এক গাভীতেই পাওয়া যাবে বছরে ২৫টি বাছুর !

প্রকাশিত: ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০১৬

এক গাভীতেই পাওয়া যাবে বছরে ২৫টি বাছুর !

এসবিএন ডেস্কঃ দেশে প্রাণীসম্পদ খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছেন গবেষকরা। টেস্টটিউব বেবির আদলে এবার বছরে একটি গরু থেকেই পাওয়া যাবে ন্যূনতম ২০ থেকে ২৫টি বাছুর। গরুর মাংস আর দুধের ঘাটতি পূরণে সম্ভাবনার এ নতুন বার্তা দিয়েছেন সাভারে বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) গবেষকরা।

দেশে প্রথমবারের মতো একটি গাভী থেকে একযোগে দু’টি বাচ্চা উৎপাদনে সফলতা দেখিয়েছেন সরকারি এ প্রাণীসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা। ‘ইনভারট্রো অ্যামব্রায়ো প্রোডাকশন’ বা আইভিপি প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়োটেকনোলজি বিভাগের গবেষক ড. গৌতম কুমার দেবের নেতৃত্বে একদল গবেষক চার বছরের টানা গবেষণায় নিজেদের সাফল্যের কথা জানান।

তাদের এ গবেষণার ফলে গত শনিবার রাতে টেস্টটিউবের মাধ্যমে একটি গাভী থেকে জন্ম নেয় দু’টি বকনা বাছুর। বর্তমানে গাভী ও যমজ বাছুর সুস্থ রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে সূচনা হতে চলেছে নতুন দিগন্তের। গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. তালুকদার নূরুন্নাহার। দলে থাকা ড. গৌতম কুমার দেব জানান, প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ প্রাণীসম্পদের উন্নয়ন ঘটালেও দেশে প্রথমবারের মতো এ প্রযুক্তির ব্যবহারে সফলতা মেলে।

‘ইনভারট্রো অ্যামব্রায়ো প্রোডাকশন’ বা আইভিপি প্রযুক্তি আসলে কী? অনেকটা মানুষের টেস্টটিউব বেবির মতোই। এ পদ্ধতিতে অধিক উৎপাদনশীল দাতা গাভীর ডিম্বাশয় থেকে অপরিপক্ব বা বাড়ন্ত ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। পরে তা গবেষণাগারে পরিপক্ব, নিষিক্তকরণ এবং কালচার করে ব্ল্যাস্টোটিস পর্যায় পর্যন্ত বাড়িয়ে তোলা হয়। সেখান থেকে পরীক্ষামূলকভাবে দু’টি ভ্রুণ গাভীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। তারপর ধীরে ধীরে সেই ভ্রুণ বড় হয় মাতৃগর্ভে। ড. গৌতম কুমার দেব বলেন, আমরা দু’টি ভ্রুণের মাধ্যমে দু’টিই সুস্থ ও সবল বকনা বাছুর পেয়েছি।

গবেষণা দলে আরো ছিলেন ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ফারহানা আফরোজ, আহসানুল কবির, ফয়জুল হোসেন মিরাজ। আর গাভীতে ভ্রুণ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিএলআরআইয়ের গবেষকদের সঙ্গে অংশ নেন প্রাণীবিজ্ঞানী ড. সাহেব আলী।

টেস্টটিউব পদ্ধতির আদলেই আইভিপি পদ্ধতির এ গবেষণা দেশে প্রাণীসম্পদের চিত্রটাই পাল্টে দেবে। এমনটাই বলছেন বিএলআরআইয়ের প্রথম নারী মহাপরিচালকের দায়িত্বে আসা গবেষণা কার্যক্রমের নির্দেশক ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক তালুকদার নূরুন্নাহার।

তিনি জানান, এখন আমাদের লক্ষ্য লাগসই এ জীব প্রযুক্তির উদ্ভাবন প্রান্তিক খামারি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া। যার মাধ্যমে একটি গাভী থেকেই বছরে বাছুর মিলবে ন্যূনতম ২০ থেকে ২৫টি! যা দেশের ক্রমবর্ধমান মাংস ও দুধের ঘাটতি মিটিয়ে প্রাণীসম্পদ খাতকে সমৃদ্ধ করবে। কিন্তু কিভাবে?

ধরুন কোনো দুধেল গাই বা উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের কোনো গাভী। আমরা প্রথমে সেই গাভী থেকে ডিম্বানু সংগ্রহ করব। সেই ডিম্বাণু ল্যাবে পরিপক্ব, নিষিক্তকরণ এবং কালচার শেষে তা ভ্রুণে পরিণত করা হয়।

এভাবে দিন ৭ ল্যাবে থাকার পর অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা দুধ কম দেয় এমন গরুর জরায়ুতে তা স্থাপন করা হয়। এভাবে নির্ধারিত সময়ে ভ্রুণ বেড়ে ওঠে এবং ১০ মাসের কম-বেশি সময়ের মধ্যে সেই গরু থেকে বাছুর পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, এভাবে আমরা একটি সুস্থ সবল ও উচ্চ উৎপাদনশীল গাভী থেকে বছরে ন্যূনতম ২০ থেকে ২৫টি সুস্থ ডিম্বাণু দিয়ে তা সমসংখ্যক গাভীর গর্ভে স্থাপনের মাধ্যমে উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়াতে পারি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতিতে বাছুর উৎপাদনের মাধ্যমে সফলতা পেয়েছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও বহু আগে থেকে এ পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রাণীসম্পদের বিস্তার ঘটিয়েছে। সরকার তো কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমেও প্রাণীসম্পদের সম্প্রসারণ করছে। উচ্চ উৎপাদনশীল ষাঁড় থেকে ‘বীজ’ সংগ্রহ করে তা থেকেও কৃত্রিম প্রজনন করা হচ্ছে।

তাহলে এ পদ্ধতি সেদিক থেকে কতটা নতুনত্বের দাবি করে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই পার্থক্য আছে। ওই পদ্ধতি দিয়ে একটি বাছুরই উৎপাদন সম্ভব। আর এখানে দুধেল গাভী থেকে আমরা যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করছি সেখানে নিশ্চিত উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের প্রাণী উৎপাদন ছাড়াও একই মাতৃগাভী থেকে একাধিক বাছুর উৎপাদন সম্ভব।

দেশে মানুষ যেমন ছেলে সন্তান প্রত্যাশা করেন তেমনি খামারিরা প্রত্যাশা করেন বকনা (মেয়ে) বাছুর। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা সম্ভব কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই সম্ভব।

তবে এখনো আমরা সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। গবেষণা অব্যাহত রেখেছি। আশা করছি দেশেই একদিন এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। নূরুন্নাহার জানান, জীব প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণার জন্য বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বায়োটেকনোলজি বিভাগ। টেকসই জীব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রান্তিক পর্যায়ে তা সফল ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাণীসম্পদ খাতে আরেকটি সফলতার মাইলফলক অতিক্রম করল প্রতিষ্ঠানটি।