উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভোটের মাঠ এমপিদের অদৃশ্য দখলে

প্রকাশিত: ৯:১০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৩, ২০২৪

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভোটের মাঠ এমপিদের অদৃশ্য দখলে
সদরুল আইনঃ
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) ছেলে, ভাই, ভগ্নীপতি, ঘনিষ্ঠজনেরা প্রার্থী হয়েছেন। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এবারের উপজেলা নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করছেন এমপিরা।
দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিতব্য ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। একইভাবে যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে মন্ত্রী ও এমপিদের প্রভাব বিস্তার না করার নির্দেশনার পাশাপাশি তাদের আত্মীয়দের প্রার্থী না করতে বলা হয়েছে।
 কিন্তু দলের এসব সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ঘনিষ্ঠজনদেরই প্রার্থী করা হয়েছে। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এছাড়া ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি-জামায়াত ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদের ভোটে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভোটে গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
তবে এই সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রথম ধাপে বিএনপির ৩৭ জন এবং জামায়াতের ২৫ জন নেতা মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন। গতকাল সোমবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিনে বিএনপির ১৭ জন মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। বাকি ২০ জন মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।
জামায়াতের ২৫ জনের সবাই মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। আক্ষরিক অর্থে এবারের উপজেলা ভোট হচ্ছে নির্দলীয় আদলে। আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ধাপের চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, প্রথম ধাপে চেয়ারম্যান পদে ৯৫ জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭৯ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৪ জন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। মোট ৩টি পদে ১৯৮ জন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক নির্বাচন নয়, এটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এখানে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় প্রয়োজন নয়। এবারের নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক ফ্লেভার নেই।
চার ধাপে ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে তিন ধাপের তপসিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের মনোনয়ন দাখিল কার্যক্রম শেষ হয়েছে। গতকাল ছিল প্রথম ধাপের মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। এই ধাপের ভোট হবে ৮ মে।
 দ্বিতীয় ধাপের মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন হলো ৩০ এপ্রিল। ভোট হবে ২১ মে। আর তৃতীয় ধাপের ভোট হবে ২৯ মে। স্থানীয় সরকার উপজেলা নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, মন্ত্রী-এমপিরা উপজেলা নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না। তারপরও অধিকাংশ স্থানে এই বিধান অমান্যের ঘটনা ঘটছে।
দলীয়ভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী না দেওয়া এবং বিএনপি-জামায়াতসহ অন্য দলের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় উপজেলা নির্বাচন এখনো জমে ওঠেনি। তবু মন্ত্রী-এমপিদের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অনেকটা অসহায়। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের আইজি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, ইসির মাঠ প্রশাসন ও ডিসি-এসপিদের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
 পরপর দুটি বৈঠক থেকে ভোট সুষ্ঠু করতে কঠোর বার্তা দিতে চায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের করণীয় নির্ধারণে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় নির্বাচন ভবনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কারসচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, পুলিশের আইজি, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার-ভিডিপি, ডিজিএফআই, এনএসআই মহাপরিচালক, এসপির অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শককে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
 প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে সভায় অন্য কমিশনার ও ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। এরপর সব জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আগামী ২৫ এপ্রিল বৈঠকে বসবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঐ দুই বৈঠক থেকে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেবে ইসি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। কেননা বিগত সময়ের নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাবের কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
 তারই অংশ হিসেবে উপজেলা নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজনের অংশগ্রহণ না করতে বা অংশগ্রহণের প্রক্রিয়ায় থাকলে সেখান থেকে সরে দাঁড়াতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও নির্দেশনা মানা হলেও অনেক জায়গায় অমান্য করা হয়েছে।
 দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কৌশলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, নিজের কাছের অনুসারীদের এবারের নির্বাচনে এমপিরাই প্রার্থী করেছেন।
 মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দুই প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে এক জন হলেন, মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শাজাহান খানের বড় ছেলে আসিবুর রহমান খান। আরেক প্রার্থী হচ্ছেন এমপির চাচাতো ভাই এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান পাভেলুর রহমান শফিক খান।
এছাড়া বর্তমান চেয়ারম্যান হচ্ছেন এমপির আপন ছোট ভাই অ্যাডভোকেট ওবাইদুর রহমান খান। অন্যদিকে রাজৈর উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনের এমপি খশরু চৌধুরীর বড় ভাই এবং স্থানীয় এমপি শাজাহান খানের সমর্থক বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম শাহিন চৌধুরী। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
সোমবার ছিল প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করে কোনো প্রার্থীই তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি।
পাবনার বেড়া উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর ছোট ভাই সাবেক মেয়র ও বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সভাপতি আব্দুল বাতেন এবং ভাতিজা বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক আব্দুল কাদের সবুজ তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি।
পলাশে প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে নরসিংদীর সদর ও পলাশ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। একই সঙ্গে পলাশ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলিপের সম্বন্ধী (স্ত্রীর বড় ভাই) শরিফুল হকও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
 প্রথম ধাপে আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের এমপি মাহবুব উল আলম হানিফের চাচাতো ভাই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আতাউর রহমান আতা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শেষ দিনেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি।
আতা শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো পদেই প্রার্থীরা তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। এতে করে চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান এ এইচ এম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম এবং নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনের এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে আতাহার ইসরাক শাবাব চৌধুরী।
অন্যদিকে হাতিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) ও মহিলা ভাইস চেয়াম্যান পদে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
চেয়ারম্যান পদে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলীর  ছেলে আশিক আলী ও  ভাইস চেয়ারম্যান পদে  মো. কেফায়েত উল্লাহ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে শামছুন নাহার বেগম নির্বাচিত হয়েছেন। সোমবার চেয়ারম্যান পদে জাতীয় পার্টির মুসফিকুর রহমান তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।
 গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি প্রয়াত রহমত আলীর পুত্র এবং গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জামিল হাসান দুর্জয়। তিনি বর্তমান সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বেগম রোমানা আলীর ভাই।
 ভাঙ্গুড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. মকবুল হোসেনের ছেলে ভাঙ্গুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম হাসনায়েন রাসেল।
 ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. সুলতান হোসেন খানের সমর্থক ও নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোমবার দুপুরে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে মতবিনিময় সভায় প্রার্থী সুলতান হোসেন খান নিজে এই অভিযোগ করেন।
 দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় তৃণমূল বর্ধিত সভার নামে নির্বাচনি মাঠে নেমেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) অ্যাডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন। দলীয় নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান দিচ্ছেন দলের নির্ধারিত প্যানেলকে।
এতে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে আশঙ্কা করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। নিজের ভগ্নিপতিকে নিয়ে দলীয় প্যানেল করেন তিনি। ভগ্নিপতির এই প্যানেলে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করা হচ্ছে মারুফ বিন জাকারিয়াকে। সভায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে এমপি নয়নের ভগ্নিপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মামুনুর রশিদকে একক প্রার্থী হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

লাইভ রেডিও

Calendar

May 2024
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031