“ওপেন্টি বায়স্কোপ, নাইন টেন টেস্কোপ

প্রকাশিত: ২:১৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২০

“ওপেন্টি বায়স্কোপ, নাইন টেন টেস্কোপ

অসিত কুমার দাস

“ওপেন্টি বায়স্কোপ, নাইন টেন টেস্কোপ, চুলটানা বিবিয়ানা, সাহেব বাবুর বৈঠকখানা, সাহেব বাবু এসেছেন,পান-সুপারী খেয়েছেন, পানের আটা -মরিচ বাটা, ইস্পিরিঙ্গের ছবি আঁকা, যার নাম মণিমালা – সে পাবে মুক্তার মালা।”—– আমরা যখন অনেক ছোটো, বিদ্যালয়ের মধ্যে আনমনা মন নিয়ে বসতে চাইতো না শ্রেণীকক্ষে, তখন সুযোগ পেলেই মজার মজার খেলা শুরু করে দিতাম। আমি ফেলে আসা সেই ১৯৮০ সালের কথা বলছি। যখন আমি শ্রীশ রঞ্জন দেবরায় অর্থাৎ শিষ বাবুর স্কুলের ছাত্র তখন আমরা ঐ খেলাগুলো খুব মজা করে খেলতাম । যখন স্যার দুপুরে স্নান বা মধ্যাহ্ণ ভোজনে চলে যেতেন সেই সময়টায়। শিষ বাবু স্যারের স্কুল আর বাসা ছিল খুবই পাশাপাশি। স্কুল আর বাসার মধ্যেখানে ছিলো বড় একটি উঠান। সেই উঠানকেই আমরা মাঠ হিসেবে ব্যবহার করতাম। স্কুলে শিষ বাবুর হাতের চিমটি খায় নাই, এমন ছাত্র-ছাত্রীর খোঁজ পাওয়া খুবই মুসকিল। শিষ বাবু স্যার ছিলেন, সুঠাম দেহের দাঁড়ি গোঁফ ওয়ালা ব্যক্তি। পরনে ধুতি, পায়ে খরম, গায়ে হাত কাটা পাঞ্জাবি, আবার কখনো খোঁড়া গেঞ্জি ও পড়ে স্কুল চলে আসতেন। যেহেতু বাসা আর স্কুল পাশাপাশি তাই। কখনো কখনো পেটে তেল মেখে ও চলে আসতেন স্নানের আগমুহূর্তে, যাতে ছাত্ররা পড়া ফাঁকি না দিতে পারে। আমরা সবাই চোখ কান খোলা রাখতাম, কখন স্যার এসে চিমটি মারবে কাকে। স্যারের বেশ কিছু গুণ ছিলো – তাহলো একই শ্রেণির সকল ছাত্রকে একসাথে গোল করে দাঁড়িয়ে উঠানে শব্দ করে ধারাপাত ঠোঁটস্ত করাতেন। তাঁর নিজস্ব কঠিন শব্দ ভাণ্ডার দিয়ে একটি বই তৈরি করেছিলেন, তা হলো “অমিয় পাঠ”। আমার জানামতে পৃথিবীর যত কঠিন বানান তা ছিলো এই “অমিয় পাঠ” বইটিতে এবং তা তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের মুখস্থ করিয়ে ছাড়তেন। যে ছাত্রের কোনো অংক ভুল হতো না, তাঁর খাতায় শিষ বাবু স্যার নিজ হাতে বাড়ির কাজের অংকের ডাক (যোগ,বিয়োগ,পুরণ,ভাগ)লিখে দিতেন এবং খাতাটি ক্লাসের পাশে বাঁশের বেড়ার মধ্যে উঁচু করে রেখে যেতেন এবং অত্র ক্লাসের অন্য সবাই তা দেখে দেখে নিজ খাতায় অংকের ডাক উঠিয়ে বাসায় নিয়ে পরের দিন বাড়ির কাজ করে নিয়ে আসতে হতো এবং তা ছিলো চলমান প্রক্রিয়া। স্যারের হাতের লেখাটি ছিলো সুপরিচ্ছন্ন এবং বেশির ভাগ সময় স্যার আমার খাতায় নিজ হাতে লিখে দিতেন এবং আমি সহপাঠীদের উদ্দেশ্যে খাতাটি বেড়ায় টাঙ্গিয়ে পাশে ওঁত পেতে থাকা ডান হাত মোড়ানো সবার প্রিয় কৃষ্ণ দা বসে থাকতো আমাদের জন্য চকলেট,লেবেনচুজ,ঘি চমচম, কাগজ দিয়ে বানানো চড়কি নিয়ে। আমরাও নিজের সাধ্যমতো করে কিনে নিতাম। শ্রীশ রঞ্জন দেবরায় অর্থাৎ শিষ বাবু স্যারের স্কুলটি ছিলো মৌলভীবাজার শহরের শান্তিবাগে। শিষ বাবু স্যার প্রয়াতঃ হবার পর স্কুল ও জায়গায়টিও তাদের পরিবারের হাত থেকে চিরবিদায় নেয়। আজ সেখানে ৫তলা বিল্ডিং মামুন কটেজ নামে পরিচিত। আমার বর্তমান কর্মস্থল সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেড, মৌলভীবাজার শাখার ঠিক পিছনে। আমার বৌ-বাচ্চাদের দেখিয়েছি আমার প্রয়াত স্কুলটিকে। স্বর্গীয় শ্রীশ রঞ্জন দেবরায় (শিষ বাবু)এর চার ছেলেঃ- সন্তোষ,সুভাষ, সঞ্জয় ও স্বপন দেবরায় এবং দুই মেয়ে মঞ্জু ও মায়া দেবরায়। শিষ বাবু স্যারের ৬(ছয়) ছেলে মেয়ের মধ্যে ৫(পাঁচ) জন পরিবার সহ প্রবাসে জীবনযাপন করছেন। একমাত্র সুযোগ্যা কন্যা মৌলভীবাজার পিটিআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত সুপারিন্টেন্ডেন্ট মায়া ওয়াহেদ শিক্ষা ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের জন্য নিজ উদ্যোগে ২০০৮ সালে পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন মৌলভীবাজারে শিশু কানন বিদ্যালয় নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং তিনিই শুধুমাত্র বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ইতোমধ্যে মায়া ওয়াহেদ এর প্রতিষ্ঠিত শিশু কানন বিদ্যালয় জাতীয় পর্যায়ে বেশ সুনাম অর্জন করে চলছে। আমার দুটি কন্যা সন্তান “অতশ্রী – অনশ্রী” মায়া ওয়াহেদ এর বিদ্যালয়ের ছাত্রী। বড় মেয়ে “অতশ্রী” শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিশু কানন বিদ্যালয়ে পড়ার পর এখন সে মৌলভীবাজার আলী আমজাদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির নিয়মিত ছাত্রী। আর আমার ছোটো মেয়ে “অনশ্রী” শিশু শ্রেণি থেকে এখন পঞ্চম শ্রেণির নিয়মিত শিক্ষার্থী মৌলভীবাজার শিশু কানন বিদ্যালয়ের। শিষ বাবু স্যার যেভাবে খড়া শাসনের মধ্য দিয়ে আমাদের আদর যত্ন দিয়ে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে চেয়েছিলেন, আশা করি আমার স্যারের সুযোগ্যা কন্যা মায়া ওয়াহেদ ও কড়া শাসনের মধ্য দিয়ে লেখাপড়া,খেলাধুলা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে আমাদের সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ হবার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন এই প্রার্থনা করি সবসময়। আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক স্বর্গীয় শ্রীশ রঞ্জন দেবরায় অর্থাৎ শিষ বাবু স্যারের আদি নিবাস সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানায়। স্যারের কোনো ছবি আমার কালেকশনে নেই, থাকলে আপনাদের দেখাতে পারতাম। শারীরিক দিক দিয়ে স্যারকে অনেকটা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো আমার কাছে মনে হতো। শিষ বাবু স্যারের স্কুলে আমার সহপাঠী ছিল মতচ্ছির, জয়দেব, নন্দলাল,বিকাশ, সরওয়ার,তাজুল। ওদের কথা খুব বেশি করে এখন মনে পড়ছে। তাদের অনেকেই বিদেশে, কেউ ব্যবসা, আবার কেউ সংসারের টানাটানিতে ব্যস্ত। তারপর ও আমার —“ওপেন্টি বাইস্কোপ, নাইন টেন টেস্কোপ-এর সহপাঠী সাথীরা যেখানেই থাকো,সচেতন থাকো, করোনা ভাইরাস (COVID-19)এ গৃহবন্দী থেকে নিজের বাচ্চাদের শিখিয়ে দাও তোমার ফেলে আসা মজার মজার খেলা গুলো । ভালো থাকো সারাবেলা সবাই, যেমনটি ছিলে ।

ছড়িয়ে দিন