একটি ছোট্ট প্রাণের জন্য.

প্রকাশিত: ৯:২৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০১৮

একটি ছোট্ট প্রাণের জন্য.

সাবিনা শারমিন

৮৪-৮৫ সালের দিকে আমাদের বাড়ীতে আমরা ন’ভাই বোন ছাড়াও গ্রামের,আশেপাশের অনেক লোক আসা যাওয়া করতো। আমাদের নানা-নানু ইন্তেকাল করলে বিয়ের আগ পর্যন্ত ছোটখালা আমাদের সাথেই থাকতেন। তিনি আমাদের ছ’বোনের খালা ছিলেন না।ছিলেন সবচেয়ে কাছের বন্ধু।বাবা-মা আমাদের বকাঝকা দিলে ছোটখালা কোমর বেঁধে মায়ের সাথে ঝগড়া করতেন।কথায় বলেনা মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী। কথাটি মানুষ নেতিবাচক ভাবে বললেও আমাদের ক্ষেত্রে খুব মিথ্যা ছিলোনা! সব গোপন কথা আমরা তাকেই আগে বলতাম।

খালা ছাড়াও দাদা-বাড়ীর নানাবাড়ির চাচাতো মামাতো ভাইবোন, প্রতিবেশী হিন্দু ধর্মের সুচিত্রাদি,খোদেজার মা,শামসুন্নাহার আপা,আমাদের মায়ের এক পাতানো ধর্মের ছোট ভাই,কঠোর আওয়ামী লীগ নেতা রাজ্জাক কাকা,সাত্তার মামা,মতলেব মামা,কবি সমুদ্র গুপ্ত মামা,আমার নানার খালাতো নানার নাতী সেলিম দেলোয়ার ভাই এরা সবাই দিনের বেশীর ভাগ সময় আমাদের বাড়ীতে আসা যাওয়া করতেন।আমাদের বাড়ীটি আনন্দে উল্লাসে কলকল করতো।

আমাদের মায়ের একমাত্র ভাই শামসুদ্দিন আবুল কালাম বাংলাদেশের অন্যতম কথা সাহিত্যিক। তাঁর লেখা কাশবনের কন্যা সে সময়ে সাড়া জাগিয়েছিলো। তাঁর লেখা কাঞ্চন গ্রাম বইটি এখন ডিগ্রী ক্লাসে পড়ানো হয়।সে যাইহোক,মামার কথা অন্যদিন লিখবো। সাহিত্যনুরাগী উদার পরিবারের মেয়ে আমাদের মা। বিকেলে শরৎচন্দ্র,নজ্রুল রবীন্দ্রনাথের লেখা নিয়ে হৈ চৈ আসর বসতো ।

সে সময়ে সারাবছর আমাদের বাড়ীতে রান্না-বান্না হতো। সকলে মিলে মিশে খেতাম।নানাবাড়ি ঝালকাঠি থেকে লাল শুকনা মরিচ,আউশের চাল,নারকেল সুপারি সারাবছর খাটের নীচে বিছিয়ে থাক্তো। মা সকলকে রান্না করে খাওয়াতে পছন্দ করতেন।কখনো কখনো নিজেই বাজার করতেন।এতো সব হাটবাজার রান্না বান্না করতে সবসময়েই আমাদের বাড়ীতে দুজন অতিরিক্ত লোক থাকতো।

একবার আমাদের বাড়ীতে গৃহকর্মী নেই।আমার মেঝোবোন আমাদের সকলকে এক সাথে ডেকে কাজ ভাগাভাগী করে দিলো। আমার ভাগে পড়লো হাস মুরগী দেখাশোনা করা আর ছোট দুটি ভাই সজল আর পুটুকে রোজ মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দেয়া।

একবার একটি মুরগীর অনেকগুলো বাচ্চা হলো। কুটকুটে ফুটফুটে ছোট ছোট মুরগীর বাচ্চা। মা মুরগী যেখানে যায়,বাচ্চাগুলোও সেখানে পিছে পিছে দৌড়ায়।সেই সাথে আমিও ওদের পিছু পিছু দৌড়াই। আমাদের বাড়ীর সামনে একটি ডোবা ছিলো,হলুদ হলুদ হাসের বাচ্চাগুলো সেখানে ডুব সাতার দিতো। আমি সন্ধ্যা হলে অর্পিত দায়িত্ব গুরুত্বের সাথে পালন করতাম।সন্ধ্যা হলে হাস মুরগী ঘরে তুলতাম। এক্কেবারে রাখাল ছেলে। সকাল বেলা যখন হাস মুরগীর খোপ খুলতাম,তখন কম হলেও পনেরো ষোলোটি ডিম ঘরে নিয়ে আসতাম।
এখন যা বলতে চাইছি,তা বলি ……

আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি।বার্ষিক পরীক্ষা সামনে। আমাদের ছয়বোনের ছয়টি পড়ার টেবিল ছিলোনা। এক টেবিলে দুতিন জন পড়তাম। কখনো ফ্লোরে বসেও পড়তাম। একবার একটি মুরগীর অনেকগুলো বাচ্চা হলো।পড়ার সময়েও উঠোনের দিকে বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। একবার আমার চোখের সামনে একটি মুরগীর বাচ্চা কাক ছো মেরে নিয়ে গেলো।কালো কাকের মুখে হলুদ কোমল নরম বাচ্চার ছোট পেটটি মুখে পোরা। ছোঁ মেরে নিয়ে উড়াল । আম গাছ থেকে জাম গাছ,তারপর এ গাছ ও গাছ। আমিও কাকের দিকে চোখ রেখে পিছে পিছে দৌড় আর দৌড়।এ গাছ থেকে ওগাছে ঢিল ছুড়ছি। বড় বড় ঢিল। একবার সেই ঢিল এক্কেবারে কাকের মুখে গিয়ে পড়লো। মুরগীর বাচ্চাটি সাথে সাথে মাটিতে পরে গেলো। মাটিতে পরে নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে গেলো। সে দৃশ্য দেখে আমি সাথে সাথে আমার সরু আঙুল দিয়ে দুহাঁতে নাড়ীভুঁড়ি ঠেলে পেটে ঢুকিয়ে দিলাম। বাসায় এসে বুয়াকে চিৎকার করে ডেকে বললাম সুঁই সুতা দাও। সে তারাতারি সুঁই সুতা আর হলুদ মরিচ বাটা নিয়ে আসলো। আমি,মেঝো আপা, বড় আপা,বুয়া অপারেশন শুরু করলাম। ভুড়ি পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে সেলাই করতে লাগলাম। অনেক গুলো সেলাই।এরপর বুয়া সেখানে হলুদ বাটা লাগিয়ে দিলো।এরপর সে শুয়ে কতক্ষণ কুই কুই চিউ চিউ করতে লাগ্লো। আমি শুধু তখন আল্লাহ আল্লাহ করছি।

একদিন পর বাচ্চাটি উঠে দাঁড়ালো। সেই থেকে বাচ্চাটি পড়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে আমার কোলে বসে থাকতো । আমি না নড়লে সেও নড়তোনা। গায়ে থাকতে থাকতে তার শরীরে পালক ছিলোনা । আমার বড় আপা তখন এস এস সি দেবে হয়তো । সে অনেক রাত পর্যন্ত লেখাপড়া করতো। একবার তার টেবিলের নীচে সে বসেছিলো। আপা দেখেনি। এক্কেবারে পায়ের নীচে!! এক পা সড়িয়ে সে যখন সড়ে গেলো,তখন আবার আরেক পায়ের নীচে। আবারো ভুড়ি বের হয়ে গেলো। আবারো সেই আগের অপারেশন।!! এরপরেও সে সেড়ে উঠলো। তারপর আমাদের কোলে কোলে সে বড় হোলো। একবার রোজায় তাকে প্রতিদিন ইফতারের সময় আমি ছোলা খেতে দিতাম। খেয়ে খেয়ে সে খুব রিষ্ট পুষ্ট হয়ে উঠলো।একদিন ক্লাস সিক্স এর বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে এসে তাকে আর খুঁজে পাইনা।কোথাও খুঁজে পাইনা।এখানে সেখানে মাঠে, প্রতিবেশীদের বাড়ীতে। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলোনা। পরের দিন আমাদের প্রতিবেশী লাল মিয়ার মা জানালো আমাদের বাড়ীর পাশের কারখানার কয়েকজন শ্রমিক নাকি সেদিন রাতে ওকে রান্না করে উৎসব করে খেয়েছে।
সেদিন অনেক কেঁদেছিলাম। আমরা ছয় বোন একসাথে অনেক কেঁদেছিলাম।যখনি ওর কথা মনে পড়তো,বাথরুমে গিয়ে কল ছেড়ে কান্না করে আসতাম।কেউ যেনো শুনতে না পায়।সত্ত্যিই আমরা খুব বোকা ছিলাম। মানুষের নিষ্ঠুরতা বুঝতে পারতাম না ।
তবে মাঝে মাঝে এই বোকামীর জন্য গর্ববোধও করি ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

লাইভ রেডিও

Calendar

April 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930