উচ্ছেদ আতঙ্কে কালিহাতীর পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার

প্রকাশিত: ৬:৫৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৭

 

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরুতেই বাঁধার মুখে পড়েছে। স্থানীয় সাতটি গ্রামের পাঁচ হাজারের বেশি পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে শুক্রবার(১৭ নভেম্বর) টাঙ্গাইল অংশে নিউ ধলেশ্বরীর মুখে প্রকল্পের ‘সিল্ট বেসিন’ কাজের উদ্বোধন ভন্ডুল করে দিয়েছে।

জানা যায়, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের টাঙ্গাইল অংশে কালিহাতী উপজেলার বেলটিয়া নামকস্থানে নিউ ধলেশ্বরীর মুখে প্রকল্পের ‘সিল্ট বেসিন’ নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেলক্ষে স্থানীয়দের ভূমি অধিগ্রহনের জন্য নোটিশও দেওয়া হয়। কিন্তু অধিগ্রহণ করা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, আগে অধিগ্রহন করে জমির দাম পরিশোধ করা হোক, তারপর কাজ শুরু করা হোক। নচেৎ উচ্ছেদ নয়।

শুক্রবার প্রকল্পের ‘সিল্ট বেসিন’ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করতে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাজাহান সিরাজ বেলটিয়া গ্রামে ধলেশ্বরীর মুখে যান। সেখানে ‘লাল পতাকা’ টাঙিয়ে ‘সিল্ট বেসিন’ নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের উদ্যোগ নেন। পাশেই খনন কাজের জন্য দুইটি সাবসান ড্রেজার মেশিন বসানো হয়। নদীর ওই অংশে খনন করলে বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় মুহুর্তের মধ্যে কয়েক হাজার চরবাসী লাঠিসোটা নিয়ে ‘চর বাঁচাও, জীবন বাঁচাও’ স্লোগান দিতে দিতে একত্র হয়ে সিল্ট বেসিন নির্মান কাজ বন্ধ করে দেয়। তারা উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর আক্রমনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হযরত আলী তালুকদারের তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। টাঙানো লাল পতাকা উঠিয়ে দূরে ফেলে দেয়। হামলার আশঙ্কায় সাবসান ড্রেজার মেশিন দুইটি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে থানা থেকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশের উপস্থিতি দেখে তারা আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে চরাঞ্চলবাসীর ভূমি অধিগ্রহনের নিয়শ্চয়তা দেওয়া হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

Tangail-kalihati-beltia bari-(1)-17.11.2017বেলটিয়াবাড়ী গ্রামের আব্দুস সোবহান(৫৫),আ. গফুর(৪৬), মজিবুর(৪৭), শাজাহান(৩৭), আবু বকর(৫০), আব্দুল হাকিম(৪৫), আব্দুল মজিদ(৬৫), আব্দলি আলীম(৫৫), আইয়ুব আলী(৩৮) সহ অনেকেই জানান, নদী খনন তারাও চান। কিন্তু যেখানে সিল্ট বেসিন নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এতে তাদের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হবে। বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনে অনেকেই ঘরবাড়ি হারাবে। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগে তারাও শরিক হতে চান। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহন না করা হলে তারা পথে বসবেন, মাথা গোঁজার ঠাই থাকবেনা। ইতোপূর্বেও নদী খনন করতে এসে জমি অধিগ্রহনের কথা বলে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে- ওই সময় তারা কেউ অধিগ্রহনের টাকা পায়নি। তারা আরো জানান, তাদের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে একটি করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। কাজের আগে জমি অধিগ্রহন করে টাকা পরিশোধ না করলে তারা আর অধিগ্রহনের টাকা পাবেন না বলে জানান।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল করিম ক্ষুব্ধ হয়ে জানান, পানি উন্নয়ন বের্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী একজন প্রতারক। ২০১০ সালে জমি অধিগ্রহনের কথা বলে নদী খনন কাজ করেন, কিন্তু পরে আর অধিগ্রহনের কোন টাকা-পয়সা তারা পাননি। আগে প্রজাস্বত্ত্ব সংরক্ষণ, পরে উন্নয়ন। তিনি বলেন, আগে অধিগ্রহন করে টাকা পরিশোধ করুক, পরে কাজ করবে- এটাই তাদের দাবি। প্রশাসনের কর্তারা বলেন চার বার নোটিশ দিয়ে কাজ শুরু করা হবে। এটা অসম্ভব, রক্তের গঙ্গা বয়ে যাবে, তবুও অধিগ্রহন ছাড়া কোন কাজই করতে দিব না।

গোহালিয়াবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান হযরত আলী তালুকদার জানান, ভূমি অধিগ্রহন করে নদী খনন করা হলে এলাকাবাসী সহযোগিতা করবে। তারা আগে অধিগ্রহনের টাকা চায়, পরে কাজ করা হোক।

কালিহাতী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদার জানান, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর একটি মহতি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিক উদ্যোগ। এ উদ্যোগে আমাদের অংশ গ্রহন আছে- এটা আমাদের সৌভাগ্য। কিন্তু আগে এলাকাবাসীর জমি অধিগ্রহন সম্পন্ন করা প্রয়োজন। চরের মানুষের কাজ নাই, খাবার থাকেনা- এর মধ্যে যদি মাথাগোজার ঠাঁই হারাতে হয় ওরা তো ক্ষুব্ধ হবেই। প্রশাসনের উচিত আগে জমি অধিগ্রহন করা।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাজাহান সিরাজ জানান, স্থানীয়দের চাপে সিল্ট বেসিন নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করতে পারেননি, তা সঠিক নয়। এলাকাবাসী তাদের ভূমি অধিগ্রহনের টাকা আগে চায়- এটাও অন্যায্য কোন দাবি নয়। ইতোমধ্যে ভূমি অধিগ্রহনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে, জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন জানান, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহনে পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। তারা টাকাও জেলা প্রশাসকের তহবিলে জমা দিয়েছে। আমরা নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। শুক্রবার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) মো. অতুল মন্ডল ওআ এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এলাকার মানুষ উন্নয়নও চায় আবার জমিও দিতে চায়না। তিনি আরো বলেন, ভূমি অধিগ্রহন সরকার প্রায় চারগুণ মূল্য দিয়ে থাকে। একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে অধিগ্রহন করতে হয় বলে কিছুটা সময় লাগে। এ জন্য ধৈর্য ধারণ করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রকাশ, বুড়িগঙ্গা নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করে নাব্যতা বজায় রাখা, পানির গুণগতমান বৃদ্ধি, নৌ-চলাচল অব্যাহত রাখা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নতমানের উদ্দেশে ২০১০ সালে শুরু হয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কাজ। ২০১০ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে ৯৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। মেয়াদ শেষে বাস্তবায়িত না হওয়ায় নিউ ধলেশ্বরীর উৎসমুখে নানা অবকাঠামো অপসারণের কথা মাথায় রেখে নতুন ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করা হয়। এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নতুনভাবে গত ১৪ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি আবারও অনুমোদন দেয়া হয়। এতে করে প্রকল্পের সময় বেড়ে দাঁড়ায় ২০২০ সাল জুন পর্যন্ত। একই সঙ্গে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। এখন মেয়াদ ঠিক রেখে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।