একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা

প্রকাশিত: ৩:৪৭ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২১

একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা

আকমল হোসেন খোকন
মাঝে মাঝে এরকম হয়েছে, বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিচ্ছে, আমি নামগুলো শুনে অধিকাংশই চিনতে পারছি না। টিভিতে দেখে দুয়েকজনকে চিনলেও বাকিরা নিতান্ত অপরিচিত। এবার অন্তত সেরকমটা হয় নি। এ বছর ২০২০ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের ঘোষণা যখন এলো, কয়েকটি কারণে আমি মনে মনে খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলাম। প্রথমত পছন্দের কয়েকজন মানুষ পুরস্কারটি পেয়েছেন, দ্বিতীয়ত কয়েকজনের জীবন ও কর্মের সঙ্গে আমার গভীর পরিচয় আছে। বিশেষ করে আমার নিজ এলাকার কবি মুহাম্মদ সামাদ, বৃহত্তর ময়মনসিংহের মানুষ প্রিয় ছড়াকার আনজীর লিটন, প্রিয় নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদার আর বিজ্ঞানলেখক অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম আমাকে অভিভূত করে।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল শেষোক্ত জনের দুইটি বইয়ের প্রুফ দেখবার। আর অনুজপ্রতীম হিসেবে অগ্রজ আনজীর ভাইয়ের লেখার সঙ্গে পরিচয় আমার স্কুল জীবনে। তিনি তখন হয়তো কলেজে পা দিয়েছেন। ভাবতে ভাল লাগে আনজীর লিটন ভাইয়ের ছড়াকার হয়ে ওঠাটা আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। তাঁর কষ্ট, নিষ্ঠা, ত্যাগ-তিতিক্ষার সঙ্গে আমার খুব নিবিড় পরিচয় রয়েছে। আমাদের অব্যবহিত অগ্রজ হিসেবে ছত্রিশ বছর আগে তাঁর ছড়ার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে।
সাংবাদিক, অগ্রজ শোয়েব সিদ্দিকী’র কাছে শুনেছিলাম- মুহাম্মদ সামাদ, আতিউর রহমান, আনু মুহাম্মদ’রা আমাদের প্রতিবেশী গ্রাম/ ইউনিয়নের স্কলার। এখন যেমন জানি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোস্তাফিজুর রহমান-ও একই ভৌগোলিক সীমার মানুষ। তবে আমার দুর্ভাগ্য, এঁদের সান্নিধ্যে যাবার সুযোগ যাপিত জীবনে আমার কখনোই হয় নি। নক্ষত্রের দূরত্বে অবস্থান করেছেন ওনারা।
১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি’র তরুণ লেখক প্রকল্পে যোগ দিয়ে প্রকল্পের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে আনজীর লিটনকে পাই। মনে পড়ে যায়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অসংখ্য লিটল ম্যাগে-সংকলনে, দৈনিকে ছোটদের পাতায় সুকুমার বড়ুয়া, ফজল-এ-খোদা, আলী ইমাম, লুৎফর রহমান রিটন, আহমাদ মাযহার, আমীরুল ইসলাম, আসলাম সানী, খালেদ হোসাইন, রাশেদ রউফ, রহীম শাহ, মিহির মুসাকী, প্রয়াত বাপী শাহরিয়ার, আনজীর লিটন, ওয়াসিফ-এ-খোদা, প্রয়াত ওবায়দুল গণি চন্দন, রোমেন রায়হান, টিপু কিবরিয়া, ফারুক হোসেনদের পাশাপাশি আমরা কতিপয় (শওকত-উল-ইসলাম, সারওয়ার-উল-ইসলাম, শ্রীকৃষ্ণ দাস, মীর নিজামউদ্দিন, হাশিম মাহমুদ, মাসুদুল হাসান রনি, রাকিবুল হাসান, কাজী শাহীদুল ইসলাম, মনটি রহমান, মিহির কান্তি রাউৎ, সৌমিত্র দেব টিটো, শ. ম. মোজাম্মেল, আকমল হোসেন খোকন, এমদাদুল ইসলাম খোকন, রেজাউল করিম মুকুল, ফারহানা ইসলাম জয়া, রাসেল রেজভী, শ. ম. শহীদ, বশির উদ্দিন কনক, ফারুক হাছান, শেখ রাহমান লিটন, আবু সালেহ মোঃ ফারুক, আফরীন সুলতানা বীথি) লেখালেখির পাঁয়তারা করছি।
বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের ছয় মাসে আমাদের পরম আত্মীয় হয়ে ওঠেন প্রয়াত লেখক অনু হোসেন, সুজাতা হক আর আনজীর লিটন ভাই। শ্রদ্ধেয় সেলিনা হোসেন, মুহম্মদ নূরুল হুদা আর রফিক আজাদ-কে মাথার ওপর রেখে এই আনজীর লিটনরাই সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন প্রত্যন্ত শহরতলী, গ্রাম-গঞ্জ থেকে প্রকল্পে আসা সৃষ্টিপ্রয়াসী লেখকদের। আমার মতো সবাই তাদের প্রীতিধন্য হয়েছি সেইসব দিনগুলোতে। একজীবনে সে-ঋণ তো পরিশোধের নয়।
যারা বিষয়/ প্রসঙ্গের সঙ্গে একেবারেই নতুন, তাদের জন্যে বলি- আনজীর লিটন (জন্ম ১৭ জুন ১৯৬৫, ময়মনসিংহ) এ সময়ের একজন জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে পড়াশোনা করেছেন ময়মনসিংহে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমির নানান দায়িত্বের পাশাপাশি বেতারে ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে যুক্ত থেকেছেন নানামাত্রিক সৃজনকর্মে দীর্ঘদিন। চলমান সেসব সৃষ্টিশীলতায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯২ সালে তাঁর প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘খাড়া দুটো শিং’ প্রকাশিত হয়। এ যাবত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা- প্রায় ৮০। ইতোপূর্বে সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ পেয়েছেন অর্ধডজন পুরস্কার। “শিশুসাহিত্যে” অবদানের জন্য তিনি ২০২০ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন।
১১ জুন ২০২১ শুক্রবার বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় নগরীর কাটাবনে গ্লোরিয়াস রেস্তোরাঁয় ২০২০ সালের জন্য শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ছড়াকার আনজীর লিটন-কে সাড়ম্বরে সংবর্ধনা দেয়া হয়। কবি সৌমিত্র দেব আর ড. গোলাম মোস্তফার প্ররোচনায় শতাধিক লোকের সমাগমে যুক্ত হয়ে বলা চলে সমৃদ্ধই হলাম। মঞ্চে ছিলেন- কবি অসীম সাহা, কাইজার চৌধুরী, আখতার হুসেন, আমীরুল ইসলামের মতন গুণীরা-কৃতীরা। করোনাকালে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত সম্মিলন-সমাবেশ নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। প্রিয় ছড়াকার আনজীর লিটনের জন্যে হার্দিক শুভকামনা।

আকমল হোসেন খোকন ঃ শিক্ষাবিদ ও লেখক

ছড়িয়ে দিন