ঢাকা ১২ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


ঈদে সড়ক-রেলে ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার শঙ্কা

abdul
প্রকাশিত জুলাই ২৮, ২০১৯, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ
ঈদে সড়ক-রেলে ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বন্যা ও অতিবর্ষণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর মধ্যে ঈদুল আজহা পড়েছে শ্রাবণের শেষ ভাগে। ফলে আসন্ন ঈদযাত্রায় বৃষ্টিপাতের মধ্যে ব্যাপক দুর্ভোগ ও ভোগান্তির মুখে পড়তে পারেন ঘরমুখী যাত্রীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়কের কারণে এবারের ঈদযাত্রায় বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে তুলনামূলক অনেক বেশি। অন্যদিকে রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঈদযাত্রায় একাধিক ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন খোদ রেলওয়ে কর্মকর্তারাই।

এসব শঙ্কার মধ্যেই গতকাল থেকে শুরু হয়েছে বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি। অন্যদিকে রেলওয়ের টিকিট বিক্রি শুরু হচ্ছে ২৯ জুলাই। সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, বন্যা-বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ঈদের অন্তত সাতদিন আগেই মেরামত করে ফেলা হবে। যদিও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও রেলপথ থেকে এখনো সরেনি বন্যার পানি।ঈদে ঘরমুখী মানুষের সবচেয়ে বড় অংশটি যাতায়াত করে সড়কপথে। তাই ঈদ এলেই মহাসড়কগুলোয় যানবাহনের চাপ বাড়ে। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাহিদা মেটাতে নতুন-পুরনো, ফিট-আনফিট—সব ধরনের গাড়িই নেমে পড়ে সড়কে। হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চলাচল বেড়ে যাওয়ার কারণে বৃদ্ধি পায় বিশৃঙ্খলা ও যানজট। ভোগান্তিতে পড়েন ঘরমুখী মানুষ। আসন্ন ঈদে এ ভোগান্তিকে চরম মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে চলমান বন্যা পরিস্থিতি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক। এগুলো হলো খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়ক, কেরানীহাট-বান্দরবান জাতীয় মহাসড়ক, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি জাতীয় মহাসড়ক, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক, নেয়ামতপুর-তাহিরপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক, কচিরঘাটি-বিশ্বম্ভরপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক, সিলেট-মৌলভীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়ক, শেরপুর-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক, সিলেট-গোয়াইনঘাট আঞ্চলিক মহাসড়ক ও রংপুর-কুড়িগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক। সব মিলিয়ে দেশের ১১টি সড়ক বিভাগের আওতাধীন ৩৯৬ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাইবান্ধা সড়ক বিভাগে, ১২২ কিলোমিটার। কুড়িগ্রাম সড়ক বিভাগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০২ কিলোমিটার। এর বাইরে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার, লালমনিরহাট, সিলেট, হবিগঞ্জ ও রংপুর সড়ক বিভাগেও এ ক্ষতির পরিমাণ কম-বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত এসব সড়ক-মহাসড়কের অনেক অংশ এখনো বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে। এছাড়া অনেক স্থানে অতিবর্ষণের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক।

আসন্ন ঈদে সড়ক-মহাসড়কে ভোগান্তি বাড়ার শঙ্কায় রয়েছেন যাত্রীবাহী বাসের চালকরাও। গ্রিন লাইন পরিবহনের চালক আবুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বন্যার কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যেগুলোয় গাড়ি খুব সাবধানে চালাতে হয়। গতিও বেশি তোলা যায় না। অনেক স্থানে রাস্তায় কাদাপানিও রয়েছে। এসব স্থানেও ধীরগতিতে খুব সাবধানে ড্রাইভ করতে হয়। ঈদের সময় রাস্তায় গাড়ির চাপ বেশি থাকবে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের আশপাশে যানজটও তৈরি হতে পারে।অন্যদিকে যানজট ও বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার। তিনি বলেন, খারাপ সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময়ই বেশি থাকে। বর্ষায় ভেজা রাস্তাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এজন্য চালকদের সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব বন্যা ও বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক মেরামত করে ফেলা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও মনে করছেন, ঈদের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক মেরামত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। গত বুধবার তিনি ঈদের অন্তত সাতদিন আগে বন্যা ও বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের কাজ শেষ করার জন্য সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের নির্দেশ দিয়েছেন। এক অনুষ্ঠানে বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, জাতীয় মহাসড়কগুলো সচল রয়েছে। বন্যায় কয়েকটি জেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সওজ অধিদপ্তর মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকেও মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। সারা দেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়কের সংস্কারকাজ ঈদের সাতদিন আগেই শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।ঈদে ঘরমুখী মানুষের বড় একটি অংশ যাতায়াত করে রেলপথে। এবারের ঈদের জন্য রেলের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হচ্ছে আগামী সোমবার। রেলে ঈদযাত্রা শুরু হচ্ছে ৭ আগস্ট। কিন্তু এ যাত্রাকেও শঙ্কাপূর্ণ করে তুলেছে চলমান বন্যা পরিস্থিতি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেকশন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সেকশনগুলো হলো বোনারপাড়া-বাদিয়াখালী, বাদিয়াখালী-গাইবান্ধা, বালাবাড়ি-রমনা, হাসিমপুর-দোহাজারী ও মেলান্দহ-দেওয়ানগঞ্জ। ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথগুলো ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে সংস্কার করে ফেলা সম্ভব হবে বলে দাবি করছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে রেলওয়ের প্রকৌশলীরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথগুলো এখন কোনোমতে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে সংস্কার করা হয়েছে। জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের অনেক জায়গায় এখনো লাইনে বন্যার পানি রয়েছে। সেখানে বালির বস্তা ফেলে পানির গতিপথ বদলে লাইনগুলোকে আপাতত ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোয় ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১০-১৫ কিলোমিটারের বেশি তোলা সম্ভব হবে না। এ কারণে অন্তত ১১টি আন্তঃনগর ট্রেন ঈদের সময় শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।যেসব ট্রেন নিয়ে শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে সেগুলো হলো ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটের তিস্তা এক্সপ্রেস, সান্তাহার-বুড়িমারী রুটের করতোয়া এক্সপ্রেস, ঢাকা-তারাকান্দি রুটের অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটের এগারসিন্দুর প্রভাতী ও এগারসিন্দুর গোধূলি এক্সপ্রেস, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটের ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস, ঢাকা-লালমনিরহাট রুটের লালমনি এক্সপ্রেস, ঢাকা-রংপুর রুটের রংপুর এক্সপ্রেস, ঢাকা-মোহনগঞ্জ রুটের হাওড় এক্সপ্রেস, ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটের কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ও চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের বিজয় এক্সপ্রেস। দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বন্যায় সারা দেশে বাংলাদেশ রেলওয়ের চারটি সেকশনের সাতটি স্পট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথগুলো সংস্কার করে আপাতত ট্রেন চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ঈদের কথা মাথায় রেখেই আমরা দ্রুত সংস্কারের কাজ করে যাচ্ছি। ঈদের সময় ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোয় ট্রেন সর্বোচ্চ ১০-১৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। এ কারণে কয়েকটি ট্রেন ঈদের সময় শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031