আমার রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত: ১:০৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৫, ২০১৮

আমার রবীন্দ্রনাথ

হিমাদ্রী রয় সঞ্জীব
আমাদের সবার অন্তরদ্বীপে একজন অন্তরঙ্গ রবীন্দ্রনাথ বাস করেন। ছেলেবেলার বৈশাখের ছোটনদীর বাঁকে বাঁকে ছুটে চলা রবীন্দ্রনাথ, দূরন্ত মানেনা শাসন, করিলে বারণ মাসী এসে অশ্রুজলে ভাসায় দুই নয়ন কূলে তাঁরে লয় টেনে। তখন মনে হতো রবীন্দ্রনাথ বুঝি আমাদেরই মতো। কৈশোরে সূর্যের আলো জানালা ভেদ করে স্বপ্নভঙ্গের আলোকিত সকালে নেচে ওঠে প্রাণ, খুলে দেয় দোর। দেখে, কথায়, গানে, সুখে, সাধে প্রাণ হয়ে আছে ভোর। ফেলে আসা এই সময়ের দিকে ফিরে তাকালে দেখি সেই বয়সটায় আমরা আর রবীন্দ্রনাথ পিঠেপিঠি বেড়ে উঠেছি। যৌবনের মধুমাসে পলাশ বন রাঙা হলে, মল্লিকা বনে কলি ফুটার সময়, মন ময়ুরি ঘুরে ফেরতো মনের খুঁজে। ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফুটে, ফুল বনে, তারি মধু কেন মন মধুপে খাওয়াও না’। যদিও এর মূল ভাবটুকু জানতে সময় লেগেছে। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের নিত্য মেলামেশা চলাফেরা।
জীবনে যা হারাবার তা চলে গেলেই দামী হয়ে উঠে আমাদের কাছে। দেয়ালের ফ্রেমে ছবি হয়ে থাকা প্রিয় মুখেদের কথা যখন মনে পরে সেখানেও রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ের তানপুরার ধুলো উড়ায়। ‘যখন জমবে ধূলা তানপুরাটার তারগুলায়,
কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়, আহা, ফুলের বাগান ঘন ঘাসের পরবে সজ্জা বনবাসের, শ্যাওলা এসে ঘিরবে দিঘির ধারগুলায়-
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে’। ভাবে, রসে, সুখে, শোকে, আমাদের জীবনের প্রতিটি অনুভূতিতে, হৃদয় মন্দিরে গোপনে, পরম মমতায় যে মানুষটি আমাদের হাত ধরে বসে আছেন তিনি রবীন্দ্রনাথ। জীবনের নির্মল আনন্দ কিংবা গভীর বেদনায় যে মানুষ কখনই ছেড়ে যান না, তিনি রবীন্দ্রনাথ। সমাজের বেড়াজাল ভেংগেচূরে, প্রেরণা যোগান রবীন্দ্রনাথ। বিদ্রোহী নারী হৃদয়কে, হৃদয়হীন সংসারে দেখিয়েছেন মুক্তির পথ, রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যকে যিনি মাটি আর মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিশ্বমৈত্রীর মধ্যদিয়েই বিশ্ব মুক্তি সম্ভব। বিশ্বজুড়ে মানব ঐক্য প্রত্যাশা করেছেন যিনি, তিনি রবিন্দ্রনাথ। তিনি বাঙালির একার নন, তিনি বৈশ্বিক।
কেবল আমরাই রবীন্দ্রচর্চা করবো বলে যারা চাউর করেন এতে রবীন্দ্র প্রেম কম, স্তাবকতা বেশী প্রকাশ পায়। কিছু বিদ্যাবোঝাই জ্ঞানীরা বরাবরই রবীন্দ্রনাথকে এলিটশ্রেণির প্রতিনিধি করার চেষ্টা করে আসছে যুগ যুগ ধরে। সাধারণ ব্রাত্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা কখনই চেনাতে চান না। সত্যিকারের রবীন্দ্র অন্বেষীদের সাক্ষাতকার থেকে পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথের ভিত্তি ছিল মৃত্তিকাবর্তী মানুষ। রবীন্দ্রনাথ জনগণমনের অধিনায়ক। সুবিধাবাদী আঁতেল শ্রেণী ও রবীন্দ্র মৌলানা, এই অর্থে যে এরা, কে রবীন্দ্রচর্চা করবে, কে করবেনা বলে ফতোয়া দিয়ে বিভ্রান্ত করে। রবীন্দ্রচেতনাকে সাধারণের মাঝে পৌঁছে দিতে এরা ভয় পায় কারণ রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের মাঝে অভয়মন্ত্র দীক্ষা দেন। রবীন্দ্রচর্চা বিশ্বব্যাপী দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে কারণ তীব্রভাবে স্বাদেশিক হয়েও রবীন্দ্রনাথ বৈশ্বিক। ভবিষ্যতের বিশ্বমানুষ রবীন্দ্রনাথকে আরও নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করবেন কারণ তাঁর কাছে আছে বিশ্বসঙ্কট থেকে মুক্তির পথ। যুগযুগ ধরে যিনি গেয়ে গেছেন মানুষের জয়গান, জীবনের জয়গান, তিনি হলেন বিশ্বমানবতার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কালের কালো পাহাড় এসে যদি সমস্থ ঠাকুরের প্রদীপ কখনো নিভিয়ে দিয়ে যায়, একটি ঠাকুরের প্রদীপ থাকবে আমাদের মাটির সাথে গাঁথা। আর এর নাতা জুড়া থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। তিনি আমার, আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

‘শুধু তোমার বাণী নয় গো, হে বন্ধু, হে প্রিয়,
মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিয়ো ॥
সারা পথের ক্লান্তি আমার সারা দিনের তৃষা
কেমন করে মেটাব যে খুঁজে না পাই দিশা–
এ আধার যে পূর্ণ তোমায় সেই কথা বলিয়ো ॥
হৃদয় আমার চায় যে দিতে, কেবল নিতে নয়,
বয়ে বয়ে বেড়ায় সে তার যা-কিছু সঞ্চয়।
হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো, দাও গো আমার হাতে–
ধরব তারে, ভরব তারে, রাখব তারে সাথে,
একলা পথের চলা আমার করব রমণীয় ॥

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com