একটি কবিতা সমগ্র ও একজন সাহসী কবি

প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২৩

একটি কবিতা সমগ্র ও একজন সাহসী কবি

শ্যামসুন্দর সিকদার

ড. লিপন মুস্তাফিজকে আমি প্রথমে চিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে।তবে তার আরেকটি পরিচয় আছে গ্রন্থকার হিসেবে।সে পরিচয়টা আমি আরো পরে জেনেছি।
তার রচিত “E-banking in Bangladesh” ও E-Banking Services in Bangladesh: An Empirical Study on Customers’ and Bankers’ Satisfaction “ বইগুলো ব্যাপক পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে।কিন্তু তার কবি পরিচয়ের খবর পেয়েছি আরো পরে।“আষাঢ়” নামে তিনি একটি স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন।
কবি লিপন মুস্তাফিজের জন্ম ১৯৭৪ সালে, ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার নাগিরাট গ্রামে। তিনি দিনাজপুর জিলা স্কুল, ঢাকা কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার পর যুক্তরাজ্য থেকে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাতে এমবিএ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। প্রবাস থেকে দেশে ফিরে আবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জন করেন। গবেষক হিসেবে তার গবেষণাকর্ম দেশ বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে।
তার “আবেগের সাথে বসবাস”, “সংকোচ”, “নৈঋত”, “ভালোবাসার মেঘ কেটেছে” এবং “অনাঘ্রাতা “নামে তার লেখা কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে আগে।এগুলোর মধ্যে “অনাঘ্রাতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আমার মনে হয়েছে আগেরগুলোর তুলনায় একটু পরিপক্ক। এবার ওইসব কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতা সমগ্র প্রকাশের উদ্যোগকে আমি সাহসী পদক্ষেপ বলবো।কবি হিসেবেও তিনি খুব সাহসী কবি।কারণ তার কবিতার মধ্যে প্রকাশভঙ্গী, শব্দ চয়ন এবং বিষয় নির্বাচনে যেমন বৈচিত্র্য আছে,তেমনি আছে কঠিন বিষয়কে সহজ করে প্রকাশে স্বকীয়তা।সে ক্ষেত্রে তিনি তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন।
আমার কাছে মনে হয়েছে কবি লিপন মুস্তাফিজ যখন আলাদা আলাদা কাব্যগ্রন্থে কবিতাগুলো যেভাবে প্রকাশ করেছিলেন, ‘কবিতা সমগ্র’ প্রকাশ করতে গিয়ে সেগুলো শুধু একত্র করেই সমগ্র করতে যাছেন।এ উদ্যোগে তিনি পুরাতন কবিতায় কোনো পরিমার্জন করেছেন বলে মনে হয়নি।কিন্তু অনেক কবিই ‘সমগ্র’ করার সময় কিছু কিছু পরিমার্জনও করে থাকেন।অথচ এখানে তার প্রমাণ পাইনি।না করলেও কোনো সমস্যা নেই। তবে এখনও কিছু বানান ভুল বা মুদ্রণজনিত ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়,যা শুদ্ধতার দাবী রাখে।যাক সেথা।
যারা কবিতা লিখেন তারা কবিতার শরীর সম্পর্কে জানেন।অর্থাৎ কবিতা নির্মাণের ক্ষেত্রে কবিতার শারীরিক গঠন নিয়ে যে নিয়মকানুন আছে বা ব্যাকরণ আছে, তা কবিকে জানতে হয়।সোজা কথায় বলি – কবিতা নির্মাণের জন্য ছন্দ,অলংকার,উপমা,বিরোধ,বক্রোক্তি,যমক,উৎপ্রেক্ষা,অনুপ্রাস,রূপক,চিত্রকল্প ইত্যাদি এবং কাব্যময়তা জানতে হয়।
জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, “চেতন-অচেতন মনের ভাব প্রকাশ হলো কবিতা, যাতে শব্দের প্রয়োগে এবং ভাব ও আবেগ প্রকাশে কাব্যময়তা থাকবে এবং ছন্দের রূপময়তা থাকবে ।”
কারণ কবির শব্দ চয়নে ভাষার ও কথার প্রকাশ তো সাধারণ মানুষের কথার মতো হবে না।কবির প্রকাশ হবে আলাদা এবং সেখানে শব্দের খেলায় ভাবের ও ছন্দের দোত্যনা থাকবে, শব্দের চলনে মাত্রা মেনে ‘রিদম’ বা দোলাচল থাকবে।আর ওই যে ‘অচেতন’ মন, সেটা কি? সেটা হলো একজন মানুষের মনের ভেতর অন্য এক মানবিক সত্তা এসে হাজির হয়, যেটা আসলে কবি সত্তা; এই কবি সত্তা হাজির হয় যেন এক সাধনা বা ধ্যানের মধ্য দিয়ে ।এজন্য কবিরা নতুন ভাবের স্রষ্টা হয়ে যান।যার জন্য একটা কবিতা সৃষ্টির পরে কখনো কখনো কবি যেন নিজেই অবাক হয়ে যান এবং মনে মনে বলেন, “এটা কি সত্যি আমি লিখেছি?” কারণ তখন কবির অবচেতন মনের ভেতর অন্য এক মানবিক সত্তা ছিল, যেখানে তিনি নিজের উপস্থিতি যেন টেরই পাননি।একেই আমি বলি ‘কবির ধ্যান’।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, লাইনে লাইনে অন্ত্যমিল থাকলেই তা কবিতা হয় না।আবার ছন্দের মাত্রা ও পর্বের হিসাব ঠিক রেখে পঙক্তি তৈরি করলেই তাও কবিতা হবে না,তাতে অবশ্যই ভাবের ও কাব্যিক শব্দ চয়নের সংগে অর্থবোধক ও সংগতিপূর্ণ প্রকাশ থাকতে হবে।অবশ্য আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে এখনও নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।এজন্য আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে নানা মতবাদ আছে।সে প্রসঙ্গে আর যেতে চাই না।তবে কিছু কবিতা হয় গল্পকে আকর্ষনীয় করে,আবার কিছু কবিতা হয় শব্দ চয়নে মুন্সিয়ানা দেখিয়ে – যা পাঠক হৃদয়কে দারুণভাবে আকৃষ্ট করতে পারে।
এই যে এতগুলো কথা বললাম, সেটা এ কথা বুঝাতে যে – কবিতা লেখার কাজটি আমি নিজে খুব কঠিন বলি এবং সত্যি আমার কাছে কবিতা কঠিনই মনে হয়।
অথচ কবি লিপন মুস্তাফিজের কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে,তিনি কবিতা লেখার বিষয়টি মোটেই কঠিন মনে করেন না।তিনি সাবলীলভাবে ও সহজভাবে শব্দ ব্যবহার করে পঙক্তি তৈরি করে গেছেন।তবে ছন্দের ব্যবহারে আরো সতর্কতার সাথে অনুশীলনের দাবী রাখে।অলংকার, উপমা,রূপক ও নান্দনিক শব্দ প্রয়োগের উদাহরণ কদাচিৎ চোখে পড়েছে।তবে ভাব ও আবেগের ঘাটতি নেই তার কবিতায়।প্রেমের কবিতায় সরাসরি সাহসী প্রকাশ বিদ্যমান। যেমন,’বাল্যপ্রেম’ , ‘আমার ভালোবাসা’, ‘আবেগের সংগে বসবাস’ ইত্যাদি কবিতাগুলো। কিন্তু আরো কাব্যিক প্রকাশ হলে কবিতা অধিক শক্তিশালী হতো বলে আমি মনে করি।
এই কবির কবিতায় অন্ত্যমিল ব্যবহার করার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয়।তবে অন্ত্যমিলের প্রয়োগে আরো একটু যত্নবান হলে ভালো হবে। বেশ কিছু কবিতা তার গীতি কবিতা মনে হয়েছে।সেগুলোর কিছু কিছু সুর করা হলে ভালো গানের রূপ নিতে পারে।যেমন, বিবাগী, তুমি বিনে, মন, কষ্ট ও আলিঙ্গন – এমন আরো কিছু কবিতা আমার বিবেচানায় ভালো গান হতে পারে।
কিছু কবিতায় স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার ভালো করেছেন।কিছু কবিতায় যেন স্বভাব কবির মতন শব্দ প্রয়োগে তিনি সফল হয়েছেন।আবার অনেক কবিতায় কাব্যময়তা মনের মতো পাইনি আমি।দেশমাতৃকা ও প্রকৃতি নিয়ে কবিতার সংখ্যা কম।প্রেম ও মানবিকতার কবিতাই বেশি।
কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতা আছে – সিরিজ কবিতা এগুলো।যেমন,বিরহ,মনের জলকেলি,সংকোচ,একলা পাখি এবং পঠিকা ও লেখক। এই কবিতাগুলোর বাণী ও প্রকাশ চমৎকার।এগুলো পড়ে আমার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অণুকবিতা বা হাইপো কিংবা লিমেরিকের কথা মনে পড়েছে।তবে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করলে তা মেলানো কঠিন।এজন্য এগুলোতে কবির একটা আলাদা বৈশিষ্ট প্রকাশ পেয়েছে।
আমার কয়েকটা ভালো লাগা কবিতার কথা এবার বলি। যেমন- অসহ্য নীলিমা,শিকল,আসমানে উড়ুম মাঝি,অনাঘ্রাতা,ভাতের বাটিতে হাত,বন্ধু,পাহাড়,একাত্তরের কুমারী মা,ঐপম্য,মায়াদেবী,নষ্ট,সুখের কান্দন ইত্যাদি।
পরিশেষে বলি,কবি লিপন মুস্তাফিজের কবিতাগুলো সকল পাঠকের জন্য সহজবোধ্য – কোনোই জটিলতা নেই বুঝতে।পাঠককে আর খুব চিন্তা করে কবিতার মর্মার্থ বুঝতে হবে না।কবি নিজেই সব সরল প্রকাশের মাধ্যমে সহজ করে দিয়েছেন।কিছু কবিতা ছড়াধর্মী বা পদ্য হওয়ায় তা বেশি পাঠকপ্রিয়তা পাবে।আমি কবির এই গ্রন্থের বহুল প্রচার ও প্রসারতা এবং পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।
ঢাকা ২১/১/২০২৩।