উৎসর্গ করা বই এবং উৎসর্গ পাওয়া বই 

প্রকাশিত: ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৪, ২০১৮

উৎসর্গ করা বই এবং উৎসর্গ পাওয়া বই 

লুৎফর রহমান রিটন

একজন লেখকের পক্ষ থেকে পাওয়া সেরা উপহার হলো তাঁর লেখা বই। এবং সেটা অটোগ্রাফযুক্ত হলে তো সোনায় সোহাগা। সোনায় সোহাগা পর্যায়েরও অনেক উঁচু ধাপ হলো ‘উৎসর্গ’ প্রাপ্তি। একজন লেখক যখন কাউকে তাঁর লেখা বই উৎসর্গ করেন, তখন বুঝতে হবে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসাটুকুই উপহার দিয়েছেন। আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। বইয়ের ব্লার্বে লেখক পরিচিতিতে সংখ্যাটা উল্লেখ না করে বলা হয় শতাধিক। প্রথম বই ধুত্তুরি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৮২ সালে। বইটা আমি উৎসর্গ করেছিলাম মা ও বাবাকে। এরপরের বইগুলোর উৎসর্গের পাতায় উৎকীর্ণ করেছি প্রিয় প্রিয় মানুষদের নাম। একজীবনে বন্ধু তো আর কম আসেনি! সেই বন্ধুদের অধিকাংশই মুদ্রিত হয়েছেন উৎসর্গ পাতায়। কেউ কেউ একাধিকবার। কেউ কেউ সপরিবারে। সম্পর্কটা যখন পারিবারিক।

আমার বই উৎসর্গের তরিকাটা একটু ভিন্ন। কাউকে বই উৎসর্গ করলে আমি সাধারণত নিজ হাতে একটা কপি পৌঁছে দিই তাঁকে। কিন্তু একবারও বলি না বইটা তাঁকে উৎসর্গ করা। কেউ কেউ বইটা আমার সামনেই উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে নিজের নামটা আবিস্কার করেন উৎসর্গের পাতায়। কেউ কেউ বিষয়টা খেয়াল করেন পরে। এবং কেউ কেউ খেয়ালই করেন না।

যেমন, নব্বুই-এর শুরুর দিকে সম্ভবত, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মঞ্জুরে মওলা ‘১০১ গ্রন্থমালা সিরিজ’ নামের একটা প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। তাতে এক বইমেলায় ১০১টা বই প্রকাশ করেছিলো বাংলা একাডেমি, বিভিন্ন বিষয়ে। আমিও লিখেছিলাম একটা বই। নাম ছিলো ‘ফুটবল’। যেহেতু সিরিজটা আলোর মুখ দেখেছিলো বাংলা একাডেমি প্রেসের ব্যবস্থাপক অগ্রজ বন্ধু ওবায়দুল ইসলামের অক্লান্ত কর্ম তৎপরতায়, আমি তাই বইটা উৎসর্গ করেছিলাম তাঁকেই অর্থাৎ ওবায়দুল ইসলামকেই। বইটা যেদিন বেরুলো, প্রেসে তাঁর কক্ষে বসেই একটা কপি উপহার হিশেবে দিয়ে এসেছিলাম তাঁকে। ‘ফুটবল’ বইটা যে তাঁকেই উৎসর্গ করা সেটা তিনি জেনেছিলেন তিন বছর পর। এবং সেই কারণে লজ্জায় একেবারে অস্থির চঞ্চল হয়ে উঠেছিলেন। আমার বইটা তিনি উল্টেপাল্টেও দেখেননি, ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে গিয়েছিলো রুমভর্তি লোকের সামনে।

একই ঘটনা ঘটেছিলো লেখক শাহজাহান কিবরিয়ার ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালক ছিলেন তিনি। আমার সঙ্গে চমৎকার আন্তরিক ব্যক্তিগত সম্পর্ক। আগামী প্রকাশনী থেকে ‘ছোটদের বন্ধু’ নামের একটা সাক্ষাৎকারগ্রন্থ বেরিয়েছিলো আমার, ২০০০ সালে। আমি নিজে তাঁর অফিসে গিয়ে এক কপি দিয়ে এসেছিলাম তাঁকে। বইটা যে তিনি উল্টেপাল্টেও দেখেননি তার প্রমাণ পেলাম সাত/আট বছর পর। কানাডা থেকে টেলিফোনে কথা প্রসঙ্গে বিষয়টা উঠে এলে লজ্জিত তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন ব্যাপারটা।
১৯৯৯ সালে অবসর থেকে আমার লেখা কিশোর উপন্যাস ‘ভূতের ডিমের অমলেট’ বেরিয়েছিলো। বইটা আমি উৎসর্গ করেছিলাম কাইজার চৌধুরীকে। বইটা আমি নিজেই মতিঝিলে গ্রীণ্ডলেজ ব্যাংকে তাঁর অফিসে তাঁর হাতেই তুলে দিয়ে এসেছিলাম। এরপর অন্তত একশোবার দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। তিনি একবারও বলেননি উৎসর্গ পেয়ে তিনি খুশি হয়েছেন বা বিরক্ত হয়েছেন কী না। অর্থাৎ তিনিও সম্ভবত খুলেও দেখেননি বইটা।

বই উৎসর্গ বিষয়ে অনেক মজার স্মৃতি আছে আমার।
‘১০০ রিটন’ ছড়ার বইটার উৎসর্গ পাতায় আমি লিখেছিলাম–‘আবার, তৃতীয়বার রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইকেই’। অর্থাৎ এর আগে আমি আরো দু’টি বই আমি দাদাভাইকে উৎসর্গ করেছিলাম।

বিখ্যাত সাংবাদিক আজিজ মিসির তখন বাংলার বানীতে চাকরি করেন। প্রবীন এই সাংবাদিক আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। কোনো কাজ না থাকলেও প্রায়ই আমি এক চক্কর ঘুরে আসতাম বাংলার বাণীতে, মিসির ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্যে। খুব রসিক মানুষ। আমার সঙ্গে অনেক রসিকতা করতেন। আমিও করতাম। খুবই জমতো আমাদের। সাপ্তাহিক চিত্রালীতে তাঁর নিয়মিত কলামের নাম ছিলো ‘প্রবেশ নিষেধ’। প্রবেশ নিষেধ লগোর নিচে তাঁর সংক্ষিপ্ত নামটি মুদ্রি হতো ‘আমি’। অর্থাৎ কী না আজিজ মিসির। মিসির ভাই সেই কলামে আমাকে নিয়েও একটা এপিসোড লিখেছিলেন। আমার একটা সিঙ্গেলকলাম ছবিসহ ছাপা হয়েছিলো সেটা। সেই সময়ে সিনেপত্রিকা চিত্রালীর ছিলো ব্যাপক সুনাম ও কাটতি। তো মিসির ভাইকে ‘১০০ রিটন’-এর দ্বিতীয় সংস্করণের একটা কপি উপহার দিয়েছিলাম, এক দুপুরে বাংলার বাণীতে তাঁর কক্ষে চা-বিস্কুট খেতে খেতে।
এরপর অনেকদিন তাঁর ওখানে যাওয়া হয়নি।

কয়েক মাস পরে এক দুপুরে মিসির ভাইয়ের কথা মনে হলে আমি চলে গয়েছিলাম তাঁর অফিসে। আমাকে দেখেই হইহই করে উঠলেন মিসির ভাই–মিয়া তোমার খোঁজ নাই। তোমারে খুঁজতাছি হারিক্যান দিয়া।
–ক্যানো মিসির ভাই? কাহিনি কি?
–কাহিনি তো জটিল। মিয়া তুমি যে এতো খারাপ আগে তো জানতাম না!
–আমি আবার কী করলাম!
বসো বসো। চা খাও। কইতাছি। বাংলার বানী তো পড়ো বইলা মনে হয় না!
–হেহ্‌ হেহ্‌ পড়ি তো। তবে নিয়মিত না। মাঝে মধ্যে পড়ি।
–তুমি যে আমারে একটা বই উপহার দিয়া গ্যালা, অইযে ১০০ নাকি ২০০ রিটন।
–জ্বি। ১০০ রিটন।
–বইটা তুমি দাদাভাইরে উৎসর্গ কর্ছো। দেখলাম, এইটা লইয়া তৃতীয়বার তুমি উৎসর্গ কর্ছো তাঁরে। তো আমি করলাম কি, কুনু বিষয় খুঁইজা না পাইয়া তোমার অই বইটারেই বিষয় বানাইয়া বাংলার বাণীতে আমার রেগুলার কলামে নামাইয়া দিছিলাম একটা পর্ব। সেইখানে দাদাভাইয়ের প্রতি তোমার শ্রদ্ধা ভালোবাসার কথাটা ব্যাপকভাবে উল্লেখ কর্ছিলাম। হইছে কী–ইত্তেফাক থেইকা দাদাভাই তো আমারে ফুন দিছে। ফুন দিয়া কয়–আপ্নে যে লিখলেন রিটন আমারে শ্রদ্ধা করে ভালোবাসে সেইটা তো ঠিক না। সে তো আমার লগে তর্ক করে আর বেদ্দবি করে।

এইটুকু বলে আমার দিকে মজার একটা লুক দিয়ে মিসির ভাই বললেন–সত্য নাকি? তুমি তর্ক আর বেদ্দবি করো তাঁর লগে?
–হ। ঘটনা সত্য। জীবনে বহুত তর্ক করছি দাদাভাইয়ের লগে। দাদাভাই সেইটারে বেয়াদবি ধরলে তো বিপদ। তবে এইটা তো ঠিক, আমার জীবনে দাদাভাই না থাকলে আমি তো ছড়াকার না হইয়া পুরান ঢাকার মাস্তান হইতাম। গুণ্ডা হইতাম। আমি যে লেখক হইছি সেইটা তো দাদাভাইয়েরই জন্যে। তিনিই তো আমার প্রথম লেখা ছাপছিলেন। তাঁর পাতায় লেইখা লেইখাই তো আমি পরিচিতি পাইছি। ছড়াকার হইছি। তাই বারবার সেই কৃতজ্ঞতা থিকা তাঁরে আমি বই উৎসর্গ করি। তিনটা তো কর্ছি, আপনের আশীর্বাদ থাকলে আরো করুম মিসির ভাই।
–দেও দেও আশীর্বাদ কইরা দেই–বলে মিসির ভাই চেয়ার থেকে উঠে খানিকটা ঝুঁকে আমার মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, বয়স্ক মানুষ, সিনিয়ার মানুষ, বুঝলা না, তরুণ গো ভুল বুঝতে রেডি হইয়া থাকে। তোমার উৎসর্গরেও ভুল বুঝছে।
–থাক মিসির ভাই। বুঝুক ভুল। সেইটা তাঁর দায়িত্ব। আমি আমারটা করছি। তিনি না বুঝলে তো কিছু করার নাই!
–ঘটনা অই পর্যন্ত থাকলে তো হইছিলোই।
–আরো ঘটনা আছে নাকি?
–আছে আছে। ঘটনা তো ব্যাপক আকার ধারণ করছে মিয়া। দাদাভাই আমার ফুন দিয়া কইলো ফরিদপুর থিকা তাঁর কচি-কাঁচার মেলার আঞ্চলিক শাখার এক সংগঠক যিনি আবার অধ্যাপকও, আমার লেখাটার উপ্রে একটা প্রতিবাদ পাঠাইবো। আমি য্যান ছাপাইয়া দেই।
–বলেন কী! তারপর?
–তারপর আর কি! দাদাভাই বইলা কথা। এত্তো গণ্যমান্য ব্যক্তি। অথচ তুমি করো বেদ্দবি তাঁর লগে! প্রতিবাদটা পাঠাইলো। আমিও সেইটা চিঠিপত্র কলামে ছাইপা দিয়া রক্ষা পাইছি। মিয়া আর কাম পাওনা! সিনিয়রগো ক্ষ্যাপাও! তোমার তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার!

পিওন ডেকে মিসির ভাই লম্বা স্কেল টাইপের দুটি কাঠ দিয়ে বাঁধাই করা মান্থলি ফাইলের একটা বিরাট বোঝা টেবিলের ওপর আনিয়ে বললেন, আগে আমার লেখাটা পড়ো, তারপর অধ্যাপক সাহেবের প্রতিবাদটাও পড়ো। তারপরে কিছু কওয়ার থাকলো কইও। আরেক কাপ চা খাও। এই ফাঁকে আমি একটু লেখি।

খুব মনোযোগ দিয়ে মিসির ভাইয়ের লেখাটা পড়লাম। আমার মতো একজন তরুণ লেখককে বিপুল ভাবে সাধুবাদ জানিয়ে উদ্দীপনামূলক একটা কলাম। অধ্যাপকের প্রতিবাদটাও পড়লাম। তারপর মিসির ভাইকে বললাম,
–দাদাভাই না হয় আমার ওপর ক্ষিপ্ত বা আমার ওপর রেগে আছেন কিংবা আমার ওপর অভিমান করেছেন। সেটা হতেই পারে। কিন্তু মিসির ভাই এই অধ্যাপক ব্যাটা তো মহা মূর্খ! বই উৎসর্গের ব্যাপারটা বোঝারও ক্ষমতা নাই মূর্খটার। মূর্খটা লিখেছে– বারবার বা তৃতীয়বার বই উৎসর্গ করাটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত! এই মূর্খটা জানেই না একজন লেখক যখন কাউকে বই উৎসর্গ করে তখন সেখানে কতোটা ভালোবাসা থাকে। কতোটা শ্রদ্ধা থাকে। কতোটা মমতা থাকে!

মিসির ভাই বললেন–হ। তোমার লগে একমত। কিন্তু কী করুম! দাদাভাই বইলা কথা। ছাপতেই হইলো। এখন তুমি একটা কাম করো। যেই কথাগুলা আমারে কইলা অই অধ্যাপকরে লইয়া সেই কথাগুলাই একটু ভদ্র ভাষায় লেইখ্যা দিয়া যাও। অর চিঠি যেমনে ছাপছি তোমারটাও তেমনিভাবে ছাইপা আমি একটু হালকা হই। তোমার উপ্রে অন্যায় হইছে। এহন তোমার ভাষ্য না ছাপাইতে পারলে আমার তো ভালো লাগতাছে না মিয়া।
আরেক কাপ চা খাও। আর এই লও প্যাড। ইচ্ছা মতোন ল্যাখো। আমি কাইলকাই ছাইপা দিমু।

হ্যাঁ, পরেরদিনই ছাপা হয়েছিলো ফরিদপুরের অধ্যাপকের প্রতিবাদের প্রতিবাদটা।

০২
আমি কাকে কাকে বই উৎসর্গ করেছি সেই প্রসঙ্গ মুলতবি থাকুক। বরং একটু বলি আমাকে উৎসর্গ করা দু’একটা বই এবং তাঁর লেখকের কথা।

১৯৯৭/৯৮ সাল। আমি তখন ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে কাঁটাবনের সোনালি ব্যাংকের ঢাল সংলগ্ন একটা তিনতলা বাড়িতে থাকি। এক রাতে এক লোক অনেক ফুল কয়েক প্যাকেট মিষ্টি আর চকচকে র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটা বই দিয়ে গেলো। বললো, সাগর সাহেব পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ কী না ফরিদুর রেজা সাগর ভাই পাঠিয়েছেন। র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো বইটা খুলে দেখি বইটা তিনি আমাকেই উৎসর্গ করেছেন! সাগর ভাই এমনই। বই উৎসর্গই যথেষ্ট নয়। উৎসর্গ করা বইয়ের সঙ্গে ফুল আর মিষ্টিও পাঠাবেন।

আমার সমসাময়িক লেখক বন্ধুরা প্রায় প্রত্যেকেই আমাকে তাঁদের বই উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গ করেছেন বিখ্যাত সিনিয়র লেখকরাও।
সিনিয়রদের সিনিয়র লেখকদের মধ্যে আছেন আহমদ রফিক, ফয়েজ আহমদ, আসাদ চৌধুরী, আবেদ খান, শাহজাহান চৌধুরী, আলী ইমাম, ইমদাদুল হক মিলন, হাসান হাফিজ, শাহাবুদ্দিন নাগরী,
মোহিত কামাল, প্রণব ভট্ট…।
দু’একজন ছাড়া আমাকে বই উৎসর্গ করেছেন সতীর্থ প্রায় সব লেখক বন্ধুই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতি নবীন কম বয়েসী কয়েকজন লেখকও। তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। স্মৃতি থেকে কয়েকজনের নাম বলি– রাজু আলাউদ্দিন, ফারুক নওয়াজ, সৈয়দ আল ফারুক, সুজন বড়ুয়া, আসলাম সানী, আহমাদ মাযহার, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, আনজীর লিটন, রাশেদ রউফ, সজল আশফাক, মিজানুর রহমান কল্লোল, আহমাদ উল্লাহ, হাফিজ আল ফারুকী, আখতারুল ইসলাম, রমজান আলী মামুন, হাসান স্বজন, আহমেদ সাব্বির, আকতার আহমেদ, পাশা মোস্তফা কামাল, রিফাত কামাল সাইফ, শামীম আল আমিন…।

তবে বেশি উৎসর্গ আমি পেয়েছি আমার অনুজ প্রতীম তরুণ লেখকদের কাছ থেকে। তরুণলেখকবন্ধুদের কাছ থেকে উৎসর্গ পাওয়ার ক্ষেত্রে আমি নিজেকে বিপুল ভাগ্যবান বলে মনে করি। এমন অনেক লেখক বন্ধু আমাকে তাঁদের বই উৎসর্গ করেছেন যাঁদের সঙ্গে আমার আক্ষরিক অর্থে ব্যক্তিগত মেশামেশিটা নেই। কিন্তু উৎসর্গ পেয়ে আমি উপলব্ধি করেছি–ভালোবাসতে হলে বা ভালোবাসা পেতে হলে খুব কাছে থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার বিষয়টা বুকের গহীনে থাকে।

উৎসর্গপত্রে লেখা বাক্য পঙ্‌ক্তি বা পঙ্‌ক্তিসমূহে হৃদয়ের গহিনে থাকা অনুভবটাই প্রতিফলিত হয়।
নিকট অতীতে উৎসর্গ পাওয়া কয়েকটা বইয়ের কথা বলি এবার।

তানভীর তারেকের সপ্রতীভ উপস্থিতি তারকামহলে। সে নিজেও একজন তারকা। সঙ্গীতশিল্পী উপস্থাপক এবং সাংবাদিক হিশেবে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গণ দাপিয়ে বেড়ায় সে। ওর স্ত্রী অনিমা রায়ও খুবই বিখ্যাত। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিশেবে একটা বিশেষ অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে অনিমা। ভালোবাসায় টইটম্বুর এই যুগলকে আমার খুবই ভালো লাগে। তবে তানভীর তারেক আমাকে কতোটা ভালোবাসে সেটা আমি জেনেছি ওর একটা বই হাতে পেয়ে। বইটির নাম ‘আলোমহল’। উৎসর্গপত্রে গিয়ে চোখ তো আমার ছানাবড়া! কী কাণ্ডই না করেছে তানভীর তারেক! এতো ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাপূর্ণ এতো বড় উৎসর্গ আমি কখনোই পাইনি। (কয়েক বছর আগে বেশ বড় একটা উৎসর্গ পেয়েছিলাম জনপ্রিয় তরুণ লেখক ইশতিয়াক আহমদের কাছ থেকে। বইটা সঙ্গে নেই বলে উদ্ধৃতি দিতে পারলাম না।) তারেকের উৎসর্গপত্রটা মুদ্রিত হয়েছে খুদে খুদে হরফে পূর্ণপৃষ্ঠাব্যাপি!

খানিকটা উদ্ধৃত করি–”বলছি আমি ব্রাকেটে…’ এরপর ছোট্ট দু’টি লাইন। তারপর তা আর শব্দ থাকেনি। বারুদ হয়ে গেল! ছোট্ট করে ছোট ছোট শব্দে কত বড় বড় বাউদ তৈরি করা যায় তা দেখাতে পারেন এই মানুষটি। প্রখ্যাত এই মানুষটির সাথে আমার এক মোহের সম্পর্ক। ঢাকা শহরে অনেকবার দেখা হয়েছে। প্রতিবার দূরেই থেকেছি। কাছে যাইনি।…কানাডা থেকে বইমেলা উপলক্ষে লেখার টানে, লেখকের টানে ঢাকায় ছুটে আসেন তিনি। আর আমরা ছুটে যাই তার সাথে আড্ডার লোভে।…..চ্যানেল আইতে সাগর ভাইয়ের রুমটার সামনে ছোট্ট চেয়ার টেবিলে তাকে বসতে দেখি। সদালাপী এই মানুষটি ঐ শব্দের বারুদ কীভাবে তৈরি করেন আমি বুঝি না। তাকে দেখলে তো মনে হয়, তিনি প্রেমের উপন্যাস লিখেন। কি জানি! এ আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি। তবে আমীরুল ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা যতটুকু, তাতে রিটন ভাই বড় মাপের প্রেমিকও।…এখন আমি তার ছড়ার চাইতেও গদ্যের বড় ভক্ত।…’আলোমহল’ নামের এই রহস্য উপন্যাসের মতোই রিটন ভাইকেও মনে হয় খানিক রহস্যজালে বোনা মানুষ। কি জানি! এ আমার নিজস্ব উপলব্ধি। …ভক্তের কাছে এমন লক্ষ লক্ষ উপলব্ধি হয়ে বেঁচে থাকুন আপনি। ছড়া আর অনবদ্য গদ্যে আঁকতে থাকুন আপনার স্বপ্নের যাত্রাপথ।…।”
(প্রিয় তারেক, ২০১৭র মার্চে ধানমন্ডি ২৭ নাম্বারের বার্বিকিউ(?) নামের কাবাবের দোকানটার প্যাটিওতে তোমার সঙ্গে আমার শেষ আড্ডার সেই তুমুল বাতাসের রাত্রির কথা স্মৃতিতে এখনও ঝলমল করছে।)

দু’তিন বছর আগে নাট্যকার গীতালি হাসানের ভ্রমণ কাহিনি ‘সাগরে পাহাড়ে’ বইটি ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বইমেলায় না বেরিয়ে বেরিয়েছিলো নিউইয়র্ক বইমেলায় মে মাসে। বইটির উৎসর্গপত্রে গীতালি হাসান লিখেছেন–‘প্রখ্যাত ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটন।’ নিউইয়র্ক বইমেলায় তিনি আমাকে উৎসর্গ করা বইটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন পরম মমতা আর ভালোবাসায়। শাহ্‌নাজ মুন্নী তার গল্পসংকলন ‘হৃদয়ঘরের বারান্দায়’ বইটি দু’জনকে উৎসর্গ করেছে।উৎসর্গপত্রে মুন্নী লিখেছে–‘আবেদ খান ও লুৎফর রহমান রিটন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাসহ।’ যে ক’জনের গল্প আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি শাহ্‌নাজ মুন্নী তাদের অগ্রগণ্য একজন।

প্রীতিভাজন কবি মুজিব ইরম আমাকে উৎসর্গ করেছে যে বইটি তার প্রচ্ছদে ফ্রি হ্যান্ড লেটারিং-এ উৎকীর্ণ–মুজিব ইরম প্রণীত চম্পুকাব্য! ওর কবিতা আমাকে আকর্ষণ করে প্রবলভাবে। একটা অন্যরকম মজা আছে ওর কবিতায়। সহজ সরল আটপৌড়ে একটা ভঙ্গি আছে মুজিবের উচ্চারণে। বইমেলায় বইটা আমি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম বলে পরবর্তীতে কানাডার ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠিয়ে দিয়েছে সে! উৎসর্গপত্রে মুজিব লিখেছে–‘লুৎফর রহমান রিটন, ছড়ার রাজা প্রিয় রিটন ভাইকে প্রীতি উপহার।’

কোনো ছড়াকারের ‘ছড়াসমগ্র’ উৎসর্গ পেলে আনন্দটা কেনো জানি অনেকগুণ বেশি অনুভব করি। অগ্রজ ছড়াকার আবু সালেহ-এর সঙ্গে আমার রাজনৈতিক দূরত্ব আকাশ আর পাতালের। কিন্তু তারপরেও সালেহ ভাই আমাকে ভালোবাসেন। শুনেছি এ বছর তাঁর একটি ছড়াসংগ্রহ বেরিয়েছে যেটা তিনি আমাকেসহ কয়েকজন ছড়াবন্ধুকে উৎসর্গ করেছেন। বইটা এখনো দেখিনি। লোকমান আহম্মদ আপনও তার ‘কানমলা ভিটামিন-এ’ আমাকে উৎসর্গ করেছিলো আরো কয়েকজনের সঙ্গে। বশির আহমদ জুয়েল তার ‘ভালোবাসার ১০০ ছড়া’র বইটির উৎসর্গপত্রে লিখেছিলো–‘লুৎফর রহমান রিটন, ‘ভালোবাসার কোচিং সেন্টার’-এর সত্বাধিকারী।’

ছড়াবন্ধু মালেক মাহমুদ তার ছড়াসমগ্র বইটি আমাকে উৎসর্গ করেছে! শুধু তাই নয়, মালেক উৎসর্গপত্রে আমার একটা ক্যারিকেচারও ব্যবহার করেছে। উৎসর্গপত্রে মালেক মাহমুদ লিখেছে–‘ছড়া লিখে ছড়াকার/ছড়াফুল যিনি/মজা ছড়া পাঠ করে/ছড়া রঙ চিনি।/প্রাণ খুলে কথা বলে/ মন রাখে তাজা/ছড়ার ভুবনে তিনি/রাজা-মহারাজা।/ শ্রদ্ধেয় ছড়াশিল্পী/লুৎফর রহমান রিটন।’
ছড়াবন্ধু সম শামসুল আলমও আমাকে উৎসর্গ করেছে তার ‘ছড়াসমগ্র’ নামের সংগ্রহটি। সম আমাকে কতোটা ভালোবাসে সেটা এক দুই বাক্যে বোঝানো দুস্কর। উৎসর্গপত্রে সম লিখেছে–‘ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন আপনি ছড়ার পৃথিবী সমৃদ্ধ করেছেন’। এর আগে ২০১৩ সালেও সম আমাকে আরেকটা বই উৎসর্গ করেছিলো। বইটার নাম ছিলো–‘ব্যাঙ বেড়ালের ছড়া’।

২০১৭ সালে বইমেলার ভিড়ে এক সন্ধ্যায় শাহনেওয়াজ চৌধুরী তার একটা গল্প সংকলন আমার হাতে তুলে দিয়েছিলো কম্পিত হাতে, তুমুল আবেগ নিয়ে। পাতা উলটে দেখি ওটা আমাকেই উৎসর্গ করা! একটা দীর্ঘ আলিঙ্গণে আমি আমার আনন্দের অনুভবটা ওকে জানিয়েছিলাম। রকিবুল আমিন নামের এক নবীন লেখক আমাকে উৎসর্গ করা তার জীবনের প্রথম বই ‘ভূতের বাড়ি অস্ট্রেলিয়া’র উৎসর্গপত্রে লিখেছে–‘লুৎফর রহমান রিটন,ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক, বাংলা শিশুসাহিত্যকে যিনি অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছেন। যার হাতের স্পর্শে বাংলা শিশুসাহিত্য ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় সেই প্রিয় মানুষকে।’ আবু তসলিম তাঁর ‘শূন্য পাত্র ভেতর ফাঁপা’ বইটির উৎসর্গপত্রে লিখেছেন–‘আমার মনোজগতে ছড়া লেখায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী প্রিয় ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন।’

আমাকে উৎসর্গ করা ‘আমজনতার ছড়া’ নামের বইটির উৎসর্গ পাতায় একটা ছড়া লিখেছেন অরুণ শীল। ছড়াটা উদ্ধৃত করছি– ‘কেউ ছড়া লিখে হাজারে হাজারে বিকোতে ঘুরছে বাজারে/ কেউ ছড়া লিখে হাজারে হাজারে পটাতে চাইছে রাজারে।/ কেউ ছড়া লিখে সাজে নিজে রাজা কেউ সাজে আরো কত কী!/ কেউ ছড়া লিখে ভাবে গেছি টিকে ছড়া-মন্ত্রীও হত কি?/ প্রস্তুতিহীন কেউ কেউ এসে মিল ধরে মারে খামচা,/ তাদের লেখার প্রশংসা করে স্বার্থ-চতুর চামচা।/ কত ছড়াকার! কত কত ছড়া! মনে দাগ কেটে যায় না/লিখছে সবাই পাঠক কী চায় জানতে কেউ তা চায় না।/ এপার ওপার ঘুরে ছড়া পড়ে বুঝেছি ছড়ার মূল্য/ লুৎফর রহমান রিটনই ছড়া-সম্রাট তূল্য।’

এবছর আমার যাওয়া হয়নি বইমেলায়। কিন্তু বইমেলায় অনুপস্থিত থাকলেও উৎসর্গ বঞ্চিত ছিলাম না মোটেই। ছড়াবন্ধু পলাশ মাহবুব, সোহেল মল্লিক, খালেদুর রহমান জুয়েল, মোহন খান এবং কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর উৎসর্গ ঠিকই জুটে গেছে আমার। পলাশ মাহবুবের বইটির নাম–না ঘুমানোর দল। উৎসর্গপত্রে পলাশ লিখেছে–‘লুৎফর রহমান রিটন, প্রিয় ছড়াকার, প্রিয় লেখক, প্রিয় মানুষ।’ সোহেল মল্লিকের বইয়ের নাম ‘নির্বাচিত ছড়া’। উৎসর্গপত্রে সোহেল লিখেছে–‘বাংলা ছড়াসাহিত্যের সুপারস্টার লুৎফর রহমান রিটন শ্রদ্ধাস্পদেষু।’ খালেদুর রহমান জুয়েল তার ‘চারটি বিড়াল ডার্টি বিড়াল’-এর উৎসর্গপত্রে লিখেছে–‘লুৎফর রহমান রিটন, যাঁর আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে আমার আরেকটা সত্তআর সূচনা হয়েছিলো–শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক।’ খালেদুর রহমান জুয়েল তার ‘চারটি বিড়াল ডার্টি বিড়াল’-এর উৎসর্গপত্রে লিখেছে–‘লুৎফর রহমান রিটন, যাঁর আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে আমার আরেকটা সত্তআর সূচনা হয়েছিলো–শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। কথাশিল্পী-নাট্যকার মোহন খান তাঁর ‘ভূতটাকে একটুর জন্য ধরা গেল না’ বইটির উৎসর্গপত্রে লিখেছেন–‘প্রিয় লেখক প্রিয় মানুষ লুৎফর রহমান রিটন।’

বরিশাল থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসা জসিম মল্লিক এখন কানাডার টরন্টোয় থাকেন। গেলো সপ্তাহে এক রাতে দেখা হলো তাঁর সঙ্গে টরন্টোতে। কন্যার কাছ থেকে সদ্য উপহার পাওয়া তাঁর লেটেস্ট ঝাঁ চকচকে কালো নিশান গাড়িটায় জোর করে বসালেন আমাকে ড্রাইভিং সিটে। বললেন, আপ্নে এইখানে বসেন।
জসিম এমনই। আমাকে খুব ভালোবাসেন। যদিও হাসতে হাসতে বলেন, আপ্নারে আমি ভয়ও পাই!
জসিম মল্লিক তাঁর ‘স্মৃতির নির্জনতা’ নামের বইটা আমাকে উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন–‘লুৎফর রহমান রিটন/একজন অবাক করা মানুষ। ঢাকায় পা দেয়ার পর থেকেই মানুষটাকে আমি চিনি। পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে দেখছি। যত দেখি দেখার শেষ হয় না। তিনি একজন বিখ্যাত ছড়ালেখক হলেও আমি তাঁর গদ্যেও সমান ভাবে মুগ্ধ এবং তারচেয়েও অনেক বেশি মুগ্ধ হই তাঁর সান্নিধ্য পেলে।’
জসিম আমার অনেক গোপন কষ্টের কথা জানে। আমিও জানি জসিমের গভীর গোপন বেদনার আখ্যান।

২০১৭র বইমেলায় এক সন্ধ্যায় একটা স্টলের সামনে থেকে আমাকে পাকড়াও করলো আনিসুল হক–আসেন তো একটু আমার সঙ্গে।
–কোথায় যাইতে হবে বলো তো? আমাকে হাত ধরে টানতে টানতে আনিস বললো
–একটা জিনিস দেখবেন চলেন তো!
বলতে বলতে আমাকে এক রকম ধরেই নিয়ে গেলো আরেকটা স্টলে। আমাকে দাঁড় করিয়ে সেই স্টলে ঢুকে একটা বইতে কিছু লিখে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো–এই ন্যান আমার নতুন বই।

‘গুড্ডুবুড়ার হাসিসমগ্র’ নামের বইটার মলাট খুলতেই দৃশ্যমান হলো উৎসর্গের পাতাটা–‘লুৎফর রহমান রিটন/ছোটবেলায় তিনি ছিলেন গুড্ডুবুড়ার মতো। ভালো করে খেয়েদেয়ে হয়ে গেলেন বাংলাদেশের সেরা ছড়াকার।’
গুড্ডুবুড়া ছোটদের জন্যে লেখা হাসির গল্পের একটা সিরিজের প্রধান চরিত্র। ছোটরা গুড্ডুবুড়াকে ভালোবাসে তাই আনিস চৌদ্দটা গল্প লিখেছে ওদের জন্যে। সেটারই সমগ্র সে আমাকে উৎসর্গ করেছে কারণ–‘প্রথমে গুড্ডুবুড়া বোকা থাকে। পরে খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করে সে হয়ে যায় বুদ্ধিমান।’ আমার বুঝতে আর বাকি থাকে না আনিসুল হক আমাকে আমার ছড়ার চরিত্র ‘আবদুল হাই’ মনে করে! ঐ যে আবদুল হাই/করে খাই খাই/এক্ষুণি খেয়ে বলে কিছু খাই নাই! আমি লিকলিকে শরীরের হলে, আমি মোটাসোটা গাপ্পুস টাইপের না হলে কি আর এই উৎসর্গ পেতাম! হাহ্‌ হাহ্‌ হাহ্‌।

সবশেষে যে বইটার কথা বলবো সেটার নাম ‘ছড়াছড়ি’। আমাদের প্রখ্যাত কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ছড়ার বই। সুব্রত চৌধুরীর করা প্রচ্ছদ আর অলংকরণে বইটা বের করেছে চন্দ্রাবতী একাডেমি। উৎসর্গপত্রে সিরাজী ভাই লিখেছেন–‘লুৎফর রহমান রিটন প্রিয়বরেষু।’

০৩
গেলো বছর জুলাই মাসে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী আমাদের অটোয়ার বাড়িতে এসেছিলেন আমাকে আর শার্লিকে ‘সান্নিধ্যের মধুময় স্মৃতি’ উপহার দেবেন বলে। সিরাজী ভাইয়ের কন্যা অর্চি ছিলো বিটিভির শিশুশিল্পী। আমার বহু ছোটদের অনুষ্ঠানে অর্চি অংশ নিয়েছে। সেই সুবাদে অর্চির মায়ের সঙ্গেও আমার চেনাজানা অনেক আগে থেকেই। কানাডার অন্টারিওর লডন শহরে থাকে অর্চি। মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন কবি, সস্ত্রীক। এবং বাবা মা আর কন্যাকে ড্রাইভ করে অটোয়ায় নিয়ে এসেছে আমাদের সেই ছোট্ট অর্চি। বহুবছর পর অর্চিকে দেখে মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিলো। মেয়েটা এখন অনেক চুপচাপ হয়ে গেছে। অবাক হয়েছি অর্চির কন্যাকে দেখে। ওর কন্যাকে বললাম, তুমি এখন যে বয়েসের ঠিক সেই বয়েসেই তোমার মা অর্চি আমার টেলিভিশন অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতো। কী অবাক কাণ্ড বলো তো! কতো বড় হয়ে গেছে তোমার মা! আগে সে-ই ছিলো ছোট্ট একটা মেয়ে আর এখন কী না তারও একটা মেয়ে আছে তোমার মতোন! আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেলাম!

অটোয়ায় আমাদের ছোট্ট বাড়িটা কী রকম আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠেছিলো সেই দুপুরে, হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মতো বিখ্যাত একজন কবিকে পেয়ে। সিরাজী ভাইকে উপহার দেবো বলে বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর দু’টো বইয়ের প্রচ্ছদকে ফ্রেমবন্দি করে একটা টি-শার্ট ছাপিয়ে বাড়িতে এনে রেখেছিলাম আগেই। টি-শার্টটা সিরাজী ভাইকে দিতেই শিশুর মতো উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন তিনি। বিস্ময়কর ঘটনা, সিরাজী ভাইও ঠিক ওই দু’টো বইই সঙ্গে করে এনেছেন আমাকে আর শার্লিকে দেবেন বলে!

যে বইটা পড়ে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে চিনেছিলাম সে বইটার নাম ছিলো ‘মধ্যরাতে দুলে ওঠে গ্লাস’। আমার ব্রত, যদি ভালোবাসো,কবিকে আপ্যায়ন করো সোনালি শিশিরে। অর্চি আর ওর মায়ের মৃদু আপত্তিকে বাতাসে মিলিয়ে দিয়ে চকচকে গ্লাসে সিঙ্গেল মল্টের সোনালি শিশিরের সঙ্গে কয়েক টুকরো আইসকিউবের মিথষ্ক্রিয়া ঘটালাম। আহা কী যে তৃপ্তিভরা চুমুক সিরাজী ভাইয়ের! দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই!

আমাদের বেলকনি থেকে অটোয়া রিভার দেখা যায়। ভূপেন হাজারিকার সেই ‘অটোয়া থেকে অস্ট্রিয়া হয়ে প্যারিসের ধুলো মেখেছি’-র অটোয়া রিভার। সিঙ্গল মল্টে ছোট্ট চুমুক দিতে দিতে সিরাজী ভাই জানালেন, একটা ছড়ার বই বেরুচ্ছে তাঁর ২০১৮র বইমেলায়। চন্দ্রাবতী বের করবে। এবং বইটা তিনি আমাকে উৎসর্গ করেছেন। শুনে আমি আমার উচ্ছাস প্রকাশ করলাম।
আরো কয়েক দফা চুমুকের পর সিরাজী ভাই বললেন, ‘বহু বছর আগে, আশির দশকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে আমার ছড়ার বই ‘ইল্লিবিল্লি’ বেরুনোর পর রিটন আপনি বলেছিলেন কী লিখেছেন এইসব? আপনার তো ভাই ছড়াই হয় না!
এই বইটা তাই আপনাকে উৎসর্গ করেছি।
পড়ে দেখবেন ছড়া হলো কী না!
হায় হায়! সিরাজী ভাইয়ের গ্লাস তো দুলে উঠেছিলো মধ্যরাতে। আমার গ্লাসটা তো দুলে উঠলো এই ভরদুপুরেই!
এইরকম কথা বলেছিলাম আমি সিরাজী ভাই! আপনাকে!! হায় হায়।

তরুণ বয়েসে কাল্পনিক বিপুল প্রতিভার সীমাহীন চাপে আমরা কতো কি উচ্চারণ করি! প্রতিষ্ঠিতদের অস্বীকার করার একটা অযৌক্তিক তাড়নাও সক্রিয় থাকে সেই সময়ে মস্তিষ্কের চিপাগলির আনাচে কানাচে। পরিণত বয়েসে এসে সেই কাণ্ডগুলোকে তখন নিতান্তই হাস্যকর বলে গোপনে লজ্জা পেতে হয়। এই যেমন এখন আমি পাচ্ছি।

কী মধুর প্রতিশোধ নিলেন সিরাজী ভাই! একমাত্র সৃজনশীল লেখকের পক্ষেই সম্ভব এটা! জয়তু উৎসর্গ!
অটোয়া ০৩ জুন ২০১৮

[ পুনশ্চ > নিকট অতীত, স্মৃতি নির্ভর এবং নাগালের মধ্যে থাকা বই নিয়ে লেখা। কারো কারো নাম এবং বই অবশ্যই বাদ পড়েছে। রাগ বা অভিমান না করে ইনবক্সে সহযোগিতা করুন প্লিজ! ]