আমি কখনো সৌজন্য কপি নেই না এবং দেই না

প্রকাশিত: ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

আমি কখনো সৌজন্য কপি নেই না এবং দেই না

শবনম চৌধুরী 

অনেক পাঠক আছেন যারা লেখকের কাছে সৌজন্যকপির আবদার করেন । চেনাজানা গন্ডির মোটামুটি ভালো সম্পর্কের হলে তো কথাই নেই ! মানুষগুলো যখন সৌজন্যকপি দাবী করেন তখন লেখককে বিরাট ফাঁপরে পড়তে হয় । লেখকের জন্য পরিস্থিতিটা ভীষণ বিব্রতকর । না পারেন গিলতে আবার না পারেন উগড়াতে । প্রকাশনীর দায়িত্বে করা বইগুলো থেকে অর্থাৎ যে সকল লেখক রয়্যালিটি পান তাঁরা নিজেরা সৌজন্যকপি হিসেবে পান মাত্র ১০ — ১৫ কপি । আর যারা টাকা খরচ করে নিজ দায়িত্বে প্রকাশ করেন তাঁদের বেলায় ব্যাপারটি আরো জটিল । পাঠকের বোঝা উচিৎ — একজন লেখকের মেধা, নিষ্ঠা, শ্রমের তুলনায় বইয়ের মলাট মূল্য নিতান্তই সামান্য । এই ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের সম্মান এবং লেখকের সম্মানকে আপসহীনভাবে গুরুত্ব সহকারে দৃঢ় করা প্রত্যেক পাঠকের কর্তব্য ।

আমি কখনো সৌজন্য কপি নেই না এবং দেই না । এবারের বইমেলায় সতীর্থ একজন বড়ভাইয়া তাঁর নিজের বই আমার প্রকাশনীতে এসে আমাকে গিফট করতে চাইলে আমি শর্ত দিয়েছিলাম বইটি গ্রহণ করতে হলে মূল্য পরিশোধ করে গ্রহণ করবো । তিনি প্রথমে টাকা নিতে রাজী না হলেও আমার জেদ দেখে পরে বাধ্য হয়ে টাকা নিয়েছেন । অথচ আমার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে উনার বই মূল্য দিয়ে আমি সংগ্রহ করলেও তিনি কিন্তু আমার বই কিনেননি । আমিও সৌজন্যকপি দেইনি । তাই বলে আমাদের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কে ভাঁটা পড়েনি মোটেও । এই একটি ব্যাপারে ( সৌজন্যকপি লেনদেন ) প্রত্যেক লেখককে আমার মতো আপসহীন হতে হবে । কে বই নিলো আর কে নিলো না সেটি মূখ্য না । এখানে পাঠক লেখক উভয়েই যার যার স্থানে নিজেদের সম্মান বজায় রেখে আপোষহীন হওয়া উচিৎ । অন্য কেউ যদি লেখকের বই কিনে কাউকে গিফট করেন, তবে তা নিঃসন্দেহে গিফটদাতার উদারতা এবং দৃষ্টান্তমূলক বইপ্রীতি বলা যেতে পারে । সে ভিন্ন ব্যাপার । অনেক লেখক আছেন যারা পাঠকের উল্টোপাল্টা রিভিউ দেয়ার ব্যাপারে ভীতচিত্ত হয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে সৌজন্যকপি দিয়ে থাকেন । কিন্তু লেখককে মনে রাখা উচিৎ, যে সত্যিকারের পাঠক সে কখনো হুটহাট করে বিরূপ রিভিউ দিবে না । বইটি যদি পাঠকের ভালো নাও লাগে তবে সেখানেও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে রিভিউ দিয়ে পয়েন্ট হিসেবে কোথায় কোথায় বইটি আরো ভালো হতে পারতো কিংবা কোন অংশটুকু সত্যিই চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে সেভাবে লিখে নতুন লেখককে সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করা উচিৎ। ধরেই গোঁড়ায় কেটে দিয়ে নতুন লেখকের লেখার ইচ্ছেটুকু শেষ করে দেয়ার ব্যাপারটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় । অনেকে বেশ আক্রমণাত্মক রিভিউ / পাঠ-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে লেখককে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে পারলে দাফনকার্যও সফলতার সাথে সম্পন্ন করে ফেলেন । এতে কিন্তু সেই রিভিউকারী / পাঠ-প্রতিক্রিয়াকারী নিজেকে নিজে অসম্মানিত করার জন্য যথেষ্ট । রিভিউকারীকে নিরপেক্ষ এবং কৌশলী হতে হবে । বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যেকোনো লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই খুব একটা মানসম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকা স্বাভাবিক । রিভিউদাতা কিংবা পাঠককেও সেটা বুঝতে হবে । তাছাড়া সকল পাঠকের রুচি সমান না । সেক্ষেত্রে লেখককে সমালোচনা সহ্য করার মতো উদার হতে হবে । সমালোচনার ভালো-মন্দ উভয় দিক আছে । কিন্তু ভুল ধারণাবশত সমালোচনা মানে অনেক সমালোচনাকারী মনে করেন নেগেটিভ এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে পাঠ-প্রতিক্রিয়া উপস্থাপন করার নামই সমালোচনা । আরে, সমালোচনা কাকে বলে সেটাইতো এরা বুঝেন না !!! তাই লেখকদের প্রতি অনুরোধ রইলো এই টাইপের সমালোচনাকে কক্ষনো গুরুত্ব দিবেন না প্লিজ ।

পরিশেষে বলবো — পাঠ-প্রতিক্রিয়া অথবা রিভিউ এর বেলায় পাঠককে স্বজনপ্রীতি দোষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকতে হবে । এতে লেখক পাঠক উভয়ের জন্য কল্যাণকর । কেনোনা, যে লেখকের বই আজ ফালতু বলতে এতোটুকুও দ্বিধা করছেন না, কোনো একসময় সেই লেখকের কোনো না কোনো একটি গ্রন্থ হয়তো বাংলা সাহিত্যের রেনেসাঁ হিসেবে বিস্ময়কর অবদান রাখার জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখা অস্বাভাবিক কিছু নয় ।