উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নারী এবং আন্তর্জাতিক  নারী দিবস

প্রকাশিত: ১২:১১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২১

উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নারী এবং আন্তর্জাতিক  নারী দিবস

 

তন্ময় সরকার

নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন ৮ মার্চ পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে মানুষ। গড়েছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা। পারস্পরিক নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলায় নিজেদের টিকিয়ে রাখতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছে নারী-পুরুষ।
সাহেলা চৌধুরী স্বপ্ন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। সে লক্ষ্যেই পড়াশুনার পাশাপাশি ব্যবসার খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করতে থাকেন। তার নিজ উপজেলা থেকে টেইলারিং ও ফ্যাশন ডিজাইন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ও হাতে কলমে শিক্ষা পান কিভাবে ব্যবসা শুরু করতে হবে সে বিষয়ে। সেসাথে ছিল দোকান পরিচালনা ও বিপনন ব্যবস্থার ওপরও প্রশিক্ষণ। সবমিলে প্রশিক্ষণের ছয় মাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে যায় তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। সাজিয়া তার নিজ জেলায় আজ প্রতিষ্ঠিত নারী উদ্যোক্তা এবং পাশাপাশি পরিবারের অন্যতম উপার্জনকারীও। সাহেলার মতো দেশের আনাচে কানাচে আরো অসংখ্য নারী উদ্যোক্ততা প্রশিক্ষিত হয়ে কাজ করছে। মানসিক হতাশা কিংবা সামাজিক কোনো বাধাই এখন আর নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়া থেকে রুখতে পারে না। নারী যদি সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নেয়, তাকে কেউ আটকাতে পারে না। বাংলাদেশের নারীরা যেমন ঘর সাজানো, শিক্ষাঙ্গনে, কর্মক্ষেত্রে সফল, তেমনি সফলতার ছাপ রেখেছেন ক্রীড়াঙ্গণেও।
বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আর এখন তাই আরো বেশি প্রয়োজন একটি সুস্থ সবল, শক্তিশালী, দক্ষ প্রশিক্ষিত এবং চৌকস কর্মশক্তির সমন্বিত প্রয়াস, যেখানে নারী পুরষ উভয়ের অংশগ্রহণ আবশ্যিক। আজ যোগ্যতার সাথে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা বিশ্ব রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে সমান ভূমিকা রেখে চলেছে। মেয়েরা এখন সর্বক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। শুধু তাই নয় সমরক্ষেত্রেও যুদ্ধ বিমান নিয়ে শত্রুর দিকে উড়ে চলছে নারীরা। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি অবদান রাখতে সক্ষম নয়।
প্রযুক্তির উৎকর্ষে পৃথিবী এগিয়েছে। সেসাথে এগিয়েছে মানুষের ধ্যান-ধারণা চিন্তা চেতনা। চেতনার উৎকর্ষে আজ নারী পুরুষের বিভেদ, হীনমন্যতা সমাজ থেকে কমেছে ঠিকই, কিন্তু সমাজ এখনো পুরোপুরি ছেলে মেয়েদের সমান অধিকার সমভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা নারীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হবে আমাদেরকেই।
নারীর কর্ম ও সৃজনশীলতার স্বীকৃতি প্রকৃত অর্থে নিশ্চিত করা গেলে নারীমুক্তি বা নারীর অধিকার আদায়ের প্রশ্ন আসত না। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা, সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, লিঙ্গসমতার প্রতি প্রবল অনীহা, মানবতার প্রতি উদাসীনতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় নারীর মর্যাদা, তার শ্রমের মূল্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুগে যুগে। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে চারদেয়ালে আবদ্ধ রেখে তাদের মেধা, প্রতিভা আর কর্মস্পৃহা অবদমন করা হয়েছে বার বার। তবুও নারীরা দমে থাকেনি। সকল প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে নারী আজ আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে চলেছে।
সময়ের সাথে সাথে সকল বাধার গণ্ডি পেরিয়ে মুক্ত পৃথিবীতে বেরিয়ে এসেছে নারীরা। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা এবং কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা সেদিন। কিন্তু শৃঙ্খলিত সমাজ তা মানতে পারেনি। শান্তিপূর্ণ সেই মিছিলে পুলিশ স্বশস্ত্র হামলা চালায়। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান রাজনীতিবিদ সে দেশের সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জেটকিন প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে এবং দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা।
প্রতি বছর নারীর অধিকার এবং স্বাধীনতা আদায়ের দিন হিসেবে এ দিনকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপন করে সারাবিশ্ব। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সাল থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে দিবসটির তাৎপর্য অনুধাবন করে পরিপূর্ণ মর্যাদায় নানা কর্মসূচি পালন করার মধ্য দিয়ে।

-প্রতিবারের মতো এবারও একটি প্রতিপাদ্য এবং উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দিবসটি পালিত হবে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২১ এর প্রতিপাদ্য হলো ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব : গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’ এবং দিবসটি উপলক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সামাজিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অনেক হাসপাতালে এ দিন উপলক্ষ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি এবং বিনামূল্যে কর্মজীবী নারীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে অন্যান্যবারের মতো।

নিপীড়িত নারীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নির্যাতিত নারীদের ক্ষমতায়ন ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে গঠন করেন নারী পুনর্বাসন বোর্ড, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নে সম্পৃক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। বর্তমান সরকার নারী ও শিশুদের উন্নয়নে দারিদ্র্যবিমোচন, বাল্যবিবাহ নিরোধ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, নারী ও শিশুপাচার রোধ, যৌতুক নিরোধ আইন, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দূরীকরণে আইন প্রণয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ নারী ও শিশুদের উন্নয়নে বিবিধ কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে। এ সকল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা, শিশু একাডেমি ও জয়িতা ফাউন্ডেশন, যার মাধ্যমে নারীর অধিকার আদায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ‘মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম’ দেশব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগে ‘জয় মোবাইল অ্যাপস’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপস প্রবর্তন করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার কিংবা নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে এরকম নারী ও শিশুদের তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা প্রদান করার জন্য এই অ্যাপস ব্যবহার করা যাবে। এছাড়াও ১০৯ নম্বরে ফোন করে নারী ও শিশুসহ সকল শ্রেণির মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন। মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এ নারীদের ওপর যৌন হয়রানিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নারী নেতৃত্বে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে সম্মানজনক ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। যেসব নারী তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য নিজেদের ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন, তিনি সেসব নারীদেরকে এই অ্যাওয়ার্ড উৎসর্গ করেছেন। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গণে লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য তাঁকে ‘ডব্লিউআইপি গ্লোবাল ফোরাম অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, নারীরা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। ফরাসি বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা সংগ্রামসহ সব আন্দোলন সংগ্রামে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। পাহাড়চূড়া, জল-স্থল সকলক্ষেত্রেই বাংলার নারীদের দীপ্ত পদচারণা। বাংলাদেশের নারীরা সর্বোচ্চ পর্বতচূড়ায় দেশের পতাকা উড়িয়েছেন। ক্রীড়াক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে নেই। ক্রিকেট ও ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েরা অসামান্য অগ্রগতি সাধন করেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নারীরা সফল। দেশে-বিদেশে এদেশের মর্যাদা ও সম্মান অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছেন তারা। এগিয়ে চলেছেন দুর্বার গতিতে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম স্থানে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার, মন্ত্রী, হাইকোর্টের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সামরিক বাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ সবজায়গায় নারীর সরব উপস্থিতি। তাদের গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ বাধাহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কার্যকর বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক অর্জনের মধ্যে ছোটোখাট যে সমস্যাগুলি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে নারীর অধিকার নিশ্চিতে নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াস অব্যাহত থাকলে নারী দিবসের চেতনা সার্থক হবে এবং বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হতে পারবে এবং নারীর অধিকার আদায় সম্পূর্ণ হবে। সফল হবে এ বছরের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য সঠিক অর্থেই।


#

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com