এক কাপ চা কিংবা কফি

প্রকাশিত: ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৫

এক কাপ চা কিংবা কফি

চা পছন্দ করেন না এমন লোকের সংখ্যা খুব কমই মিলবে। আর উপকারিতা কিংবা ভালো লাগা যা-ই হোক, দিনে কয়েককাপ চা অনেকেই খান। আবার অতিথি আপ্যায়নে বা আড্ডায়ও চা থাকেই। আর সকালে ঘুম থেকে উঠে এককাপ ধোঁয়া ওঠা চা খেলে মনেই হবে, যেন শরীরে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার সৃষ্টি হয়েছে। সবমিলিয়ে চা আমাদের নিত্যদিনকারই সঙ্গী।
বর্তমান পৃথিবীতে পানির পরে দ্বিতীয় পানীয় হল চা। চা গাছের পাতা ও কুঁড়ি বিশেষভাবে শুকিয়ে তৈরি হয় এ চা। চা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সিনেনসিস। এর ইংরেজি নাম ‘টি’। গ্রিকদেবী থিয়ার নামানুসারে এর নাম ‘টি’ হয়। চীনে ‘টি’ এর উচ্চারণ হতো ‘চি’ বলে। পরে ‘চি’ থেকে হয়ে যায় ‘চা’।
উৎপাদন অনুসারে চা পাতার পাঁচটি ভাগ রয়েছে। কালো চা, সবুজ চা, ইস্টক চা, উলং চা ও প্যারাগুয়ে চা। প্রায় সব রকম চা-ই ক্যামেলিয়া সিনেনসিস থেকে তৈরি। কিছু আছে ভেষজ থেকে তৈরি; যা পাতা, ফুল, লতা বা উদ্ভিদের অন্যান্য অংশ থেকে নেয়া হয়, যাতে ক্যামেলিয়া সিনেনসিস নেই। যেমন-তুলসী চা। তবে সারা পৃথিবীতেই কালো কিংবা সবুজ চা-ই বেশি পান করা হচ্ছে।
চায়ের আদিভূমি বলা হয় চীনকে। চীনের পুরাণ ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ সালে চীনের সম্রাট শেন নাং বিচিত্র এক আইন জারি করলেন। আইনে বলা হল সবাইকে পানি পান করার আগে তা ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে। তো একদিন সম্রাটের জন্য পানি ফুটাতে দেয়া হল, ঠিক তখন কোথা থেকে যেন সম্রাটের পানির পাত্রে কিছু চা পাতা উড়ে এসে পড়ল, আর তখন পানির রঙও বদলে গেল। আর এ পাতা ভেজানো পানি ছিল তাদের কাছে অভূতপূর্ব। তারপর থেকেই চীনের সবাই গরম পানিতে চা ভিজিয়ে খেতে শুরু করল। আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে পড়ল সারা দুনিয়ায়।
১৬৫০ সালে চীনে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। ভারতবর্ষে চায়ের চাষ শুরু ১৮১৮ সালে। আর ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়ে একটি চা বাগানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চা চাষের যাত্রা শুরু হয়। তবে বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশে চায়ের চাষ শুরু হয় ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনিছড়ায়।
চাগাছ মূলত পাহাড়ি ঢালুতে চাষযোগ্য উদ্ভিদ। আর চা চাষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। অবশ্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে সমতলেও চা চাষ করা সম্ভব। সাধারণত ২০ সেন্টিমিটারের চাগাছের চারা দেড় মিটার পরপর লাগাতে হয়। তিন বছর পর এ গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। তবে পাঁচ বছর হলে গাছ পরিপূর্ণ হয়। একটি চা গাছ থেকে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত পাতা সংগ্রহ করা যায়।
পৃথিবীতে দুই প্রজাতির চাগাছ রয়েছে। আসাম ও চীন। আসাম প্রজাতি ভারত ও শ্রীলংকায় এবং চীন প্রজাতি চীনসহ অন্য অঞ্চলে চাষ হয়। আসাম প্রজাতির চাগাছ বেশি পাতাযুক্ত এবং ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। কিন্তু পাতা সংগ্রহের জন্য এগুলোকে ছেঁটে ৪ ফুটের বেশি বড় হতে দেয়া হয় না। অন্যদিকে চীন প্রজাতির চাগাছ আকারে ছোট হয়, পাতাও কম থাকে। স্বাদ ও গন্ধের দিক থেকে চীন প্রজাতির চায়ের সুনাম বেশি। তবে রঙের জন্য আসাম প্রজাতির চা অতুলনীয়।
অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও চা অন্যতম শিল্প মাধ্যম। বাংলাদেশে মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বাহ্মবাড়িয়া ও পঞ্চগড়ে চায়ের বাগান আছে ১৬৬টি। এর মধ্যে শুধু মৌলভীবাজার জেলায় ৯০টি। এসব বাগানে জমির পরিমাণ ৫৮ হাজার ৭১৯ হেক্টর। এ বাগান থেকে উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ৬৬.২৬ মিলিয়ন কেজি।
বাংলাদেশে পাঁচ ধরনের চা উৎপাদন হয়। সবুজ, কালো, উলং, ইনস্ট্যান্ট (Instant ) ও সাদা চা। এসব চা রফতানি হয় ২৫টি দেশে। রফতানির দিক থেকে বাংলাদেশ অষ্টম। আর চা পানে বাংলাদেশ ১৬তম স্থানে আছে।
অনেকেই বলে থাকেন চা খেলে ঘুম আসে না, চা লিভারের ক্ষতি করে, কিংবা চা খেলে শরীরে কালোদাগ পড়াসহ অনেক ক্ষতি হয়, এটি মোটেও ঠিক নয়। বরং চায়ে অনেক উপকারিতা আছে। চায়ের মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েড নামে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস আছে যা শরীরের নানাবিধ উপকার করে। গবেষকরা বলেন, অনেক ফলমূল থেকেও চায়ে বেশি পরিমাণ উপকারিতা পাওয়া যায়। ভিটামিন-‘বি’, ভিটামিন- ‘সি’, পটাশিয়াম ও জিংক আছে চায়ে।
চায়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো গ্রিন-টি বা সবুজ চা। এ চা খেলে ওজন কমে, ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ করা যায়, হার্টের সমস্যা দূর হয়, ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে, শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমায়, দাঁতের ক্ষয়রোধ করে, ত্বকে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে দেরিতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, হৃদ রোগের ঝুঁকি কমাসহ ইত্যাদি উপকারিতা আছে।
সবুজ চায়ের মতো আদা দিয়ে চা খেলেও অনেক উপকার পাওয়া যাবে। আদা চা খেলে বমি ভাব দূর হয়, পাকস্থলীর কর্মক্ষমতা বাড়ায়, ঠাণ্ডা, সর্দি, কাশি কমাতেও আদা চায়ের ভূমি অনেক। রক্তের সঞ্চালন বাড়ায়, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। চাইলে এককাপ আদা চা খেয়ে মানসিক চাপও কমাতে পারেন, সে গুণও চায়ে রয়েছে।
তবে বরাবরই দুধ চায়ের চেয়ে সবুজ, কালো বা ‘রঙ’ চা বেশি কার্যকর। কারণ চায়ে যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস উপাদান আছে, তাতে দুধ মিশালে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসের কার্যকারিতায় কিছুটা ভাটা পড়ে। সেজন্য দুধবিহীন চা-ই ভালো।
চায়ের সঙ্গে আদা ও হলুদ মিশিয়ে তৈরি করা যায় হলুদ চা। ১৫ থেকে ২০ মিনিট পানিতে ফুটিয়ে ছেঁকে এর সঙ্গে লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে তৈরি হলুদ চা শরীরের কাটাছেঁড়া ও পোড়া ক্ষত সারাতে সাহায্য করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, হজমের সমস্যা মেটায়, সর্দি, কাশি বা গলাব্যথা সারে। শরীরের সজীবতাও বাড়ায়।
শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে সেখানে সবুজ চায়ের লিকারে তুলা ভিজিয়ে লাগিয়ে দিলে রক্ত পড়া বন্ধ করতে সাহার্য করবে। পোকামাকড় কামড়ালে সেখানেও ভেজা সবুজ পাতা লাগালে আরাম পাওয়া যাবে। চা পাতার সেদ্ধ পানি চুল পড়া বন্ধে সহায়ক। কাঁচা চা পাতা ও তুলসী পাতা একসঙ্গে সেদ্ধ করে মাথায় লাগালে উকুন দূর হবে।
রূপচর্চার জন্য ক্লিনজার, টোনার, স্ক্র্যবার, ফেসপ্যাকসহ বিভিন্ন উপাদান তৈরি করা যায় চা পাতা দিয়ে। এছাড়া সবুজ চায়ে রয়েছে পলিফেনল, ট্যানিল ও ফ্লোরাইড। এ উপাদানগুলো ত্বকের অনেক উপকার করে। বলিরেখা, বয়সের ছাপ ইত্যাদি দূর করে। চোখের ক্লান্তির ছাপ কাটাতে ভেজা ‘টি’ ব্যাগ চোখের ওপর রাখলে অনেক উপকারে আসবে। ত্বকে আঁচিলের সদস্যা থাকলে সেখানে চাগাছের তেল ফোঁটা ফোঁটা লাগান, আঁচিল ভালো হতে সাহায্য করবে।
ক্লিনজার হিসেবে গ্রিন টি খুব উপকারী। এক টেবিল চামচ সাধারণ ক্লিনজারের সঙ্গে এক টেবিল চামচ গ্রিন টি মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি মুখে মেখে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন। এতে ত্বকের ময়লা, ঘাম তেল পরিষ্কার হবে। ত্বকের আদ্রতার ভারসাম্যও রক্ষা পাবে।
স্ক্রবার হিসেবেও চায়ের জুড়ি নেই। এক টেবিল চামচ চিনি, এক টেবিল চামচ চালের গুঁড়া, এক টেবিল চামচ কাঠ বাদামের গুঁড়া, পরিমাণমতো গ্রিন টি ও গোলাপজল একসঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এ মিশ্রণটি মুখে ও গলায় শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত মাখিয়ে রাখুন। তারপর ঘষে ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের মরাকোষ, কালোদাগ দূর হবে। ত্বক কোমল, মসৃণ ও উজ্জ্বল হবে। নিয়ম করে সপ্তাহে তিনবার এ মিশ্রণ লাগালে বলিরেখা দূর হবে।
চাইলে চা দিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করতে পারেন। এক টেবিল চামচ বেসন, একটা ডিমের সাদা অংশ, এক চা চামচ মধু, এক চা চামচ কাঠ বাদামের গুঁড়া, পরিমাণমতো চায়ের লিকার মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করুন। এ মিশ্রণ মুখে ও গলায় মাখান এবং শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে। চায়ের লিকার মেশানো পানিতে কিছুক্ষণ পা ডুবিয়ে রাখলে পায়ের দুর্গন্ধ অনেকটাই কমবে। এমন আরও অনেক উপকারিতা আছে চায়ে। তবে গর্ভবতী নারীদের খুব বেশি চা খাওয়া উচিত নয়।