আলোকিত ভুতুড়ে নগরী

প্রকাশিত: ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০২০

আলোকিত ভুতুড়ে নগরী

: সৌমিত্র শেখর

ভূতের সঙ্গে যে অন্ধকারের সম্পর্ক থাকবেই, একথা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। তা না হলে, আজ রৌদ্রকরোজ্জ্বল ঝকঝকে গোটা একটি নগরীকে কি ভুতুড়ে-ভুতুড়ে লাগে? অ-মানবের সঙ্গেই বরং ভূতের সম্পর্ক।প্রায় দুকোটি লোকের একটি শহরে যখন দুজনকেও দেখা যায় না, জীবন্ত শহর তখন নিমিষেই ভুতুড়ে হয়ে যায়। ভূত আর মানবের বিরোধ আসলে চিরন্তন।

জীবনে বহু বার ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়ায় গাড়ি রেখে বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁচেছি, বহু দিন গেছে স্থির দাঁড়িয়েও থেকেছি! যে রাস্তায় এমনটি হয়েছে, ঐ একই রাস্তা ‘পিক আওয়ার’-এ যখন দেখি নিঃশব্দ আর নির্বিকারে পিঠে রোদ পোহাচ্ছে, কালেভদ্রে পিঁপড়ের মতো সেখান দিয়ে যাচ্ছে একটি-দুটি গাড়ি, তখন ভয়ই জেগে ওঠে মনে; চিমটি কাটতে ইচ্ছে হয় নিজের গায়ে, সত্যি ‘আছি’ তো? ঢাকাকে এতোটা শূন্য দেখবো ভাবিনি, এতো দিন ধরে দেখবো সেটাতো নয়ই। আজ মনে হচ্ছিল, সত্যি যেন ভুতুড়ে পুরীতে ঢাকা পড়ে আছি!

এর আগে ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে ১/১১র সময় বিশ্ববিদ্যালয় যখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখন ক্যাম্পাসটি ছিল এমন। এখনতো গোটা ঢাকা শহর– না না, গোটা দেশ, বিশ্ব! সেই ১/১১র সময় আমি থাকতাম জগন্নাথ হলের একেবারে ভেতরে। চারিদিকে ছিল ছেলেদের আবাসিক ভবনগুলো। যেখানে প্রতি সন্ধ্যায় আলো জ্বলতো, হঠাৎ এক দিন সেখানে অন্ধকার নেমে আসে। তখন আমার নিজেকে মনে হয়েছিল ‘ক্ষুধিত পাষাণে’র মেহের আলির মতো। দিনে বা রাতে যখন বের হতাম, মনে হতো, ছাত্ররা এই বুঝি হলে (হস্টেল) ফিরলো! এ নিয়ে দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় একটা গদ্য লিখেছিলাম সে সময়। যাঁরা পড়েছিলেন, বলেছিলেন: ‘দারুণ’। এখন সেই ক্যাম্পাসেই থাকি কিন্তু শিক্ষক আবাসনে। ফলে, চারদিকের ভবনগুলো একেবারে আলোহীন থাকে না। কিন্তু আগে যেভাবে আলোময় ছিল, এখন সেই আলোতে আর চমক নেই।

আমাকে আজ যেতে হয়েছিল ক্যাম্পাসের বাইরে; হ্যাঁ, বাধ্য হয়েই। মায়ের ওষুদ শেষের দিকে– এটাই প্রধান কারণ। শাহবাগের এত্তোগুলো দোকান– খোলা মাত্র দু-তিনটে! সবাই দোকানের সামনে রশি টানিয়ে রেখেছে, কেউ যেন ভেতরে ঢুকতে না-পারেন, বাইরে দাঁড়িয়েই পত্রপাঠ বিদেয় হোন। পরিচিত বলে আমাকে ওরা ভেতরে ঢুকতে দিলো। কিন্তু ওষুদ নেই সবগুলো। চেষ্টা করলো অন্য দোকান থেকে সংগ্রহ করতে। পারলো না। কারণ, সরবরাহ নিয়মিত নয়। আমাকে যে সব ওষুদ নিয়েই ফিরতে হবে; মায়ের জন্য পুরো এক মাসের ওষুদ। শেষে লাল্লুই ভরসা দিলো। ও না থাকলে বিপদই হতো। বিপত্তাড়ক এই লাল্লু! ওতে ভরসা করেই অবশেষে শাহবাগ, বাংলামোটর হয়ে, সার্ক ফোয়ারা দিয়ে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলকে ডানে রেখে রাসেল স্কয়ার হয়ে কলাবাগান ‘লাজফার্মা’য় এসে মায়ের জন্য পুরো মাসের ওষুদ পেলাম। ওফ্, শান্তি! তারপর সেখান থেকে নিউমার্কেটের সামনে দিয়ে পলাশিবাজার। ঐ মোল্লার দৌড়ের মতোই– শেষ পর্য়ন্ত কাঁচাবাজারে ঠাঁই! কিন্তু এই পরিচিত পথটুকু আমার কাছে বড্ড অচেনা মনে হয়েছে, ভূতের নগরী মনে হয়েছে গোটা ঢাকাকে। গত মাসের এই দিনেও গভীর অন্ধকারে ঢাকার যে রাস্তাগুলোতে হাজার হাজার মানুষ দেখেছি, রাত সাড়ে বারোটা-একটায় যে নগরীতে ট্রাফিক জ্যাম খেয়েছি, সেই ঢাকার এ কী অবস্থা? না, আমি ট্রাফিক জ্যামের জন্য হাপিত্যেশ করছি না– অনুশোচনা করছি মানুষবিহীন ঢাকাকে দেখে।

পলাশি কাঁচাবাজারে সবাই মুখ ঢেকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত কাজ সেরে নিচ্ছেন। বাজারে পরিচিত সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হলো চোখের; কেউ চোখ এড়িয়েও যেতে চাইলেন। আগে হলে দাঁড়িয়ে অন্তত কুশল জানা হতো। এখন অবশ্য কুশল কী? কেউ ভালো নেই, কেউ স্থির নেই। যে পলাশিবাজার বুয়েট আর সলিমুল্লাহ হলের ছাত্রদের পদচারণায় চুলোর উপরে চায়ের মতো বলকাতে থাকতো, এখন তা ভাঙা কাপে ঠান্ডা হওয়া জল! ওরা এখন অনুপস্থিত; যে যার বাড়িতে হয়তো। পলাশিবাজারের কি মনে পড়ে সেই বলকানো যৌবনদের, এখন, এই ভুতুড়ে নগরীতে?

মনে হয়, শুধু অন্ধকারেই ভয় নয়; আলোতেও ভয় আছে। যে আলোতে মানুষ না-থাকে, সে আলো আর অন্ধকারে তফাত কি? এমন আলোকিত ভুতুড়ে নগরীতে আর কতো দিন, হে করোনা রানি?!

৯ই এপ্রিল ২০২০

ছড়িয়ে দিন