নেই। সেসব কথা মনে পড়লে অবাক হয়ে যাই, আমরা কত অল্পতেই খুশী হতাম। একেবারে উজার করা শ্রদ্ধা ভালোবাসার এমন নিদর্শন খুব অল্প মানুষের জীবনেই ঘটে। পরবর্তী জীবনে ব্যস্ততার কারণে মাষ্টারমশাই তাঁর সন্তানদের কখনো পড়াতে পারেননি।
মাষ্টারমশাই আমাদের দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। আমি বেশ ছোট ছিলাম এই কৌতুহল আমার ছিল এত ভালো আমাদের মাষ্টারমশাই তাঁকে কেন কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তিনি বুঝিয়ে বলতেন পরাধীন দেশে এমন কি স্বাধীন দেশেও সত্য ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রাষ্ট্র তথা সরকার যোদ্ধাদের বন্দি করে রাখেন। দেশের মঙ্গলের জন্য
তবু মানুষ সামনে এগিয়ে যাবার শপথ নেন। কিন্তু তার জন্য অনেক দাম দিতে হয়। বড় হয়ে ধীরে ধীরে সেই উপলব্ধি গাঢ় হয়েছে এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের মুক্তিপাগল যুবসমাজকে অকাতরে প্রাণবিসর্জন দিতে দেখেছি। যুদ্ধে নিজেও অংশ নিয়েছি। আমাদের চরিত্রগঠনে মাষ্টারমশাই এর অবদান কখনো ভুলিনি। তিনি দেশ বিদেশের নানারকম বই পড়ানো অভ্যেস করিয়েছেন। একটু বড় হয়ে পড়েছি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শিলালিপি, মনোজ বসুর ভুলি নাই ,তারপর ধীরে ধীরে বই পড়ার অদম্য ইচ্ছা তৈরী হয়েছে যা আজও নেশার মত আঁকড়ে আছে। এত বড় সৌভাগ্য সহসা কারও জীবনে আসে না। এ যুগে তো তা কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। মাষ্টারমশাইয়ের কাছে আনন্দের খোরাকও আমরা পেতাম। পূজার সময় পূজামন্ডবে প্রতিমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। তখন ঢাকা শহর এমন ঘিঞ্জি, এত গাড়ি, এত মানুষজন ছিল না। সুন্দর ছিমছাম গাছের ছায়ায় কেমন একটা ভালো লাগার শহর ছিলো। রিকশা করে যাওয়া আসা করার কোন অসুবিধা ছিল না। বুড়িগঙ্গার পানি ছিল বিশুদ্ধ টলটলে। নদীকে চুরি করার বাসনা তখনও কারো মনে জাগেনি। মাষ্টারমশাই সেই বুড়িগঙ্গায় আমাদের প্রতিমা বিসর্জন দেখাতে নিয়ে যেতেন। সেকি নির্মল আনন্দ! শুধু আনন্দ আর কিছু না। আমাদের অসীম সৌভাগ্য আব্বা আম্মা বড়মাপের মানুষ ছিলেন এসবে আপত্তি করতেন না। নৌকায় চলেছি চারিদিকে ঢাকের আওয়াজ আর কিছুক্ষণ পর পর প্রতিমা বিসর্জনের পর্ব। নদীর পাড়ে মেলা বসতো। সেখান থেকে কদমা, বাতাসা মুরালি আরো কত কিছু কিনে রাত করে বাড়িতে আসতাম। সেসব দিনের কথা কি ভোলা যায়। তিনি নিজেকে ¯েœহ ভালোবাসার বন্ধনে এমনই বেঁধেছিলেন যে ঝড় বাদল বন্যা কোন কিছুই তাঁকে আটকে রাখতে পারতো না। এমন নির্ভেজাল ¯েœহ ভালোবাসার মূল্য আমরা ভাইবোনেরা আজীবন মাষ্টারমশাইকে দিয়ে এসেছি।
মাষ্টারমশাই ঝড়ের বেগে বই পড়তেন। মনে হতো এত তাড়াতাড়ি পড়ে কি তেমনভাবে মনোযোগী হতে পারেন। কিন্তু আর্শ্চয পড়া বইয়ের যে কোন জায়গা থেকে তিনি উদ্ধৃতি দিতে পারতেন। মাথাতো নয় যেন কম্পিউটার! এমন অসাধারণ স্মরণশক্তি খুব কম মানুষেরই থাকে।
২০০৪ সালের ৬ই আগষ্ট মাষ্টারমশাই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। মাষ্টারমশাইয়ের এত ¯েœহ পেয়েছি আমার মনে হলো আমি আরেকবার বাবাকে হারালাম।