একজন সৎ ও ত্যাগী জননেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া

প্রকাশিত: ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০১৭

একজন সৎ ও ত্যাগী জননেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া

সংগ্রাম দত্ত
সিলেট বিভাগের আপসহীন ত্যাগী সংগ্রামী নেতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মোঃ শাহজাহান মিয়া ১৯৩৮ সালে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানার কালাপুর ইউনিয়ন এর লামুয়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে শিক্ষা জীবনের ইতি টেনে এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর সংকল্প নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা ঘোষণা করার দাবী তোলা হয়।
পাক সরকার নানা ইস্যুতে বাংলাকে কটাক্ষ করতে থাকে। এর প্রতিবাদে বুদ্ধিজীবি ও সচেতন রাজনীতিবদরা সারাদেশে আন্দোলন শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণার দাবীতে শ্রীমঙ্গলে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৫২ এর ২১ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে শ্রীমঙ্গলে তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলেন পশ্চিমা পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। তখন থেকেই পরিচিত হয়ে উঠেন জনতার সাথে।
১৯৫৭ সালে ন্যাপ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি গরীব ও মেহনতী মানুষের মুক্তির জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে ন্যাপে যোগদেন। ন্যাপকে সামনে রেখে তিনি সকল অন্যায়-অত্যাচার-অনাচার-সাম্প্রদায়িকতা-সাম্রাজ্যবাদ ও শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আপসহীন ভাবে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ন্যাপকে সংগঠিত করতে থাকেন।
১৯৬২ সালে পাক জেনারেল আইয়ুব খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষা আন্দোলনে এলাকার ছাত্রদের উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়ে সচেতন করে তোলেন।
স্বাধিকার আন্দোলনে এলাকার জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করায় তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ’৬৩ সালে পাক আমলের ধনিক শ্রেণী শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পাহাড় এর বিস্তীর্ণ এলাকার ১৬ হাজার ৬০ একর জমির ১২ হাজার একর লিজ নিয়ে এলাকায় বসবাসকারী টিপরা, চা শ্রমিক বংশোদ্ভুত লোকজন, পাহাড় কামলা, বেকার, দিনমজুর, কর্মজীবি কৃষক ও শ্রমিককে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছিলো। ধনী চা বাগান মালিক গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে পাক সরকারের পুলিশ-ম্যাজিষ্ট্রেটকে লেলিয়ে দিলো তাদের বিরুদ্ধে। সেই চা বাগান বন্দোবস্তকারী তৎকালীন ধনাঢ্য ব্যক্তি এম.এল.এ কেরামত আলী, হামিদুর রহমান, এম আর খান, জহীরুল কাইয়ুম, মামুনুর রশীদ গনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অধিকার সংরক্ষনের জন্য বালিশিরা এলাকার মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। তৎকালীন সময়ে দেশবরণ্য নেতারা প্রখ্যাত ন্যাপ নেতা শাহজাহান এর নেতৃত্বেই বালিশিরা এলাকার মানুষকে সমবেত ও সংগঠিত করে পূর্ব পাকিস্তানে দুর্বার গণ আন্দোলন গড়ে তোলেন। বাধ্য হয় পাক সরকার নতি স্বীকার করতে। সেদিনকার আন্দোলনে যারা মোঃ শাহজাহানকে দেখেছেন তারা কখনোই ভুলতে পারবে না এই মহান নেতাকে। আন্দোলন এতই তীব্ররূপ ধারণ করেছিলো যে তৎকালীন প্রাদেশিক গভর্ণর জেনারেল আজম খানকে পর্যন্ত ঘটনাস্থলে আসতে হয়েছিল। তাঁর আশ্বাস অনুযায়ী স্থানীয় কৃষকদের পাহাড়ী জমি বন্দোবস্তের ব্যাপারে আংশিক সুরাহা হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে প্রতিবছরই শ্রীমঙ্গলে ন্যাপনেতা মোঃ শাহজাহান ও রাসেন্দ্র দত্তের প্রচেষ্টায় বালিশিরার শহীদ দিবস ১৯ শে ফেব্রুয়ারী পালন করা হত। স্বাধীনতার পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণীর প্রভাব শালী নেতা কর্মী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বালিশিরা ইউ এস এফ এর জমিতে কোটি কোটি টাকার বনাঞ্চল উজাড় করতে থাকে। এর প্রতিবাদে তিনি প্রতিবাদ, মিছিল ও মিটিং করেছেন প্রায় ২০ বছর। তাঁর শেষ জীবনে বয়স বাড়ার সাথে ও আর্থিক দৈনতার কারণে এ আন্দোলনের তীব্রতা কমে যায়। অনেকে আবার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হয়ে আন্দোলনকে ছুরিকাঘাত করেছে। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান চা শ্রমিক সংঘ- এর নেতৃত্বে থেকে বিশাল চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলন করেছেন দীর্ঘদিন। এর পাশাপাশি তৎকালীন সিলেট জেলার বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব ও তিনি দিয়েছেন।
১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ এর সম্মিলিত বিরোধীদলের পক্ষে যে নির্বাচনী পরিচালনা কমিটি শ্রীমঙ্গলে হয় তিনি তার অন্যতম সদস্য ছিলেন। এসময়ে নির্বাচন পরিচলনা করতে গিয়ে শাসক গোষ্ঠীর হাতে তিনি আক্রমনের শিকার হন।
’৬৯ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীর ক’দিন পূর্বে যে কজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের প্রচেষ্টায় শ্রীমঙ্গল পৌর টাউন কমিটির মাঠে মুসলীম লীগের বিরোধীতা সত্ত্বেও শ্রীমঙ্গলে প্রথম শহীদ মিনার গড়ে তুলেছিলেন তিনি তাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন।
’৭০ সালের ৬ এপ্রিল পাকিস্তান সরকারের পুলিশ তাঁকে বিছিন্নতাবাদী আন্দোলন করা এবং পাকিস্তান ভাঙ্গার অভিযোগে জয়বাংলা মামলায় সিক্সটি এমএল আর ক্লজ এইট এ ৮ (ক) ধারা বলে গ্রেফতার করে। এসময় তিনি ছাড়াও এ অভিযোগে ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত, ছাত্রলীগনেতা এম.এ রহিম ও এস.এ মুজিবকে গ্রেফতার করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় হাজার হাজার জনতা তাদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় ন্যাপ নেতা আহমেদুল কবীর ও অগ্নিকন্যা বলে কথিত ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী মতিয়া চৌধুরী ঐদিনই শ্রীমঙ্গল পৌর সভা মাঠে ন্যাপের জনসভায় তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবী করেন। পরদিন মৌলভীবাজার মহকুমাবাসীর তীব্র আন্দোলনের মুখে পাক সরকার তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া তিনি পাক আমলে সিলেটকে প্রদেশ ঘোষণা ও সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবীতে আন্দোলন করার দায়ে পাক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে দেয়।
’৭১ এর ১লা মার্চ পাক সরকারের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান সারাদেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন। এ ভাষণ শেষ হবার পরই শ্রীমঙ্গল পৌরসভা প্রাঙ্গন থেকে ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান সহ অপর দুজন জাদরেল ন্যাপ নেতা মিলে প্রথমে শহরে মিছিল বের করেন। এরপরই আওয়ামীলীগ ও ন্যাপের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়। এভাবেই তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে বিশেষ অবদান রাখেন।
দেশ স্বাধীনের পর ’৭২ সালে তিনি চা শ্রমিক আন্দোলনে চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দাবিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সাথে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ’৭৫ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনের বিরুদ্ধে ১০ দলের সাথে সরকার বিরোধী আন্দোলন করেন।
’৮২ সালে জেনারেল এরশাদ জোর করে ক্ষমতা দখল করলে পরবর্তী ’৯০ এর গণ আন্দোলনসহ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এ সময় ন্যাপের জুলুম প্রতিরোধ দিবসের জনসভায় জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র আক্রমন করে তাঁকে ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু জনতার প্রতিরোধের মুখে তিনি রক্ষা পান।
মোঃ শাহজাহানের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হলেও রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা কেন্দ্রীয় নেতাদের সমপর্যায়ে থাকায় বক্তৃতায় অত্যন্ত পারদর্শীতা ছিল। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি রাজমিস্ত্রী ও ঠিকাদারী করে গরীব ও মেহনতী মানুষের আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বামপন্থী রাজনীতির সহিত জড়িত ছিলেন। বৃহত্তর সিলেট জেলার চা শ্রমিক পাহাড় কামলা, মজুর মুটে, ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ী, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবি, পেশাজীবি, সর্বহারা, ক্ষেতমজুর, দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকের পক্ষে অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা নিয়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করেন ন্যাপ (মোজাফ্ফর) এ থেকে। তিনি ছিলেন আজীবন ত্যাগী, প্রগতিশীল আন্দোলনে শ্রীমঙ্গলের নিরলস ও নির্ভীক কণ্ঠসর এতদাঞ্চলের মাইক বলে পরিচিত বিপ্লবী জননেতা।
জীবনে সুযোগের সদব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছেন অনেকবার। কিন্তু তিনি কোন দিনই সেই লোভে আকৃষ্ট হননি। ঠিকাদারী করে যা’ টাকা রোজগার করতেন তার সমুদয় টাকাই প্রগতিশীল নেতা-কর্মী ও নিঃস্ব লোকজনের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। গরীব ছাত্র ছাত্রীদের লেখাপড়া করার ব্যাপারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। গরীব শিক্ষার্থী যারা টাকা পয়সার অভাবে লেখাপড়া করতে পারতো না তাদের সাথে নিয়ে তিনি চাঁদা তুলে লেখাপড়া শিখাতে সাহায্য করতেন। সারা সময়ই বাইরে বাইরে কাটিয়েছেন। নিজের পরিবারের লোকজনের খাওয়া-পড়া হল কিনা সে দিকে খেয়াল ছিলনা।
ঠিকাদারী করে এলাকার বহুলোকের পাকা দালান তৈরী করে দিয়েছেন। কিন্তু নিজের ঘর পাকা করতে হবে সেদিকে কোন লক্ষ্যই ছিলনা। নিজ বসতবাড়ীর কাঁচা ছনবাঁশের ঘরে চাপা পড়ে তাঁর বড় ছেলে মারা যায় তার জীবিত থাকাবস্থায়ই।
তাঁর সাথে থেকে যারা একসময়ে রাজনীতি শিখেছে, শাহজাহান ভাই বলে চা মিষ্টি ও খাবার খেয়েছে তাদের অনেকেই পরে লাখপতি ও কোটিপতি। নিজে আগে থেকে টাকা জমানোর চিন্তা করলে ধনী ব্যক্তি হতে তাঁর বেশি দিন লাগতো না। শেষ জীবনে গ্যষ্টিক আলসার রোগে ভূগছিলেন। জরাজীর্ণ ও অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে শেষ জীবনে তাঁকে চলে যেতে হয় দুনিয়া থেকে।
রাজনীতিতে যেমন তাঁর অসীম অবদান ছিল তেমনি সমাজ উন্নয়নে ও শিক্ষানুরাগে তাঁর অবদান ছিল। ১৯৬৯ সালে শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজ প্রতিষ্ঠায় ও তাঁর অবদান কম ছিল না। কলেজ কমিটি জেমস্ ফিনলে কোম্পানীর অন্তর্ভূক্ত জমি নিয়ে ভাড়াউড়া চা বাগানের চা শ্রমিকদের ধানী জায়গার ওপরে চা শ্রমিক ও কৃষকের প্রাণপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এই সংগ্রামী জননেতা মোঃ শাহজাহানকে ঠিকাদার হিসাবে নিয়োগ করে তাঁকে দিয়ে উক্ত জমিতে যে সব চা শ্রমিক চাষাবাদ করতো তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে বুঝিয়ে জমিগুলোতে কলেজের কন্ষ্ট্রাকশন কাজ করানো হয়। যাতে চা বাগানের শ্রমিকরা কোন বাধা বিপত্তি বা আন্দোলন করে কলেজের প্রতিষ্ঠাকে অংকুরে বিনাশ বা বানচাল করতে না পারে সেজন্য তাঁকে সামনে ধরা হয়েছিল। তাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমে ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নভূক্ত ৫ একর জমিতে সুদৃশ্য পরিবেশের ওপর কলেজ গড়ে ওঠে। কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয় এইযে, আজীবন সংগ্রামী ত্যাগী এই জননেতা ৮ ফেব্রুয়ারী ’৯২ গ্যষ্টিক আলসার রোগে ভোগে ৫৫ বছর বয়সে মারা যাবার পর অকৃতজ্ঞ এ সমাজ ব্যবস্থার ধারক বাহকদের হীন ষড়যন্ত্রে শ্রীমঙ্গল কলেজ কর্তৃপক্ষ আজো তাঁর ত্যাগ ও অক্লান্ত, শ্রমকে স্বীকার করে কোন স্মৃতিচারনমূলক শোক সভা বা আলোচনা সভা ও করেনি।
এই মহান নেতার ’৫২ থেকে ’৯২ দীর্ঘ ৪০ বছর একটানা আদর্শ ভিত্তিক ত্যাগের রাজনীতি শ্রীমঙ্গল তথা বৃহত্তর সিলেট জেলার বাম রাজনীতির ধারাকে অবিস্মরনীয় করে রেখেছে। যা’ বর্তমান প্রজন্ম ছাত্র যুবকদের ত্যাগের রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত করতে উৎসাহিত করবে। শ্রীমঙ্গলের গণমানুষের হৃদয়ে তাঁর স্মৃতি আজো চিরজাগ্রত হয়ে আছে।