ঢাকা ১৯শে জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১২ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

কবিতা ক্যাফেতে হার্দিকপ্রকাশ সম্মাননার অনুষ্ঠানে

redtimes.com,bd
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৮, ২০২২, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
কবিতা ক্যাফেতে হার্দিকপ্রকাশ সম্মাননার অনুষ্ঠানে

কামরুল হাসান 

হাতি সড়কের ‘কবিতা ক্যাফে’ হয়ে উঠেছে সাহিত্যমোদীদের এক প্রিয় গন্তব্য। নিকটবর্তী প্রতিবেশি ও প্রতিদ্বন্দ্বী ‘দীপনপুর’ বন্ধ হয়ে গেলে সে হয়ে উঠেছে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সড়কটির শেষপ্রান্তে ‘পাঠক সমাবেশ’ অবশ্য রয়েছে তার মতো সৌন্দর্য বিছিয়ে। বই, ক্যাফে আর অনুষ্ঠান- এই ত্রিমুখী আকর্ষণ রাজধানীতে গড়ে ওঠা নতুন ভাবনার জায়গাগুলোর। ‘কফিতা ক্যাফে’তে সাহিত্য অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। মুজিব জন্মশতবর্ষ, স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে গত ২২শে জানুয়ারী ২০২২ তারিখে এখানে অনুষ্ঠিত হলো কবি বাঙ্গাল আবু সঈদ স্মৃতি পরিষদের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আরেকটি উপলক্ষ কবি বাঙ্গাল আবু সঈদের ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ।
আমি যখন কবিতা ক্যাফেতে পৌঁছলাম তখনো কেউ আসেনি, অর্থাৎ আমিই প্রথম। প্লাস্টিকের সবুজ চেয়ার সারি, অনুচ্চ মঞ্চে লাল চৌকো আসনগুলো, একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পোডিয়াম বলে দেয় অনুষ্ঠানের ডেকোরেটিভ প্রস্তুতি। মঞ্চ প্রস্তুত, লোকেরা এলেই শুরু হবে। দ্বিতীয় যিনি এলেন তার নাম মিলি হক। খুলনার
মেয়ে তিনি, একটু বেশি বয়সে লিখতে শুরু করেছেন, যখন সন্তানেরা বড়ো হয়ে পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে।

 


তার সাথে যখন বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছি তখন এলেন অচেনা দুজন। কবিকন্যা মেরিনা সঈদকে ফোন করে জানলাম তিনি আসছেন। যে ব্যানারটি টাঙানো হবে সেখানে একটু ভুল হয়েছিল, তাই পুরো ব্যানারটি পুনরায় মুদ্রিত করতে খানিকটা বিলম্ব হলো। তিনি যখন এলেন ততক্ষণে এসে গেছেন ‘আবৃত্তিমেলা’র বেশ কিছু আবৃত্তিশিল্পী। আজ এ অনুষ্ঠানে কতিপয় গুণী ও মেধাবী মানুষকে কবি বাঙ্গাল আবু সঈদ স্মৃতি পরিষদের ‘হার্দিকপ্রকাশ’ সম্মাননা পদক প্রদান করা হবে। এদের একজন হলেন দেশের প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী মাহিদুল ইসলাম, যিনি এ শিল্পের একজন গুরুও বটেন। যারা এসেছেন তারা মাহিদুল ইসলামের সংগঠন ‘আবৃত্তিমেলা’র সদস্য। গুরু আসতে পারেননি, শিষ্যদের পাঠিয়ে দিয়েছেন।
দুই শিশুপুত্র আজান ও দানিয়েলকে নিয়ে মেরিনা সঈদ যখন এলেন তখন হলঘরে আরও কিছু অতিথি এসে গেছেন। এদের একজন হলেন কবি জোহরা রুবি। মিলি হকের মতো তাকেও প্রথম আমি কবিতা ক্যাফেতেই দেখি। সম্ভবত মেরিনা সঈদকেও এমনি একটি অনুষ্ঠানে এই কবিতা ক্যাফেতেই প্রথম দেখতে পাই। প্রয়াত বাবার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তার প্রচেষ্টা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আজো দেখি সাধ্যের অতিরিক্ত আয়োজন। বহু প্রতীক্ষিত ব্যানার নিয়ে আসে দুজন, মঞ্চের উপরে তা টাঙানো হয় বেশ শক্তপোক্তভাবেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবিগুলো পাশের বুকশেলফের উপর লাগানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ব্যানারের ঠিক মধ্যিখানে উড্ডীন জাতীয় পতাকা ও কবি বাঙ্গাল আবু সঈদ স্মৃতি পরিষদের চেয়ারম্যান কবি মেরিনা সঈদের হাস্যোৎফুল্ল ছবি। সেখানে বেশ বড়ো করে লেখা ৫০ সংখ্যাটি। ব্যানারের একপাশে হার্দিকপত্রের প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ, অন্যপাশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা মেরিনা সঈদের একটি কবিতা ‘বঙ্গবন্ধু’ মুদ্রিত।
ব্যানার টাঙানো চলছে এমনি সময়ে আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হাইকোর্টের বিচারপতি এস. এম. মজিবুর রহমান চলে আসেন, তার সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ নূরউদ্দিন ও এক নিরাপত্তা প্রহরী। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ও বিশেষ অতিথি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা আছেন কাছেই বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবে ক্ষণিক বিশ্রামে। তিনি অনুষ্ঠান শুরু করে দেবার সবুজ সঙ্কেত দিলে মেরিনা সঈদ একজন উপস্থাপক খুঁজতে থাকেন, কেননা যার উপস্থাপনা করার কথা তিনি আসেননি। জোহরা রুবি হতে পারতেন নেক্সট বেস্ট অলটারনেটিভ, কিন্তু তার চাঁদপনা মুখটি কবিতা ক্যাফের আকাশের কোথাও দেখা গেল না। অগত্যা আবৃত্তিমেলার শিল্পীদের এক এক করে অনুরোধ করা হলো। প্রথম দুজন রাজি হলেন না, তৃতীয়জন, রাশেদুল ইসলাম রানা সহাস্য রাজি। যখন ওই নির্বাচন শেষ, উপস্থাপককে অনুষ্ঠানের সূচি বুঝিয়ে দিচ্ছেন মেরিনা সঈদ, তখন কবিতা ক্যাফের পরিচালক কবি নাহিদা আশরাফির কক্ষ থেকে বেরুলেন জোহরা রুবি। আমরা চাঁদ পেলাম, কিন্তু তাকে আকাশে যথাযথস্থানে স্থাপন করতে পারলাম না।
উপস্থাপক রানা যখন অতিথিদের এক এক করে মঞ্চে আহবান করছিলেন তখন অনেকটা প্রথা ভেঙেই প্রধান অতিথি মাইক্রোফোন হাত তুলে নিয়ে বললেন, ওই বিভাজনের কী দরকার? সমুখের শূন্য হয়ে যাওয়া চেয়ারগুলো তার মনোবেদনা জাগাল। তিনি প্রস্তাব করলেন সবাই মিলে গোলাকার হয়ে একই সমতলে আসন নিয়ে বসতে। উচ্চ বিচারালয়ে যেখানে তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করেন সেখানে তাঁর আসনটি কিন্তু সকল বিচারেই উচ্চে, কিন্তু সাহিত্যসভা হলো ভিন্ন প্লাটফর্ম, এখানে উঁচু-নিচু নেই। তার ওই সাম্য আনায়নের আহবান প্রশংসিত হলেও কার্যকর হলো না কবিতা ক্যাফের কাঠামোগত ঋজুতার জন্য।
অনুষ্ঠান শুরু হলো সকলে মিলে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইবার মধ্য দিয়ে। সেই কবে কবিগুরু লিখেছিলে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ সেই থেকে বাঙালির প্রাণে ওই একই সুর, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। একটা শিহরণ জাগে শরীরে, যার নাম দেশপ্রেম। এরপরে বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারের পরলোকগত সদস্যগণ, মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদগণ, কোভিড-১৯ মহামারীকালে পরলোকগত কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবী ও কবি বাঙ্গাল আবু সঈদ স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হলো। অতিথিদের মাঝে ‘হার্দিকপত্র’-এর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যাটি, যার প্রচ্ছদে রয়েছে বঙ্গবন্ধু দুহাত উপরে তুলে জনতার প্রতি শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের হাস্যোৎফুল্ল ছবি, পেছনে লাল সূর্য, জনকের হাত থেকে উড়ছে শান্তির পায়রা, সবার মাঝে বিতরণ করা হলো। ‘হার্দিকপত্র’ হাতে নিয়ে সবাই ফের দাঁড়ালেন ছবি তোলার জন্য, অতিথিরা অনেকে যোগ দিলেন মঞ্চে। সকলের বুকের কাছে ধরে রাখা একসারি লাল আলোর মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলল লালবৃত্ত, আমাদের প্রাণের সূর্য।
স্বাগত বক্তব্যে কবিকন্যা মেরিনা সঈদ জানালেন ১০ই জানুয়ারি ছিল তার পিতা কবি বাঙ্গাল আবু সঈদের মৃত্যুবার্ষিকী। ওই একই দিনে বঙ্গবন্ধু স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সমগ্র জাতির জন্য দিনটি উল্লাসের। জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজ বাবার প্রয়াণের শোকপ্রকাশ সরিয়ে এনেছেন আজকের দিনটিতে। বললেন, শুধু যে শোক আছে তা নয়, উল্লাস আছে, আনন্দ আছে। করোনার এই সময়ে যারা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তিনি হার্দিকপত্রের পরবর্তী সংখ্যাটিতে প্রকাশিতব্য সম্পাদকীয় পাঠ করে শোনালেন। তা থেকে আমরা জানলাম এ সংখ্যাটির কাভার স্টোরি উন্নয়নের রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে। বাংলাদেশ তার সুবর্ণজয়ন্তীয় সবচেয়ে সুবর্ণ অধ্যায় দেখেছে গত ১৩ বছরে, যে ১৩ বছর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার একটানা দেশ পরিচালনা করে আসছে। অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে বাংলাদেশের। জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা তিনি।
মেরিনা সঈদের বক্তব্য প্রদানের সময় সভায় যোগ দিলেন জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। তাকে করতালির মধ্য দিয়ে স্বাগত জানালেন সবাই। মঞ্চ পেল তার মধ্যমণিকে। শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হলো। উত্তরীয়র নকশাটি হলো শোকের কালো রঙের দুপাশে পতাকার দুটি রঙ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30