ঐন্দ্রজালিক প্রহসন চলছে ঃ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

প্রকাশিত: ৩:৫৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৮

ঐন্দ্রজালিক প্রহসন চলছে ঃ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সেই আওয়ামী লীগ আজ নেই। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের জন্মকালে দলটির যে চরিত্র ছিল, সেটা সোহরাওয়ার্দীর হাতে দক্ষিণপন্থার দিকে চলে যায়। এরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একসময় মধ্য-বাম নীতি গ্রহণ করলেও এখন আবার মধ্য-ডানে চলে গেছে। আগে আওয়ামী লীগ ছিল চরিত্রগতভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির, সেটা বদলে হয়েছে লুটেরা ধনিকশ্রেণিনির্ভর। তিনি আজ একটি জাতীয় দৈনিকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন । ডাকসুর সাবেক ভিপি সেলিম সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে খুব আশাবাদী । তিনি বলেন, এতে আমরা একটা বিস্ফোরণ দেখলাম। ছাত্র-জনতার মধ্যে ক্ষোভ ছিলই। তাদের কথা যা চলছে, সেটা আর চলতে পারে না। পরিবর্তন দরকার। শুধু কথার কথা নয়, ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ সড়কের ইস্যুতে দেখিয়ে দিল যে পরিবর্তন সম্ভব। এটা দিগন্তের উন্মোচন। সংখ্যাগত বিচারে উনসত্তরের ছাত্র আন্দোলনের চেয়ে এটা যে আরও ব্যাপক, তা সন্দেহাতীত। এটা স্বতঃস্ফূর্ত, এটা দুর্বলতা নয়, শক্তি। একে এখন সচেতনতার দিকে নিতে হবে। তারা ‘রাষ্ট্র মেরামতের’ আওয়াজ তুলেছে। আমরা স্লোগান দিতাম কৃষক, শ্রমজীবী, ছাত্র-জনতা এক হও, এখন বাকি মেরামতকাজে তাদের টানতে হবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থাসহ অনেক কিছুই করার আছে। আপনি বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের যে কথা বললেন, সেটা সংবিধানবিরোধী। কারণ, নির্বাচনকালে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কার্যত প্রয়োগ করবে ইসি। তাই প্রধানমন্ত্রী যিনিই হোন, তিনি যদি চলমান অবস্থার চরিত্রই বহাল রাখেন, তাহলে এ দেশে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। সংবিধানে একটা সংশোধনী এনে ১২৬ অনুচ্ছেদের মর্ম সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এ ধরনের একটি সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে অবাধ নির্বাচন অসম্ভব। গত পাঁচটি সিটি নির্বাচনে তা আবারও নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে ।
আজ আপনার সঙ্গে এক পরিস্থিতিতে কথা বলছি, সেটা কাল বা আগামী মাসে কী হবে, তা আপনি যেমন, তেমন আমিও বলতে পারি না। নির্বাচন করতেও পারি বা বয়কটও করতে পারি, সেটা আন্দোলনের কৌশল হিসেবে। এখন কাজ হলো অবাধ নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী আন্দোলন করা।
বিএনপি প্রসঙ্গে তিনি বলেন,আমরা এবং বিএনপি উভয়ে আওয়ামী শাসনের বিরোধী। তবে মৌলিক পার্থক্য হলো বিএনপি দক্ষিণপন্থী ও আমরা বামপন্থী অবস্থান থেকে বিরোধিতা করি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নীতি, আদর্শ ও সামাজিক মর্যাদাগত দিক থেকে সমমনা দল, বলা যায় যে বিএনপি ‘দুই নম্বরি’ বিরোধী দল। আমরা একটিকে আপদ, অন্যটিকে বিপদ বলি। বলি ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় পড়লে মানুষের মুক্তি হবে না।

বামদের জনবিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে তিনি বলেন, বামেরা জনবিচ্ছিন্ন এটা সম্পূর্ণ অসত্য। জাতীয় সম্পদ রক্ষা, সুন্দরবন, যৌন নির্যাতন, গার্মেন্টস, গণজাগরণ মঞ্চ—এ রকম আরও অনেক ইস্যুতে সব আন্দোলনে সামনে রয়েছে বামপন্থীরা এবং সবাই বিশ্বাস করে যে আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই শক্তি আমাদের আছে। আমরা এটা পারি। তবে এসবকে ভোটের সংখ্যায় রূপান্তর করতে পারিনি। কারণ, আমাদের দল বহুদিন গোপন ছিল। পাকিস্তানের পুরোটাই। স্বাধীনতার পর দু-দুবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরশাদের পতনের পর শাসকশ্রেণির কৌশল হলো সরকার ও বিরোধী দল—দুটোকেই তারা নিয়ন্ত্রণে রাখবে। তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই মেরুকরণ এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে এর বাইরে আর কোনো শক্তি না আসতে পারে। সে জন্য আজ মানুষ জানতে চায়, আপনি আওয়ামী লীগপন্থী, নাকি বিএনপিপন্থী?
জাতীয় ঐক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমিও জাতীয় ঐক্য চাই। কিন্তু আরও যাঁরা বলেন, তাঁদের এ বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধই ছিল জাতীয় ঐক্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। চার নীতিতে তার মর্মবাণীর প্রকাশ ঘটে। যাঁরা চার নীতির ধারায় দেশকে ফেরাতে চান না, তাঁদের মুখে জাতীয় ঐক্যের কথা মানায় না। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনোটিই থাকার সুযোগ নেই। তারা চার নীতি থেকে দূরে চলে গেছে। আর বাকিরা যদি এই দুটি দলের নব্য সংস্করণ হয়, তাহলেও চলবে না। বিকল্প নীতি দিতে হবে। আমরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের কাতারে আছি। কারণ, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সিক্সটি-ফরটির নয়।

বিচার বিভাগ, মিডিয়া, ইসি ও অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সেলিম বলেন, এর সবটাই আজ পায়ের নিচে পিষ্ট, চরমভাবে আক্রান্ত এবং ধ্বংসের উপক্রম। আগের মতো সবটা চোখে পড়বে না। ডিজিটাল তো, তাই ঐন্দ্রজালিক প্রহসন চলছে। ভোট গণনার রিপোর্ট কোনটি যাবে, কোনটি যাবে না, সেখানেও এখন একই কৌশল। পি সি সরকারের জাদু। হাতসাফাই। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এক নয়। সাংবাদিকদের স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণটা কখনো বড় বড় করপোরেট হাউস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, আবার কোথাও তারা পারস্পরিক যোগসাজশ করে কাজ করছে।