ঈদ আমার ঈদ

প্রকাশিত: ১১:৫৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২৪

ঈদ আমার ঈদ

শামীম আজাদ
আমার বারো তেরো বছর বয়সে আমরা ছোট্ট মহকুমা শহর জামালপুরে ছিলাম। ছোট্ট সাদা কালো ছবির শহর ছিল সেটা।
সে সময় সেখানে মেয়েদের বাজারে যাবার চল ছিল না। ঈদের বাজার তাঁরা বাড়ি বাড়ি আসা হকারদের কাছ থেকেই করতেন। ক্লান্ত অবসন্ন দুপুরবেলা হাঁক শুনতাম “ছিট কাপড় নিবেন …ছিট কা…প…ড়…।” ডাকটা যিনি দিতেন তিনি মালিক। তার সামনে অথবা পেছনে মাথায় মার্কিন কাপড়ে গিঁট দেয়া কাপড়ের বোঝা নিয়ে হাঁটতো তার মুটে।তার পন্যের ভারবাহক। ছাতি থাকতো মালিকের মাথায়।
সে সময় মেয়েরা ছিটের মানে ফুল লতাপাতা প্রিন্টের এবং ছেলেরা একরঙের জামা পরতো। আব্বা সামাদ চাচা সহ সিংহযানী ষ্টেশন রোড থেকে সেমাই, পোলাওর চাল আর কখনো গজ হিসেবে কাপড় কিনে মন্তাজ ভাইকে দিয়ে বাসায় পাঠাতেন। পিয়ন মন্তাজ ভাই সাইকেলের পেছনে সেগুলো বেঁধে বাসায় নিয়ে আসতেন। আমি দম বন্ধ করে হিমসাগর গাছের নিচে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম যতক্ষণ না ঐ সরু মন্তাজ ভাইর শরীর দেখা যায়। কি যে একটা উত্তজনা! ঈদ তো না যেন এগিয়ে আসছে বোমা ফাটানো আনন্দ।
আম্মার একটা সিঙ্গার সেলাই কল ছিল। দেখতে কালোরঙের হাতির শুঁড়ের মতন । তাতে আবার সোনার রঙে ডোবানো তুলি দিয়ে নকশা করে লেখা। ডানে গোল রূপালি চাকার মধ্যে কাঠের হ্যান্ডেল। হ্যান্ডেলের নিচেই আয়তক্ষেত্র আকারের কালো স্টিলের ঢাকনা দেয়া একটা কম্পার্টমেন্ট। ওটাতে পেন্সিল, মাপার ফিতে, বাড়তি সুতোর ‘ববিন’। রূপালি স্টিলের ববিনগুলোয় জামার রঙে মিলিয়ে সুতো ভরার সময় মাঝে মাঝে আমরা হ্যান্ডেল ঘোরাবার সুযোগ পেতাম। সে যে কি আনন্দ যেন এক খেলা।
নতুন কাপড়গুলো সাদা জলে ধুয়ে মাড় ছাড়িয়ে রোদ দিলে ঐ ছিট কাপড়ের কাছেই ঘোরাঘুরি করতাম। শুকানো মাত্রই দৌড়ে গিয়ে তুলে বেতের পাটিতে বিছিয়ে রাখতাম। সেখানে মেশিন মানে সেলাইর কল, কাপড়ে দাগ দেবার মোটা পেন্সিল, কাঁচি ও মাপার ফিতে রাখাই আছে। আব্বা বাসায় থাকলে ওঁরা দু’জনেই পরামর্শ করে জামার স্টাইল ঠিক করতেন। কিছুতেই আলট্রা মডার্ণ টেডি যাতে না হয়। ততক্ষণে কুয়াতলা পেরিয়ে জানালা দিয়ে রোদ এসে পড়তো সিলেটী পাটিতে। আমি আম্মার পিছু ছাড়তাম না। কাটার পর মেশিন চল্লে অন্যদিকে বসে কাপড়ের প্রান্ত ধরে টানা দেয়া, এটা ওটা এগিয়ে দেয়া, চুলোর রান্না দেখে আসা এসবের জন্য লোক লাগে না! এক টুকরো কাটা কাপড়ও ফেলতাম না, লুকিয়ে রাখতাম। ঈদের আগে খেলতে আসা বন্ধুদের কেউ যেন টের না পায় কি রকম হবে আমার ঈদের জামা! জামাটা অন্য বন্ধুদের কারো মতো না হওয়াই ছিলো একটা বিগ ডিল।
এবার আসি রান্নার কথায়। এ সময় আম্মা মাঝে মাঝে উঠে রান্না ঘরে কষা মাংস দেখে আসতেন। কখনো আমাদের বলতেন চুলোর মাংস নেড়ে দিতে। বড় ঈদে মানে ঈদুল আয়নায় ঝাল মাংস, কাবাব ও ঝুরা মাংসের ফব পিঠা আর ছোট ঈদে মানে ঈদুল ফিতরে সেমাই জর্দা, নারকেলের ফব, মুরগীর কোরমা হতোই হতো। তখনো চটপটি চিনি না, দইবড়া খাইনি, কেক বা আইসস্ক্রিমের প্রশ্নই আসে না। আমি বলতাম, একটা নোনতা ঈদ আরেকটা মিঠা ঈদ। দু’ঈদে দু’রকমের গন্ধে ম ম করতো আমাদের মাছের পিঠরঙা টিনশেড রান্না ঘর।
একবার আম্মা কোরবানীর ঈদে মাংস পাতলা পাতলা টুকরো টুকরো করে নুন মেখে তারে গেঁথে শুকিয়ে রেখেছিলেন। কিছুদিন পরে তা রান্নার আগে গরম পানিতে ভেজানোর পর কূয়োপাড়ের পেঁপে গাছের নিচেপরা কচি পেঁপে শিলে থেতো করে মশলা সহ মাখিয়ে রেখেছিলেন। তারপর কাটা মশলা দিয়ে মাখা মাখা করে রান্না করেছিলেন। আর সে রান্না আমাদের পাতে দেবার আগে বলছিলেন, “আইজ তুমরা গোস্ত’র হুকোইন খাইবায়”। মাছের শুটকি তো সব সময় খেতাম সেবার মাংসের খেলাম। ফ্রিজ ছাড়া প্রিজার্ভেশন আর কি!
আরো কথা আছে তা হলো নোনতা ঈদে প্রায়ই পরতাম রিসাইকেল জামা আর মিঠা ঈদে নতুন কাপড়ের। কোরবানীর ভাগের মাংসেই বেশ কিছু অর্থ চলে যেতো বলে আ অবস্থা। সরকারী সৎ অফিসার বলে আব্বা, তরফদার সাহেবের নাম ছিল।আমি নিজেও শিশুচোখে কিছু কিছু ব্যাপার দেখেছি। সে গল্প আরেকদিন বলবো।
একটা ঈদের কথা মনে পড়ছে। হয়তো সেটা নোনতা ঈদ ছিলো। আমার বয়স পাঁচ। আমরা তখন ময়মনসিংহ শহরে থাকি। কলেজ রোডের উপর টকটকে লাল এক টানা বারন্দায় আম্মার মেশিন, মানে সেলাইর কল রাখা। আম্মা তার একটা পুরানো জংলি ছাপা জর্জেট শাড়ি কেটে বিস্তর কুঁচি দিয়ে নাচের ড্রেসের মত একটা লংস্কার্ট বানিয়ে নিয়েছেন। উর্ধবাস হাল্কা গোলাপী সাটিনের থ্রি কোয়ার্টার হাতা এক সর্ট টপ। সেটাও আম্মার পুরানো কামিজ কাটা কাপড়ে। এবার যখন তারই একটি টুকরোয় একটা ওয়েস্ট কোট হলো, এ ম্যাজিক রূপান্তর দেখে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। তারপরও কিছু বিস্ময় বাকি ছিলো। সে সময় বিদেশী পুরানো কাপড়ের মার্কেট বসতো ট্রাঙ্ক্ররোডে। সেখানে জামাগুলো থেকে খোলা ইলাস্টিক, পুঁতি, পাথর আলাদা করে বিক্রি হতো। পিয়নভাইর মাধ্যমে আম্মা কিনে আনালেন ছোট ছোট গোল আয়না। তার সংগে এলো লাল প্লাস্টিকের রিং। এর মধ্যে ঢুকিয়ে কি কায়দা করে যে আয়না বসিয়ে দিলেন সেই ওয়েস্ট কোটে! বললেন, “অইলো তোর ইরানী ড্রেস”! আমার বুদ্ধিমতি মায়ের করা সে জামাগুলো দেখে বন্ধু সিমিন বুঝতেই পারলো না এর রহস্য।
আব্বা জামালপুর বদলী হবার আগে আমরা নারায়নগন্জ আমলা পাড়ায় ছিলাম ও গার্লস স্কুলে পড়তাম। তখন বিপ্লবী হেনা দাস আমাদের হেড টিচার ছিলেন। আমার বয়স হবে দশটস। আপা আমাকে আমাদের গার্লস গাইডদের মার্চ পাস্টের সময়ে সবার আগে দিলেন। আমি ভাবলাম সেল্যুটের জন্য আমার উচ্চকিত কন্ঠটাই এর কারণ। তখন পায়ে পরতাম ‘ছেলেদের’ কেডস। আমি ভাইয়ার ছোট হয়ে যাওয়া নটি বয় স্যু ও পরেছি। আমার কোন সমস্যা নেই।
কারণটা বলছি। নারায়নগঞ্জে একবার ঠিক ঈদের আগে ভাগে আমার ফ্যাশনেবল ছোটখালা- খালামনি তার রাজকন্যা রাজীকে নিয়ে লন্ডন বেড়িয়ে এসেছেন। আমি ওর পোশাকের দিকে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকি। সবই স্বপ্নের দেশ বিলেতের সাদা ছেলেমেয়ের পোশাক। হা হয়ে দেখি রাজী মাঝে মাঝে ছেলেদের মত পোশাকও পরে আর আব্বা বল্লেন, “ইতা বিলাতর ফ্যাশন। তুই পিনতেনি?” লন্ডনে বাকিংহাম প্যালেসে রানীর কন্যা প্রিন্সস এ্যান্ যে আমার চেয়ে ইকটু বড় সেও ছেলেদের প্যান্ট শার্ট পরে। তাতেই আমি প্রবল উৎসাহে আম্মার সামান্য অল্টারেশনে ভাইয়ার ট্রাউজার শার্ট পরে মহানন্দে খালামনির বিলেতী ক্যামেরার সামনে দ্বিধাহীন দাঁড়িয়ে গেলাম।
অনেক পরে বুঝেছি, সততার সরকারী কর্মচারির বাড়িতে এভাবেই ঈদ আনতে হয়!
আমার সে ইরানী ড্রেস পরে মঞ্চে নজরুল জয়ন্তীতে রুম ঝুম ঝুম রুম ঝুম ঝুম/ খেজুর পাতায় নুপূর বাজায় নেচেছিলাম।উরনি উড়িয়ে ঘুরুল্লা দিলেই জামার ঘের চারিদিকে গোল হয়ে ঘুরতে থাকলে নিজেকে পরী মনে হচ্ছিল। তাতে এমন চক্কর মারছিলাম করেছিলাম যে আমাকে থামানো যাচ্ছিল না।
ক্লাশ নাইনে পড়ার সময় – ঈদের জামার ডিজাইন হল পাকিস্তা্নী হিট ছায়াছবি ‘আরমান’ ছবির নায়িকা জেবার মতো। বোট নেক টেডি কামিজ। তখন কথাকলি হলে সিনেমা হলে ‘আরমান’দেখে লম্বা জুলপিওলা ওয়াহিদ মুরাদের জন্য আমরা পাগল। আমি, মন্টি ও ঝুনু সেইসব ছুটের জামা পরে বকুল তলার রাস্তা দিয়ে দর্পভরে হেঁটে গেলে পেছনে আমাদের রোমিওরা ক্রিকেট খেলা্র বোলিং থামিয়ে গাইতো, “একেলে না যা না… হামে ছোড় করতুম… “। কিন্তু ও টুকুই ওদের দৌড়! এখনকার মারাত্মক ইভ টিজিং ছিল না।
যা বলছিলাম, ফেনীতে থাকার সময় ঈদে প্রথম পেয়েছিলাম স্পঞ্জের স্যান্ডেল। আমার বয়স ছিল ছয় কি সাত। তখন স্লিপার ছিলো না। সবাই বাসায় খড়ম পরতাম আর খটর খটর করে ঘুরে বেড়াতাম। মেয়েদের খড়মের বেল্টে লাল নীল ফুলের তেল পেইন্ট, ছেলেদেরটা শুধু রিক্সার টায়ারের কালো বেল্ট।
সেবার রোজার মধ্যে আব্বা অফিসের কাজে ঢাকা গিয়েছিলেন, ফিরে এলেন ঈদের বাজার নিয়ে। সবাই তাঁকে ঘিরে বসেছি। একটার পর একটা জিনিষ বেরুচ্ছে আর আমি হা হয়ে যাচ্ছি। মুখ গহব্বর সব চেয়ে বড় হয়ে গেল যখন দেখলাম তিন ফুটোওলা পা সাইজের জোড়া জোড়া রাবার ও লাল নীল হলুদ ও সবুজ স্ট্র্যাপ। ” ইতার নাম স্পঞ্জর স্যান্ডেল, জাপানীজ। যাও তেল না অইলে সাবন আর পানি আনো গিয়া”। আমরা ম্যাজিক দেখবার আগে যেমন হুড়াহুড়ি পড়ে যায় তেমন লাগিয়ে দিলাম। আব্বা লাল ফিতাজোড়া হাতে নিয়ে তার তিন দিকের তিনটি গুটলিতে সাবান ফেনা লাগিয়ে সাদা কিরিকিরি সোলের ওপর যে তিনটি ফুটো আছে তাতে একে একে পুঁ…চ পুঁ…চ পুঁ…চ করে ঠেলে দিতেই চার জোড়া স্যান্ডেল বনে গেল!
ঈদের দিন নতুন জামা আর দুই স্ট্র্যাপের স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে আমার ডাঁটই বেড়ে গেল! বাড়ি বাড়ি দুধ সেমাই আর পরোটা খাবার পর স্যান্ডেলে ধুলা লেগেছে কি লাগেনি চট করে স্যান্ডেল সহ কলের জলে পা ভেজাই। খড়মের মতই যত ইচ্ছা পানিতে চুবাও কিচ্ছু হয় না। মজা হল তারপর হাঁটতে গেলে পায়ের ঘর্ষনে ঈঁদুরের মত স্কুইজি শব্দ করে। আমার ভাগ্যে ঈর্ষান্বিত রুবি তা হাত দিয়ে দেখতে চাইলো। কিন্তু নাকের কাছে ধরে বলে, কি পচা গন্ধরে বাবা! আমি টান মেরে ফেরত নিয়ে গর্বভরে বলেছিলাম, হবে না? এটা তো জাপান থেকে এসেছে তাই এতে জাপানী খাবারের গন্ধ! তখন সুশি কাকে বলে তাও জানতাম না। বুঝতাম ওদের খাবারটায় নিশ্চয়ই ভিন্ন গন্ধ থাকে। যেমন আমাদের ঈদের কোরমা পোলাওয়ে, পায়েসে পিঠায়।
সবাই ঈদের শুভেচ্ছা।

নোনতা মিঠা ঈদ
১০.৪.২৪
ঢাকা