একজন হায়দার ভাই

প্রকাশিত: ৭:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২১

একজন হায়দার ভাই

মহিউদ্দিন আহমেদ

 

ছবিটি ২০১৮ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারিতে তোলা, তোপখানা রোডে বাসদ (মার্কসবাদী) অফিসে। তারপর ফোনে অনেকবার কথা হয়েছে, দেখা আর হয়নি। আজ ভোরে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেলাম। মুবিনুল হায়দার চৌধুরী আর নেই। হায়দার ভাইয়ের সংগে আমার পরিচয় ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে, ঢাকায়। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান। তখন জাসদের মধ্য থেকে একটি বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় হায়দার ভাই ছিলেন তাত্ত্বিক। সোশালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়ার সংগে সংযোগ তখন থেকেই। আখলাকুর রহমান এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন প্রায় এক বছর পরে। নাগরিকত্বের ঝামেলা থাকার কারণে হায়দার ভাই নেপথ্যেই থেকে গেছেন। কোনো কমিটিতে ছিলেন না। হায়দার ভাইয়ের বাড়ি চট্টগ্রামের বাড়বকুন্ডে। ছোটবেলায় চলে গিয়েছিলেন কলকাতা। শিবদাস ঘোষের সংগে জুটে গিয়েছিলেন। সেই পথ আর ছাড়েননি। এ অঞ্চলে চিনপন্থী কমিউনিস্টদের যে প্যাটার্ন, তিনি ছিলেন তার বাইরে। জাসদে তার প্রয়োগ হয়। এদেশে চিনপন্থী কমিউনিস্টরা বাম রাজনীতিতে তাদের মনোপলি কারবার চালিয়েছে অনেক বছর। এর মধ্যে জাসদ হুট করে ঢুকে পড়ায় তাদের অনেক গোস্বা। চিনপন্থিদের মধ্যে হাজারো টুকরা থাকলেও জাসদের বিরুদ্ধে তারা সবাই ছিল এককাট্টা। ব্যাতিক্রম ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি জাসদের একাধিক সভায় আলোচক হিসেবে থেকেছেন, গণকণ্ঠে নিয়মিত লিখেছেন। হায়দার ভাই আমাকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তার প্রায় সবটাই আমার ‘প্রতিনায়ক সিরাজুল আলম খান’ বইয়ে উল্লেখ করেছি। তিনি ছিলেন জাসদ-বাসদে আমার দেখা সবচেয়ে আর্টিকুলেট, সজ্জন, সত্যবাদী ও নির্লোভ মানুষ। তাঁকে ধারণ করার ক্ষামতা ছিল না এ দলগুলোর। মনে পড়ে, নবিগঞ্জের টংগিটিলায় (হবিগঞ্জ জেলায়) পঁচাত্তরের শেষে বা ছিয়াত্তরের শুরুতে আমাদের পলিটিক্যাল রিট্রিটের কথা। সেখানে হায়দার ভাই ক্লাস নিলেন। অংশ নিলাম, আমি, কাজী আরেফ আহমদ, মোস্তাফিজুর রহমান, হাবিবুল্লাহ চৌধুরী, বদিউল আলম, জিয়াউদ্দিন বাবলু আর নবিগঞ্জের রউফ। টিলার চারদিকে ওয়াকিটকি হাতে সশস্ত্র অশ্বারোহী সেন্ট্রি পাহারায়। হায়দার ভাইয়ের মতো এত উন্নত সংস্কৃতি আর আর্টিকুলেশন জাসদে আর কোনো নেতার মধ্যে পাইনি। সবাই তো বাগাড়ম্বর, অতিরঞ্জন, গীবত আর মিথ্যাচারে ডুবে আছে। হায়দার ভাইকে খুব মিস করব।

ছড়িয়ে দিন