আহমাদ উল্লাহ > ও বন্ধু আমার

প্রকাশিত: ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১

আহমাদ উল্লাহ > ও বন্ধু আমার

লুৎফর রহমান রিটন
সময়কাল সত্তরের দশকের মধ্যভাগ।
রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের পরিকল্পনায় জয়কালী মন্দির রোডের কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা ভবনে অনুষ্ঠিত হতো মাসিক সাহিত্য সভা। আমি তখন আহবায়ক কেন্দ্রীয় মেলার। এক বিকেলে সেই সাহিত্য সভায় এসেছিলো আহমাদ উল্লাহ। আমারই সমবয়েসী একটি ছেলে। আমরা দু’জনেই তখন কৈশোরকাল অতিক্রম করতে ছটফট করছি। আমাদের নাকের নিচে হালকা একটা লজ্জাজনক গোঁফের রেখা উঁকিঝুকি দিচ্ছে। ছেলেটার পরনে একটা চেক হাফ শার্ট। শার্টটা ইন করে পরা। আমার সঙ্গে কথা বলার সময় উত্তম কুমার স্টাইলে ওর দু’টি হাতই ছিলো প্যান্টের পকেটে ঢোকানো। অতিশয় ভদ্র। কথা বলে অনুচ্চ কণ্ঠে। উচ্চারণ সঠিক রাখার একটা সচেতন প্রয়াস ওর মধ্যে লক্ষ্যনীয় রকমের শ্রুতিগ্রাহ্য।
সে আমাকে জানালো আরেকটা সাহিত্য সভার খবর। বললো–তুমি কি ইসলামিক ফাউন্ডেশন চেনো? অই যে বায়তুল মোকাররম আর হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের মোড়টায়। ওখানে প্রতি রোববার ছুটির দিনের সকাল দশটায় চমৎকার একটা সাহিত্য সভা হয় অনুশীলন সংঘের ব্যানারে। তুমি আসতে পারো ওখানে। আমার মনে হয় তোমার ভালো লাগবে।
আহমাদ উল্লাহর আন্তরিক আমন্ত্রণের কারণেই পরের রোববারেই যথাসময়ে আমি হাজির হয়েছিলাম অনুশীলন সংঘের সাহিত্য সভায়। আমার জন্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বারান্দায় অপেক্ষায় ছিলো আহমাদ উল্লাহ। দোতলায় ছুটির দিনের অফিস কক্ষের চেয়ার টেবিলগুলোকে এদিক সেদিক করে কক্ষটাকে হলরুমের চেহারায় দাঁড় করানো হতো। আহমাদ উল্লাহ পরিচয় করিয়ে দেবার পর প্রথম দিনেই সেই সাহিত্য সভার উদ্যোক্তা শেখ তোফাজ্জল হোসেন আমাকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন। প্রথম দিনেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম কচি-কাঁচার মেলা কিংবা খেলাঘরের সাহিত্য সভার তুলনায় অনুশীলন সংঘের সাহিত্য সভাটি অনেক ঋদ্ধ এবং দ্যুতিময়। সভায় তরুণ লেখক কবি ছড়াকার গল্পকারের উপস্থিতির সংখ্যাও বলা চলে বিপুল। বিখ্যাত এবং প্রবীন লেখকদেরও আগমন ঘটতো সেখানে, প্রতি সপ্তাহে। খুবই চটপটে স্বভাবের ছিলাম এবং আমার ছড়ার হাতটি ভালো ছিলো এবং লেখা পাঠের পর তাৎক্ষণিক আলোচনার পর্বে আমার স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতার কারণে খুব দ্রুতই আমি হয়ে উঠেছিলাম অনুশীলন সংঘের ভালোবাসার একজন। আমার আমন্ত্রক আহমাদ উল্লাহ খুব আনন্দিত ছিলো ওখানে আমার গ্রহণযোগ্যতা দেখে। নিচু কণ্ঠে হাসিমুখে সে আমাকে বলেছিলো–কী? বলেছিলাম না তোমার ভালো লাগবে!
জবাবে আমি ওকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম–তুমি না বললে তো আমার অজানাই থেকে যেতো শহরের সেরা সাহিত্য সভার বিষয়টি।
এরপর আহমাদ উল্লাহ হয়ে উঠেছিলো আমার খুব কাছের বন্ধু।
আহমাদ উল্লাহ ছড়া পড়তো প্রতি সভায়। কখনো একটা কখনো একাধিক।
এক সভায় ওর চার লাইনের দু’টি ছড়া শুনে খুশিতে আমার তো পাগল হবার দশা। কী সুন্দর ছড়া! একবার শুনেই ওর লেখা ছড়া দু’টো আমার মুখস্ত হয়ে গিয়েছিলো। স্মৃতি থেকে উদ্ধার করি–
প্রথম ছড়াটি ছিলো এরকম–‘ছাদ থেকে পড়ে যায় টিকটিকি/প্রাণ তার বেঁচে থাকে ঠিক ঠিকই/লেজ তার কাটলেও টিমটিম/ ছাদে গিয়ে পুনরায় পাড়ে ডিম।’
আর দ্বিতীয় ছড়াতে সে বললো–‘আলীর ব্যাটা আইলা/ভাঙলো দু’টি পাইলা/ভাঙবে না ক্যান্‌? দু’দিন ধরে/পেটটা ছিলো খাইলা!’
সেদিন সাহিত্য সভা শেষে ওকে বলেছিলাম–এতো সুন্দর ছড়া লিখেছো যে তোমাকে কিছু খাওয়াতে ইচ্ছা করছে। চলো যাই কোথাও গিয়ে বসি।
হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের বিপরীত দিকে একটা কমদামি রেস্টুরেন্ট ছিলো। সেখানে গরমা গরম ডালপুরি আর চা-ও পাওয়া যেতো। তখন ওই বয়েসে মধ্যবিত্ত কোনো কিশোরের পকেটে টাকা-পয়সা খুব একটা থাকতো না। পকেটের জোর অনুযায়ী চারটে পুরি আর দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিয়েছিলাম। সেই সামান্য আপ্যায়নেই খুশিতে ঝলমল করে উঠেছিলো বন্ধু আহমাদ উল্লাহ। বলেছিলো–এই প্রথম আমার লেখা শুনে খুশি হয়ে কেউ একজন আমাকে রেস্টুরেন্টে এনে বসালো।

দ্রুতই আমরা বন্ধু হয়েছিলাম।
আমার এই ছড়াবন্ধুটি হাফেজ ছিলো। কোরানে হাফেজ। পুরো কোরান শরীফ সে মুখস্ত করেছিলো। ওর কাছেই শুনেছিলাম সেই কাহিনি। কিন্তু বাংলা শিশুসাহিত্য বিশেষ করে ছড়া ওকে খুব বেশি টানতো। টানতে টানতে শেষমশ ওকে নিয়ে এসেছিলো ছড়া লেখার জগতে।
এবং লিখতে লিখতেই একটা সময়ে আহমাদ উল্লাহ আমারও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলো।
কয়েক বছর পর জেনেছিলাম আমার এই হাফেজ বন্ধুটি পুরো রোজার মাসব্যাপি একটা বিশেষ চাকরিতে নিয়োজিত এবং ব্যস্ত থাকে। কোনো একটা মসজিদের সঙ্গে ওর চুক্তি হতো। রোজার মাসে সেই মসজিদে সে তারাবি নামাজ পড়াতো। অর্থাৎ কী না পুরো মাস জুড়ে হাফেজ আহমাদ উল্লাহর ইমামতিতে রোজাদার মুসুল্লিরা পড়তেন তারাবি নামাজ। এটা ছিলো তার বাৎসরিক একটা আয়ের উৎস।
একদিন আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম–মিয়া তুমি একজন সদ্য তরুণ। গায়ে গতরেও ছোটখাটো। ইমাম হিশাবে বয়স্ক মুসুল্লিরা মান্য করে তোমাকে ঠিকঠাক? ক্যাম্নে সামলাও তুমি অগো?
মিষ্টি হেসে আহমাদ উল্লাহ বলেছিলো–বন্ধু, বয়েস কোনো ফ্যাক্টর না। এই বিষয়ে আমার যোগ্যতাটা এমন যে আমাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস কারো হয় না। ইমামকে মানতে বাধ্য মুসুল্লিরা। যিনি ইমাম হন, তাঁকে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই ইমামতি করতে হয়।

আহমাদ উল্লাহর বিয়েতে শামিল হতে ঢাকা থেকে আমরা একটা মোটামুটি দল নিয়ে গিয়েছিলাম নরসিংদিতে। এই দলে মাযহার ছিলো, টুলুও ছিলো।
ওর বিয়ের অনুষ্ঠানে সারাদিন একটা হুল্লোড়ের মধ্যে কাটিয়েছিলাম আধা গ্রাম আধা শহরের আদলে গড়া নরসিংদি নামের মফস্বল অঞ্চলে।

২০১৭ সালে আহমাদ উল্লাহ ওর একটা বই ‘ছড়া পাতার নৌকা’ আমাদের কয়েকজনকে উৎসর্গ করেছিলো। যারা ওর সতীর্থ ছড়াবন্ধু অনুশীলনের। তার মধ্যে আহমাদ মাযহারও ছিলো। আমার বন্ধু মাযহারের নাম ছিলো মাযহারুল ইসলাম সেলিম। একদিন সে নাম পালটে হয়ে গিয়েছিলো আহমাদ মাযহার। লক্ষ্যণীয়, আহমদ নয়, আহমেদ নয়, আহাম্মদ নয়, একেবারে আহমাদ। আমাদের বন্ধু আহমাদ উল্লাহর মতো আহমাদ। ধারণা করি মাযহার ওর আহমাদ অংশটি এই উল্লাহর কাছ থেকেই নিয়েছে!

কানাডা থেকে ফোন করে মাঝে মধ্যে চমকে দিয়েছি ওকে। আমার ফোন পেলে কী যে খুশি হতো বন্ধুটি! বহুদিন (করোনাকাল শুরু হবার পর)যোগাযোগ নেই আহমাদ উল্লাহর সঙ্গে। সেদিন রাতে মাযহারের একটা খুদে বার্তা পেলাম–আহমাদ উল্লাহর চাকরি নেই ৪/৫ মাস ধরে, কিডনি ফেইলিওর, ডায়ালাইসিস চলছে, জানো?
জবাবে আমি লিখেছিলাম–না তো!
মাযহার লিখেছিলো–ক্রিটিক্যাল অবস্থা!
আমি–আহা কী বলো! মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।
এরপর আমি ওর ফোন নাম্বারের খোঁজে নামলাম। কিন্তু ক্রিটিক্যাল অবস্থায় সে আমার ফোন ধরতে পারবে না ভেবে কল না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম কানাডার সময় সকালে ওর পুত্রের বা অন্য কারো নাম্বার সংগ্রহ করে ওর খবর নেবো।
সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো। কারণ সার্জারির পর আমি এখন প্রায় রাতেই ঘুমের অষুধ খেয়ে ঘুমাই।
ঘুম থেকে জেগে ফেসবুক অন করেই হতভম্ব আমি। আমার ছড়াবন্ধু আহমাদ উল্লাহ মারা গেছে এক ঘন্টা আগে! আহারে!
আমার সকালটা কেমন বিষণ্ণ আর শোকার্ত হয়ে উঠলো মুহূর্তেই।

যুগান্তরের জন্মলগ্ন থেকেই দৈনিকটিতে যুক্ত ছিলো আহমাদ উল্লাহ। টানা একুশ বছরের বেশি সময় ধরে সে যুগান্তরের ‘ইসলাম ও জীবন’ নামের পাতাটার দায়িত্বে ছিলো। এর বাইরে বাড়তি দায়িত্ব হিশেবে আরো দু’টি পাতা ‘ঢাকা আমার ঢাকা’ এবং ‘পরবাস’ পাতাটিরও সম্পাদক ছিলো সে। কিন্তু বিস্ময়কর নির্মমতা প্রদর্শন করেছে পত্রিকাটি তার প্রতি। আহমাদ উল্লাহ কিডনি সমস্যায় ভুগছিলো। দু’টি কিডনিই অকেজো হয়ে গেলে সে আর ফিরতে পারছিলো না কাজে। আর তখনই পত্রিকাটি তার ঘোর বিপদের দিনে তাকে চাকরিচ্যুত করেছে! একুশ বছর ধরে যুগান্তরকে সে ঔন করেছে। কিন্তু যুগান্তর তাকে ঔন করেনি একদিনের জন্যেও। যুগান্তর তাকে একজন কর্মচারিই ভেবেছে। আর আহমাদ উল্লাহ যুগান্তরকে ভেবেছে তার নিজের পত্রিকা।
আহমাদ উল্লাহ সরল ছিলো। আহমাদ উল্লাহ বোকা ছিলো। তাইতো সে অন্যের প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে ভেবেছে।
বন্ধু আহমাদ উল্লাহ, তোমার প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণ সংবাদকর্মীদের প্রতি মালিকপক্ষের চিরকালের দৃষ্টিভঙ্গিটিই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তোমার এতোদিনের সহকর্মীদের কেউ একটু প্রতিবাদ বা তোমাকে রক্ষার সামান্য চেষ্টাটুকুও করেনি!
তোমার অনন্তযাত্রা শান্তিময় হোক বন্ধু!
অটোয়া ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com