আসুন আমরা আকাশ পানে তাকাই

প্রকাশিত: ১১:৫৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০২১

আসুন আমরা আকাশ পানে তাকাই

সুহেলী সায়লা স্বাতি

প্রতিবছর আমরা আয়োজন করে নারী দিবস পালন করি। এই দিবসকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক ভাবে “নারী”কে নিয়ে আলোচনা করি।নারীর চাওয়া-পাওয়া, অধিকার-বঞ্চনা, ক্ষমতায়ন নিয়ে কখনো কখনো চায়ের কাপেও ঝড় তুলি। অথচ এই অধিকার অর্জন করার পরিবেশ সত্যিই কিভাবে তৈরী করা যায় এই বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।আমাদের মতো দরিদ্র দেশে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামাজিকীকরণ প্রুক্রিয়ায় বেড়ে ওঠা নারীরা আসলে নিজের অধিকার সম্পর্কেই জানে না।তাই শুধু নারী দিবস পালনের দিকে মনযোগ না দিয়ে তৈরী করতে হবে এমন একটি পরিবেশ যেখানে নারী নিজেকে মানুষ হিসাবে তুলে ধরার ও পরিচিত হবার আঙ্গিনায় বিরাজ করবে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গুরুত্ব তখনই বৃদ্ধি পাবে যখন নারী তার সাথে ঘটে যাওয়া সকল অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে নিজেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। একই সাথে আমরা যদি আমাদের প্রথাবদ্ধ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমাদের সমস্ত ভয় আর লজ্জাকে পদদলিত করার পরিবেশ না পাই তাহলে সামনে এগিযে যাওয়া কঠিন হবে।এটাই সত্যি, নারী হয়ে কেউ জন্মায় না। সিমোন দ্যা বোভেয়ার এই ধারণার সাথে দ্বিমত করার কোন অবকাশ আমাদের নেই। কারণ সামাজিক পরিবেশ, দর্শন ,সংস্কৃতি, প্রথা-পদ্ধতির বেড়াজালই নারীকে বিকশিত হতে দেয় না।সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নারী ও পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন দৈহিক অববয় যদি আমাদের জীবন চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তবে তা দুঃখজনক। বরং নারী ও পুরুষের এই বিভেদের রাজত্ব আমাদের সমাজ সৃষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই গড়ে উঠেছে। নতুবা কখনোই কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হতো না –
“ছিনু বসে কোন এক পাশে
পথ পাদপের ছায়
সৃষ্টিকালের প্রত্যুষ হতে
তোমারি প্রতীক্ষায়।”

এই প্রতীক্ষার প্রহর প্রতিটি নর নারীর জীবনে আসে। অথচ এই আবেগঘন অধ্যায়ের পাশেই আমরা খুঁজে পাই নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র।এই প্রতীক্ষিত নারীর মুখই এসিডে ঝলসে দিচ্ছে পুরুষ। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে নারী কি পুরুষের প্রতিপক্ষ? পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই নারী কেন তবে বৈষম্যের শিকার? নারী দিবসকে কেন্দ্র করে এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনায় মুখর হই। তবে এই পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আমাদেরকে মূলত আলোকপাত করতে হবে ছেলে শিশু এবং মেয়ে শিশুর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার উপর।

যৌতুক প্রথা, বাল্য বিবাহ, কথায় কথায় তালাক, মেয়ের অনুমতি ছাড়া অভিবাবকদের বিয়ের সিদ্ধান্ত, সন্তান ধারণের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন, নারী পাচার, গৃহস্থালির কাজে নারীর শ্রমকে স্বীকৃতি না দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো নারীকে হীনম্মন্যতায় ভুগতে বাধ্য করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাই শুধু মাত্র ৮ই মার্চ এলেই সেমিনার, সভা, বাণী ,বিভিন্ন বিবৃতি দিয়ে নারীর জয়গান গাইবো তা কখনোই কাম্য নয়।
আমরা জানি জার্মান শ্রমিক নেত্রী ক্লারা জ্যাটকিন ১৯১০ সালে প্রথম নারী দিবস পালনের দাবী জানিয়েছিলেন। আরেকটু পিছনে তাকালে দেখবো ১৮৫৭ সালে নিউইর্কের একটি সূচ কারখানার নারী শ্রমিকরা কাজের সময় ৮ ঘন্টায় সীমিত করা, মজুরী বৃদ্ধি এবং কর্ম পরিবেশ উন্নয়নের দাবীতে ৮ই মার্চ আন্দোলনের শুরু করেছিলেন। আর এই ভাবেই নারী দিবসের যাত্রা শুরু।

কবিগুরু বলেছেন- যে পাখির ডানা সুন্দর ও কষ্ঠস্বর মধুর তাকে খাঁচায় বন্দি করে মানুষ গর্ব অনুভব করে ।একটু চিন্তা করলেই দেখবো নারীও তেমনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক খাঁচায় আবদ্ধ। যে খাঁচার দেয়াল তৈরী হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের লালিত শাসন এবং কুসংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা। আসুন আমরা আকাশ পানে তাকাই। ভেঙে দেই কুসংস্কার আর নারীর প্রতি লালিত হীন মানসিকতার দেয়াল। এই পৃথিবী অনেক সুন্দর। নারী ও পুরুষ সম্মিলিতভাবে যদি এই সুন্দরকে অবগাহন করতে পারি তবে জীবন হবে অনেক বেশি মাধুর্যময় ।

সুহেলী সায়লা স্বাতি : সহকারী অধ্যাপক(সমাজবিজ্ঞান)মানবিক বিভাগ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com