এক মহানায়কের প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:৩৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২৪

এক মহানায়কের প্রতিচ্ছবি

আবদুল মান্নান

 

গত শতকের সাতচল্লিশ-পূর্ববর্তী সময়ে অনেক বাঙালি রাজনৈতিক নেতা শত বছর ধরে শোষিত বাঙালি বা ভারতবাসীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার নামে ভাগ হলো বাংলা আর পাঞ্জাব। এই ভাগের পেছনে ছিল ইংরেজদের দুরভিসন্ধি আর রাজনীতিবিদদের অপরিণামদর্শী চিন্তাধারা। এই ভাগের ফলে লাখ লাখ মানুষ হয়েছিলেন স্বজন ও গৃহহারা।

 

অভিভক্ত বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত শতকের ত্রিশের দশকে শেখ মুুজিব একজন রাজপথের সৈনিক হিসেবে তাতে অংশ নিয়েছিলেন। তখন তিনি কলকাতার একজন কলেজছাত্র। যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গীয় মুসলিম লীগে। শেখ মুজিবের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায়।

 

মা-বাবার আদরের নাম খোকা। তিনি আজ বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৭ মার্চ তাঁর জন্মের ১০৪ বছর পূর্তি। বাঙালির মহানায়কের জন্মদিনে তাঁকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

 

বাল্যকাল থেকেই মুজিব যা কিছুকে সঠিক মনে করতেন তার পক্ষে অবস্থান নিতেন আর কোনো অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করতেন না। পড়ালেখার হাতেখড়ি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে।

 

হাই স্কুল পাস করার পর শেখ মুজিবকে ১৯৪২ সালে ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) পড়ার জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। কলকাতায় অবস্থানকালে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেন। এই সময় তিনি মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয়ের রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শে আসেন।

 

এটা এমন একটা সময়, যখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নেতাজি সুভাষ বোস এবং মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল। অন্যদিকে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে তছনছ করে দিচ্ছিল। মুজিবের প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন নেতাজি, গান্ধী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন সোহরাওয়ার্দী, শরৎ চন্দ্র বসু ও আবুল হাশিমের মতো রাজনীতিবিদদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

 

১৯৪৩ সালে, ব্রিটিশ সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণে বাংলায় একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অনহারে মারা গিয়েছিল। স্কুলজীবন থেকেই মুজিব একজন ভালো সংগঠক ছিলেন এবং তিনি অবিলম্বে কলকাতা ও গোপালগঞ্জের ক্ষুধার্ত মানুষকে সাহায্য করার জন্য ত্রাণ দল গঠন করেছিলেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল সংগ্রহ করেছিলেন। ক্ষুধার্তদের অন্ন জোগানোর চেষ্টা করেছেন। এই সময় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মুসলিম লীগের খাজা নাজিম উদ্দিন। হোসেন শহীদ সোহরাওর্দী ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। দুর্ভিক্ষের সময় মুজিবের মানবিক তৎপরতা তাঁকে সোহরাওয়ার্দীর কাছাকাছি নিয়ে আসে। সোহরাওয়ার্দী পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরুতে পরিণত হন।

 

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে ঘটে উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। যে ভারতবর্ষ আবহমানকাল ধরে ঐক্যবদ্ধ ছিল, কিছু স্বার্থপর রাজনীতিবিদ এবং ধুর্ত ব্রিটিশদের নিজ স্বার্থের কূটকৌশলের কাছে বলি হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রে বিভাজিত হয়। ওই একটি ঘটনা চিরকালের জন্য এ অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করেছে। আপনকে করেছে পর, আর নিজ দেশে কোটি মানুষকে করেছে পরবাসী। সেই বিভক্তির মাসুল এই দেশের মানুষ এখনো দিচ্ছে।

 

তরুণ মুজিব নিজেকে কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত করেন ১৯৪৭ সালে। কিছু সময়ের জন্য পূর্বের ধারাবাহিকতায় তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৯৪৮ সাল। সে বছর মার্চ মাসের ২১ তারিখ জিন্নাহর ঢাকা সফর তাঁর রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে দেয়। পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ উর্দু একটি শব্দও বলতে পারতেন না; কিন্তু রমনার রেসকোর্সে এক জন সভায়া বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি ইংরেজিতে বলেছিলেন যে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। সাধারণ জনগণ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর জন্য এক বিশেষ সমাবর্তনে তিনি একই কথা উচ্চারণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তাঁর এই দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের প্রতিবাদ করে। সেই সমাবর্তনে উপস্থিত ছিলেন তরুণ মুজিব। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে এ ধরনের বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবে না। প্রতিবাদকে একটি সংগঠিত আন্দোলনে পরিণত করার জন্য তাদের একটি সংগঠনের প্রয়োজন হবে। তাঁর হাতেই ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের জন্ম হয় (পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়)। ছাত্রনেতা হিসেবে এটিই ছিল পূর্ব বাংলায় মুজিবের রাজনীতিতে প্রথম পদক্ষেপ। পরের বছর, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নামে নামকরণ করা হয়) প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় শেখ মুজিব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 

মুজিব ২৩ বছরের অবিভক্ত পাকিস্তানের রাজনীতির ১৩ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা আওয়ামী লীগকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করেছিল। এটিই একমাত্র দল, যা পাকিস্তানের ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

 

মুজিব দুইবার মৃত্যুর মুখোমুখি হন, একবার ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আর দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। কেবল শেখ মুজিবের সাহস এবং মানুষের ভালোবাসা তাঁকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর অভূতপূর্ব বিজয়ের পর আর ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে মুজিব হয়ে ওঠেন বাঙালির জাতির পিতা। শুরুতে ছিলেন ছাত্রনেতা, তারপর প্রাদেশিক নেতা, ১৯৬৯-এর পর জাতীয় নেতা আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক নেতা, বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর।

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ রাতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সব সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুজিব মাত্র ৫৫ বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি শুধু এই উপমহাদেশের ইতিহাস ও ভূগোল পরিবর্তনই দেখেননি; তিনি ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তিনটি পতাকার নিচে বসবাস করেছেন, জন্মের সময় থেকে দেশভাগ পর্যন্ত ব্রিটিশ, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান আর পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের পতাকার নিচে, যা সৃষ্টির পেছনে তিনি ছিলেন মুখ্য কারিগর। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা, যাঁর দূরদৃষ্টি ছিল। জোসেফ ক্যাম্পবেল একজন আমেরিকান সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি লিখেছেন : ‘একজন নায়ক হলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে নিজের চেয়ে বড় কিছুর জন্য উৎসর্গ করেছেন।’ এই জাতির ইতিহাসে মুজিবের অবদানের মূল্যায়ন করলে এর চেয়ে সত্য কথা আর কারো বেলায় হতে পারে না।

 

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে বেঁচে ছিলেন সাড়ে তিন বছর। এই সাড়ে তিন বছরে তিনি তাঁর অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর তিনি এবং তাঁর দল অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিলেন দীর্ঘ একুশ বছর। ১৯৯৬ সালে তাঁর বেঁচে যাওয়া দুই কন্যার বড়জন শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে শুরু করে।

 

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক