কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য-জনবল বাড়াতে হবে

প্রকাশিত: ৩:২৪ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২০

কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে  স্বাস্থ্য-জনবল  বাড়াতে হবে


খছরু চৌধুরী

দেশে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশেরই চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা হয়নি। বাসায় মৃত ৬৪.৭৪ ভাগ চিকিৎসা পাননি । হাসপাতাল থেকে ফিরে মারা গেছেন ১২.৮২ ভাগ ।১.২৮ ভাগকে করোনা আতংকে চিকিৎসা দেয়া হয়নি, ৩.৯০ ভাগ মরে পড়েছিলেন রাস্তায়। গত ৮ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৮৬ জনের মৃত্যুর পর্যালোচনা করে “কভিড-১৯ উপসর্গে মৃত্যুসমূহ ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা” শীর্ষক গবেষনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। দেশী-বিদেশী ছাত্র, গবেষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত জরিফের ভিত্তিতে তৈরী করা হয় এই প্রতিবেদন (সূত্র:- ৯ এপ্রিলের দৈনিক সমকাল)। স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে তাহলে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থানার পদ্ধতিটা কেমন? চেইন অব কমান্ড ঠিক আছে কিনা? চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্ধারিত কর্মপন্থায় কাজ হচ্ছে কি না? বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ মোকাবেলার প্রস্তুতির জন্য ম্যানেজারিয়াল সিদ্ধান্তগুলো দেশের আর্থ-সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও লাগসই ছিল?
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার চেইন অব কমান্ড সম্পর্কে গবেষকদল কতটা জ্ঞাত তা’ আমার জানা নেই; তবে, আলোচনার শুরুতেই পাঠকদের একটা তথ্যদিয়ে অবহিত করছি, স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার সরকারী চেইন সাধারণ নাগরিকের ঘর টু টার্শিয়ারী হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই চেইনে শহরের চেয়ে গ্রাম এগিয়ে। জনসংখ্যার বর্তমান অনুপাতে সংখ্যায় অপ্রতুল হলেও স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার কাঠামোর অধীনে স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক স্তর ইউনিয়নের প্রতি তিন ওয়ার্ডে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে, মা ও শিশুর টিকাদানে এক বা দুইজন স্বাস্থ্যকর্মী (স্বাস্থ্য সহকারী) রয়েছেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবাদানকারী একজন সিএইচসিপিও আছেন। গোঠা ইউনিয়নের জনসংখ্যার বিপরীতে এবং বিভাগীয় কর্মীর দায়িত্ব পালনের সহায়ক তদারকির জন্যে একজন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও মেডিকেল অফিসার নিয়োজিত। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার প্রশাসনিক আদেশ-নির্দেশের আলোকে উপজেলা ভিত্তিক কাজের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকেন একজন একজন ইপিআই টেকনোলজিষ্ট, দুই বা তিন জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও একজন স্যানিটারী ইন্সপেক্টর এর সমন্বিত টিম। হাসপাতালে সেবা কার্যক্রমের বিভাজনে আরও রয়েছেন মেডিকেল অফিসার্স, নার্সেস ও অন্যান্য ধরণের হেলথ পারসোনেল। কাজের নির্ধারীত পদ্ধতি ও চেইন অব কমান্ডের নির্দেশনানুসারেই গ্রামের ভেতরে অসুস্থ হয়ে পড়া একজন রোগীকে ‘রেফারেল’ সিষ্টেমে খুব সহজেই মেডিকেল কলেজ বা কভিড-১৯ এর জন্য ডেডিকেটেড সরকারী হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া সম্ভব।
জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির উপরোক্ত ধরণের উন্নত চেইনের প্রশাসনিক কাঠামো, সরকারের আর্থিক সংগতি, অন্যান্য সীমাবদ্ধতা সবকিছু মাথায় নিয়েও যদি প্রশ্ন করি, কি এমন ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে? মরে গিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকবে? স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকেরা এমন প্রশ্নে লজ্জিত না-হলেও একজন নাগরিক হিসেবে আমরা লজ্জাবোধ করছি। কারণ কভিড-১৯ এর জন্য ঢাক-ডোল বাজিয়ে যতটা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তার বিপরীতে ততটাই ব্যর্থতা হলো চেইন অব কমান্ডের অধীনে থাকা সকল স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীকে একটিভ না করতে পারার। দেশের বর্তমান ও অতীতে দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্যব্যবস্থাপকদের আরও ব্যর্থতা হলো, ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে জনগণের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার যে গণবিমুখ ধারার সূচনা করা হয়েছিল সেই প্রবণতা থেকে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে না পারা।
শেখ হাসিনার সরকার ২০১১ সালে গণমুখী মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি অনুমোদন করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র পরামর্শ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের কর্মপদ্ধতির আলোকে গৃহিত এই গাইডলাইন্স দেশের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি আশাব্যঞ্জক দলিল। যে দলিলে ষ্পষ্টত উল্লেখ আছে জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য জনবল নিয়োজিত করা হবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবার নিমিত্তে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও ৫ জন অন্যন্য ধরণের হেলথ পারসোনেল এর পদ-সৃজন করা হবে। রোগের প্রতিরোধ কর্মকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। এটি-ই কার্যত: চিকিৎসা বিজ্ঞান নির্দেশিত কাজের ধারা বা পদ্ধতি। যেখানে একদল স্বাস্থ্যকর্মী স্থাপনা বা হাসপাতালের বাইরে মাঠ-পর্যায়ে জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবস্থান করে রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিরন্তর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন। যাদেরকে রোগ-প্রতিরোধের বা “প্রিভেন্টিভ” ধারার স¦াস্থ্যকর্মী বলা হয়। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে কর্মরত স্যানিটারী ইন্সপেক্টর, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য সহকারীরা হলেন রোগ-প্রতিরোধের স্বাস্থ্য-কর্মী, যে পদগুলোর জন্ম হয়েছিল বৃটিশ আমলে। অন্যটি হচ্ছে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ‘কিউরেটিভ’ বা রোগীর উপশমের চিকিৎসামূলক ধারা। যে ধারায় কাজের পদ্ধতিতে একদল স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক ও নার্স) স্থাপনার ভেতরে (হাসপাতালে) আক্রান্ত রোগীর আরোগ্যলাভের নিমিত্তে নিরন্তর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করেন। রোগ নির্ণয় ও রোগের বিশ্লেষণ কাজের ধারাটিও আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের জনবল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব বহন করছে।
দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ধরণ সরকারি ও বেসরকারি। জনগণ কোথায় গিয়ে সেবা গ্রহণ করবেন এই সিদ্ধান্ত নিতান্তই ব্যাক্তিগত এবং উন্মোক্ত। এখানের ম্যানেজারদের সাথে নিবির সম্পর্ক রয়েছে বেসরকারিভাবে পরিচালিত চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের লাভভোগী শ্রেণির। স্বাস্থ্যসেবার সরকারী জনবল নিয়োগ, রোগ নিরীক্ষণের আধুনিক মেশিনারিজ ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়াদিতে সুক্ষè-কৌশলে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের লাভের দিকটা বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণহণ করা হয়। ধরুন, সরকারী হাসপাতালে একটা ভালো এক্সরে মেশিন আছে কিন্তু ঐ মেশিন পরিচালনের মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদশূণ্য রাখা হলো কয়েক বছর ধরে। তাহলে সেবাগ্রহীতার অবস্থাটা দাঁড়ালো ‘তুমি সরকারী হাসপাতালে এসে ডাক্তার দেখালেও এক্সরের প্রয়োজনে তোমাকে চিকিৎসা সেবার বাণিজ্যিক প্রতিষ্টানে যেতেই হবে।’ এই অপকৌশলকে আমরা সেবা গ্রহণের স্বেচ্ছার নীতি না চাপিয়ে দেয়া নীতি – কোনটা বলব? সরকারী স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে এরকম একটিা-দুটি নয়, হাজার হাজার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেসরকারি চিকিৎসা বাণিজ্যের লাভের পাল্লা ভারী করার নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে রাস্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার রোগ-নিরাময়ে কম-বেশী ১৬ হাজার চিকিৎসক-নার্স এবং রোগ-প্রতিরোধে ৫৫৬ জন স্যানিটারী ইন্সপেক্টর-সহ ২৭ হাজার প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার কর্মসূচিগুলো গ্রহণ করেন। বিগত সাড়ে ৪ দশক থেকে প্রয়োজন থাকা সত্তেও রোগ-প্রতিরোধের জনবলের প্রয়োজনীয় সংখ্যাবৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন না করে কার্যত: জাতির জনকের দৃষ্টি-ভঙ্গির বিপরীতে চালানো হয়েছে জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। ব্যবস্থাপকেরা দেশের ১ লক্ষ ৩০ হাজার চিকিৎসকের বিপরীতে ১ঃ৩ঃ৫ অনুপাতের স্বাস্থ্য-জনবল তৈরী করতে না-পারার ব্যর্থতাই হলো সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। শুধুমাত্র কিউরেটিভ কর্মের জলবলের দিকে অধিক মনোযোগ রাখায় রাস্ট্রের টাকায় তৈরীকৃত রোগ-প্রতিরোধের দক্ষ ২২০০ স্যানিটারী ইন্সপেক্টরকে কাজে না লাগনোর খারাপ নজির স্থাপনের পেছনেও রয়েছে চিকিৎসা বাণিজ্যের লাভের সূত্র। “চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম” এই কর্মপদ্ধতি পাশকাটিয়ে যাওয়া মানেই চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের বাজার চাঙ্গা রাখার মানসিকতা লালন করা। বিগত দিনে জনগণ দেখেছে, সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের সাবেক ও বর্তমানেরা কে কোন প্রাইভেট চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানের মালিক রয়েছেন। ভারসাম্যহীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এই দুষ্ট-চক্রটাই দায়ী।
কভিড-১৯ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে এক আতংকিত ভাইরাস-দানব! যার আক্রমণ থেকে দুনিয়ার সকল মানুষের সাথে বাংলার জনগণও রক্ষা পেতে চায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থাপকদের পরামর্শে সরকার ইতিমধ্যে জরুরীভাবে ২ হাজার ডাক্তার ও ৬ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছেন। এখন প্রধান কর্তব্য হলো – চিকিৎসা বিজ্ঞানের কর্মপদ্ধতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র পরামর্শ এবং জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি – ২০১১ এর জনবল নিয়োগের নীতিমালা অনুসরন করে রোগ-প্রতিরোধের ১০ হাজার স্বাস্থ্য জনবল নিয়োগদান সম্পন্ন করা। দেশের ভারসাম্যহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা ভারসাম্যপূর্ণ করে নেবার এটাই মোক্ষম সময় ও সুযোগ। বিজ্ঞানীদের ধারণা মতে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রিত হলেও ইহার উপদ্রব থেকে যাবে ২ থেকে ৩ বছর। অন্যান্য ধরণের সংক্রামক-অসংক্রামক রোগের নিত্য উপদ্রবও বর্তমান। রোগ-প্রতিরোধের বেসিক জনবল স্যানিটারী ইন্সপেক্টরদের জন্য নি¤েœাক্ত প্রস্তাবনার নিয়োগদান প্রক্রিয়া জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন টেকসই করবে। প্রতি ৩ ইউনিয়নের বিপরীতে ১ জন, সিটিকর্পোরেশনের প্রতি ৩ ওয়ার্ডের বিপরীতে ১ জন, ক-শ্রেণির পৌরসভায় ২ জন, খ ও গ- শ্রেণির পৌরসভায় ১ জন এবং সরকারের অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন – বঙ্গভবন, গণভবন, সচিবালয়, হাই-কোর্ট, বিএফএসএ হেড অফিস এর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্যানিটারী ইন্সপেক্টর নিয়োগ দিয়ে ব্যবস্থাপকেরা অতীতের সকল কলংক মুছে জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হবার সুযোগ নিতে পারেন।
জনগণের অনুভূতি বড় প্রখর। অনেক কিছু না-দেখেও তাঁরা “আসলে হচ্ছেটা কি” এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুল করেনা। চিকিৎসা সেবা একটি মানবিক মর্যাদাপূর্ণ পেশা। কভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের সেবা দিতে যেয়ে ইউরোপ আমেরিকার স্বাস্থ্যকর্মীরা যেখানে জনগণের দ্বারা পুজিত-পুষ্পিত হচ্ছেন সেখানে আমাদের দেশের চিকিৎসকদের নিয়ে জনগণের নেতিবাচক ধারণা, অশোভন উক্তি এগুলো গোটা সমাজটাকেই লজ্জিত করছে। সব চিকিৎসক ভালো নয় বিষয়টি মোটেই সেরকম নয়, তবে, ব্যবস্থাপক চিকিৎসকেরা যে রোগ-প্রতিরোধের জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নে চরম গাফিলতির স্বাক্ষর রেখে চলেছেন – এই বিষয়টি যত দ্রæত অনুধাবন করবেন ততই দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হবে। (০৯.৫.২০)
লেখক:- স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট, ই-মেইল: mkmchowdhury@gmail.com

ছড়িয়ে দিন