একটি ‘লুসাই’ পরিবার ও মৌলভীবাজারের ক্রীড়াঙ্গন

প্রকাশিত: ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২১

একটি ‘লুসাই’ পরিবার ও মৌলভীবাজারের ক্রীড়াঙ্গন

মনজুর উদ্দীন মুর্শেদ 

খেলুড়ে এই লুসাই পরিবারের সদস্যদের মৌলভীবাজার, বৃহত্তর সিলেট কিংবা জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে নুতন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। যদিও কালের পরিবর্তনের সাথে অনেক কিছুই এখন হয়তো চাপা পড়ে গেছে তারপরও ক্রীড়া ইতিহাস ঘাঁটলে লুসাইদের অনেক নামই বেরিয়ে আসবে, তার মধ্যে যে নামটি সর্বপ্রথমেই আসবে সেটি হলো উপমহাদেশের হকি কিংবদন্তি প্রয়াত জুম্মান লুসাই (জন্মঃ ১২ অগাষ্ট ১৯৫৫ – মৃত্যুঃ ১৮ জানুয়ারী ২০১৫)।
আজ প্রিয় জুম্মান দা’র ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী; ক্রীড়াঙ্গনে উনার বিশেষ অবদানের জন্য গভীর শ্রদ্ধার সাথে উনাকে আজ স্মরন করছি। আজকের এই লিখার বিশেষ একটি উদ্দেশ্য হলো, আমাদের প্রানপ্রিয় মৌলভীবাজারে নুতন প্রজন্মের (খেলোড়ায়, ক্রীড়া-কর্মকর্তা এবং সমর্থক) কাছে জুম্মান দা এবং পুরো লুসাই পরিবার সম্পর্কে অবহিত করা। পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনে এই পরিবারের সদস্যদের অবদান এবং শহরের ক্লাবগুলো, বিশেষ করে ইলেভেন ষ্টার ক্লাবের সাথে এই পরিবারের গভীর সম্পৃক্ততার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।
আমরা যারা ৮০’র দশকে শিশু-কিশোর ছিলাম তাদের অনেকেই তখন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে কিংবা কলেজ ষ্টডিয়ামে প্রতিনিয়ত খেলা দেখতে যেতাম। তখন যে লুসাইদের আমরা বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী ইলেভেন ষ্টার ক্লাবের হয়ে ফুটবল লীগ কিংবা বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলতে দেখেছি তার অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার এই লিখার প্রয়াস।
প্রায় ৩৯ বছর আগের কথা, সনটা আমার ঠিক মনে নেই। আমার বয়স তখন ১১ কিম্বা ১২ হবে যখন ইলেভেন ষ্টারে ক্লাবের হয়ে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে থাংলুরা দা’র খেলা আমার প্রথম দেখা। যতটুকু মনে পরে, একই খেলাতে সম্ভবত দনদন দা’ও খেলেছিলেন। পরবর্তিতে এই পরিবারের চেমাম দা, জুম্মান দা এবং যৌবেল দা’কে বিভিন্ন সময়ে ফুটবল সহ অন্যান্য খেলাধুলায় অংশ নিতে দেখেছি। এখানে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো উনাদের পরিবারের তিনজন সদস্যই জাতীয় দলে ভিন্ন সময়ে হকি খেলেছেন তার মধ্যে দনদন লুসাই, জুম্মান লুসাই এবং উনাদের চাচাতো ভাই রামা লুসাই। কিন্তু ইলেভেন ষ্টার ক্লাবের হয়ে উনারা মুলতঃ খেলেছেন ফুটবল।
পরিবারের সর্ব কনিষ্ট যৌবেল লুসাই’কে আমরা অনেকেই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে শহরের নরওয়েজিয়ান খৃষ্টান মিশন এবং কাশীনাথ আলাউদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ের হয়ে ফুটবল, ভলিবল সহ অন্যান্য খেলাধুলায়, কখনোবা আবার এথলেটিক্সেও অংশ নিতে দেখেছি।
প্রিয় যৌবেল দা’র সাথে বয়সের ব্যবধান মাত্র কয়েক বছর হওয়াতে আমি বা আমার বন্ধুদের খেলাধুলায় উনার দক্ষতা খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাধারণত নবম এবং দশম শ্রেনীর ছাত্রদের নিয়ে দল গঠন করা হতো এবং নীচের শ্রেনীগুলোর ছাত্ররাই সবচেয়ে বেশী উৎসুক দর্শক হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে করতালি দিতো, ঠিক তেমনি খুব কাছ থেকে যৌবেল দা’কে দেখা। উনার জন্যই আমাদের সরকারী স্কুলসহ শহরের অন্যান্য স্কুলদের কাশীনাথ স্কুলের বিপক্ষে জয় পাওয়া ছিলো অনিয়মিত এবং খুব কষ্টার্জিত।
যৌবেল দা ছাত্রাবস্থায় ইলেভেন ষ্টার ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। ১৯৮৪ সালে মৌলভীবাজার থেকে সিলেট স্থানান্তরের পর হকির পাশাপাশি ফুটবলও চালিয়ে যান। ১৯৮৫ সালের শেষের দিকে বড়ভাই জুম্মান লুসাই’এর পথ অনুসরন করে ঢাকা আবাহনী ক্লাবে প্রথম খেলার সুযোগ পান। তখন থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি ঢাকায় প্রায় ১৫ বছর ১ম বিভাগ হকি লীগ খেলেন। আবাহনীতে থাকা অবস্থায় ক্লাবের পক্ষ হয়ে দেশের বাহিরে কয়েকটি জাতীয় পর্যায়ের হকি টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পান। তারমধ্যে ঐতিহাসিক ব্যাটন কাপ, ভৈরব চন্দ্র মোহন্তি কাপ। পরবর্তিতে ক্লাব পরিবর্তন করে এজাক্স, সাধারণ বীমা, এবং মোহামেডান ক্লাবের হয়েও খেলেন। পরে আবারও আবাহনীতে খেলে ২০০১ সালে অবসর নেন। তারপর সিলেট স্থানীয় হকি লীগে আরও কয়েক বছর খেলেন। বর্তমানে উনি বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়ালে কর্মরত রয়েছেন এবং কাজের পাশাপাশি বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের কোচের দায়িত্বেও রয়েছেন। তাছাড়া প্রতি বছর তিন মাসের জন্য আর্চারি ফেডারেশন থেকে বাংলাদেশ আর্মির সদস্যের প্রশিক্ষনও দিয়ে থাকেন।
শ্রদ্ধেয় রায়হান ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে আমাদের হকি কিং প্রিয় জুম্মান দা’ই এই লুসাই পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি ১৯৭৮ সালে ইলেভেন ষ্টারের হয়ে মৌলভীবাজারের লীগে ফুটবল খেলেন। উনি আরোও জানান যে, চেমাম দা জুনিয়র ফুটবল দলের প্রথম কোচ ছিলেন এবং মুন্না দা (প্রেন্টিস), আলমগীর ভাই, জাহাঙ্গীর ভাই, ফজলু ভাইয়ের মতো আমাদের প্রজন্মের অনেক তরুন ফুটবলারদের রীতিমতো তিনি লালন করেছেন। সেকারণেই হয়তো তখন ইলেভেন ষ্টার ক্লাব যেকোন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে স্হানীয় তরুনদের সমন্বয়ে দুই থেকে তিনটি দল গঠনে সক্ষম ছিলো।
প্রিয় জুম্মান দা ছিলেন আমার দেখা এক মহাপুরুষ। পরিবারে ছয় ভাই এবং এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ। বাংলাদেশ পুলিশ দলের হয়ে ১৯৭৮ সালে হকি খেলা শুরু করলেও ক্যারিয়ারের বেশীরভাগ সময়ই খেলেছেন ঢাকা আবাহনী ক্লাবের হয়ে। ১৯৮২ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে তিনি প্রায় দশ বছর খেলেন। বিভিন্ন ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় উনার খেলা টিভিতে দেখে বড় হওয়া প্রজন্মের আমিও একজন। তিনি ছিলেন ক্লাব এবং জাতীয় দলের রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী; ফুলব্যাক পজিশনে খেললেও পেনাল্টিকর্নার থেকে গোল করায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তিনি বাংলাদেশের একমাত্র হকি খেলোয়াড়, যিনি বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলার গৌরব অর্জন করেন।
১৯৮৫ সালে এশিয়া কাপে ইরানের বিপক্ষে খেলায় হ্যাট্রিক করেন। ১৯৮২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৯ম এশিয়ান গেমসে অংশ নেন জুম্মান লুসাই। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় এশিয়া কাপ, ১৯৮৬ সালে সিউলের ১০ম এশিয়ান গেমস ও ১৯৮৯ সালে দিল্লিতে তৃতীয় এশিয়া কাপেও খেলেন তিনি। ১৯৮৯ সালে দিল্লিতে এশিয়া কাপে অংশগ্রহণ করে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেন (এই অনুচ্ছেদে উল্লখ্য তথ্যের কিছুটা আমার জানা ছিলো তারপরও উইকিপিডায় খুঁজে এই তথ্যগুলো পুনঃনিশ্চিত করি)।
অবসর গ্রহনের পর জুম্মান দা ভানুগাছ উপজেলার মাগুরছড়া পুজ্ঞিতেই থাকতেন। দুঃখজনকভাবে, ২০১৫ সালের এইদিনে তিনি আমাদের কাছ থেকে চিরতরে বিদায় নেন। আমাদের প্রিয় ইলেভেন ষ্টার ক্লাবের পক্ষ থেকে রায়হান ভাই উনার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে পেরেছিলেন বলেও আমাকে তিনি জানান।
অন্যদিকে দনদন লুসাই হকি খেলেছেন বাংলাদেশ পুলিশ এবং জাতীয় দলের হয়ে। দনদন দা নিজেও আবাহনী সহ অন্যান্য বড় দলগুলোর ডাক পেয়েছিলেন কিন্ত তা উপেক্ষা করে পুরো ক্যারিয়ারই কাটিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশ দলে। পুলিশ থেকেই ডাক পেয়েছিলেন জাতীয় দলে, খেলেছেন জুনিয়র বিশ্বকাপ এবং ১৯৮২’র এশিয়ান গেমসে। কালের ব্যবধানেই হোক অথবা খেলা সম্প্রচারের সীমিত সুযোগের কারনেই হোক দনদন দা’র হকি সময়ের কোন স্মৃতি আমার মনে নেই তবে থাংলুরা দা’র সাথে একই খেলায় শহরে উনাকে ফুটবল খেলতে দেখেছি।
থাংলুরা লুসাই’ও বাংলাদেশ পুলিশে একাধারে হকি ও ফুটবল খেলেছেন। পাশাপাশি তিনি সিলেটের বড় ক্লাবগুলোতেও বহু বছর ফুটবলও খেলেছেন। এছাড়া তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান টিমেও তিনি খেলেছেন। পরিবারের ৩য় চেমাম লুসাই এবং ৪র্থ যৌদুয়া লুসাই দুজনেই সিলেটের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।
পরিবারের একমাত্র বোন মারিয়ান চৌধুরী (৫ম) তৎকালীন সিলেটের নামকরা এথলেট ছিলেন। বর্তমানে তিনি সিলেট বিভাগীয় সংস্থার সাধারন সম্পাদিকা এবং জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থারও সাধারন সম্পাদিকা। তাছাড়া তিনি বাংলাদেশ এথলেটিক্সিস, আর্চারি এবং ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনগুলোতে জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সিলেট প্রতিনিধি।
উনাদের চাচাতো ভাই রামা লুসাই’এর খেলার অস্পষ্ট স্মৃতিও মাঝে মধ্যে চোখে ভাসে। আমার মনে পড়ে, কোন এক সময় সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে উনাকে ফুটবল খেলতে দেখেছি। রামা লুসাই ছিলেন একজন অসাধারন প্রতিভার অধিকারী, তিনি জাতীয়দলের হয়ে একাধারে খেলেছেন ফুটবল এবং হকি। অনেক বছর খেলেছেন ঢাকা মোহামেডানের হয়ে। ছোটবেলা উনার নাম রেডিও ধারা-বিবরণীতে প্রায়ই শুনতাম, পরবর্তিতে টেলিভিশনে উনার খেলা দেখার স্পষ্ট স্মৃতি এখনও চোখে ভাসে, বিশেষ করে আবাহনী বনান মোহামেডানের কিংবা জাতীয়দলের খেলায়।
উনাদের পরবর্তি প্রজন্মের বিয়াকা লুসাই’ও (প্রয়াত দনদন লুসাইয়ের বড় ছেলে) কয়েকবছর পূর্বে ইলেভেন ষ্টারের হয়ে ফুটবল খেলেছেন, জানালেন রায়হান ভাই। উল্লেখ্য, বিয়াকা লুসাই বাংলদেশ একাদশের হয়ে ভারতে একটি হকি টুর্নামেন্টও একবার অংশ নেন।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এই পরিবারের সকলেই ফুটবল, হকি, ভলিবল, এথলেটিক্স সহ অন্যান্য খেলাধুলায় সমান পারদর্শী ছিলেন যা খুবই বিরল। ইতিহাসের পাতায় এই পরিবারের সদস্যদের কৃতিত্বের জন্য উনাদের নাম স্বর্নাক্ষরে লিখা থাকবে।
তথ্য সূত্র ঃ আমার ছোটবেলার স্মৃতি ও উইকিপিডিয়
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ জনাব যৌবেল লুসাই এবং জনাব রায়হান আহমদ

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com