করোনাভাইরাসঃ স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের উপায়

প্রকাশিত: ১২:২৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২০

করোনাভাইরাসঃ স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের উপায়


আনোয়ার ফারুক তালুকদার,

করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি দুটোরই ত্রাহি ত্রাহি দশা। লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন। ভয়ে আর আতংকে মানুষ নিজেদেরকে ঘরের ভিতরে আবদ্ধ করে রেখেছে। কতদিন এই অবস্থাচলবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। কেউ কেউ এরই মধ্যে হাল ছেড়ে দিয়েছে, বলছে এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই, বলছিলাম ইতালির প্রধানমন্ত্রীর কথা। নাগরিকের জীবন বাঁচাতে না পেরে কেউ কেউ ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছেন, যেমন কসোভোর সরকার। করোনা সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে আত্মহত্যা করেছেন জার্মান এক মন্ত্রী। সঙ্কট কোথায় যেয়ে থামবে এটা বলা মুশকিল হয়ে পড়েছে। কত মানুষের জীবন যাবে আর অর্থনীতির কত ক্ষতি হবে তা নিয়ে হরহামেশাই খবর বেরুচ্ছে। সেটা আর ঘন ঘন পরিবর্তন হচ্ছে। তাই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন করোনা সংক্রমণ যে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দা ডেকে এনেছে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই । শুধু তাই নয় ২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার থেকেও এবার পরিস্থিতি আরও গভীর হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। কেউ কেউ বলছেন এটি ১৯৩০ সালের মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির এই হঠাৎ স্থবিরতা উন্নয়নশীল দেশগুলিকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল বাজারগুলির এই মুহূর্তে আড়াই লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। আইএমএফ প্রধান এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন খুব কম করে হিসেব করলেও উন্নয়নশীল দেশগুলিকে মন্দার করাল থাবা থেকে বাঁচাতে এই পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন । উল্লেখ্য, করোনা সংক্রমণের জেরে উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ৮০টির বেশি দেশ এরই মধ্যে আই এম এফ থেকে জরুরি আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ দেশ নিম্ন আয়ের দেশ । বিশ্ব ব্যাংক বলছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংক্ষিপ্ত পূর্বাভাস দেওয়ার কাজটা খুব কঠিন। তবে চলমান পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, ২০২০ সালে উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যাবে। তারা আরও বলছে যে, ২০২০ সালে ৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কমে যাবে এবং তা ২ কোটি ৪০ লাখের মধ্যে তা থমকে যেতে পারে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ পর্যায়ে পৌঁছালে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে এক কোটি ১০ লাখ মানুষের। যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বৈদেশিক বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি চর্চাকারী বৈশ্বিক অর্থনীতি বন্ধ অর্থনীতির বিশ্ব হতে চলেছে। আমদানি রপ্তানি ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হতে চলেছে। এই পরিবর্তন কত দিন চলবে তা একমাত্র বিধাতাই ভালো জানেন । তবে এই অচলাবস্থার মধ্যেই বিভিন্ন দেশ নিশ্চয়ই উত্তরণের কোন না কোন উপায় বের করবে। প্রথমত করোনা ভাইরাসের হাত থেকে জীবন বাঁচানো আর দ্বিতীয়ত সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের হাত থেকে জীবন বাঁচানো। কারণ রোগেভুগে যেমন মৃত্যু হতে পারে তেমনি খাদ্যাভাবেও মানুষের জীবনাবসান হতে পারে। বেঁচে থাকতে হলে মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান আর চিকিৎসার প্রয়োজন। যে সমস্ত দেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ সে সব দেশ নিজেদের মত করে বাঁচার একটি উপায় পেতে পারে। বাংলাদেশের রয়েছে উর্বর মাটি। বার মাস আমরা ফসল ফলাতে পারি। চাল উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। আলুর উৎপাদন এত বেশী হয় যে চাষিরা রাস্তায় ফেলে দিতে বাধ্য হয়। ডিম, দুধ উৎপাদনে আমাদের অবস্থান অনেক শক্ত। পোল্ট্রি এবং গবাদি পশু উৎপাদনে আমরা রীতিমত বিপ্লব করে ফেলেছি। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে আমাদের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। আম, পেয়ারা, কাঁঠালসহ ফলের উৎপাদনে বেশ সফলতা রয়েছে। ‘মাছে –ভাতে বাঙ্গালী’ এর যথার্থতা প্রমাণিত। সর্বোপরি আমাদের দেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রম করতে পারে। তাদের কাছে অজেয় কিছু নাই। মাত্র নয় মাস যুদ্ধ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে আমাদের বীরসেনানীরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। সুতরাং স্বল্প মেয়াদে যদি সমগ্র বিশ্ব থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন থাকতে হয় , তথাপিও আমাদের কোন বড় কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। নিজেদের জন্য খাদ্য উৎপাদন করব। সরকার যদি সর্বাত্মক দেয় তাহলে এই বিপদ কাটানো সম্ভব হবে। অবশ্য ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন । তিনি বলেছেন যেন এক ইঞ্চি জমিও পতিত না থাকে। এই বিষয়টি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড থেকে গ্রামে গ্রামে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। তবে তার আগে আমাদের কিছু কাজ করতে হবে। করোনা ভাইরাস থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে কোনভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না । প্রিয়জনদের আতঙ্কিত হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে হবে; তাদের সাহস যোগাতে হবে এবং অবশ্যই সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য-পরিচ্ছন্নতা বিধি মেনে চলতে হবে; ঘরে থাকতে হবে; প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে যেতে হবে এবং অন্যকে পাঠাতে হবে। আমরা অসম্ভব আশাবাদী মানুষ, করোনা তথা কোভিড-১৯ এর ঊর্ধ্বমুখী রেখা অচিরেই নিম্নগামী হবে এবং দ্রুত এ রোগের রোগ মুক্তির ওষুধ আবিষ্কৃত হয়ে যাবে; মানুষের সংহতি বাড়বে; মানুষ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে এতে কোন সন্দেহ নাই। তারপর এখনই যে কাজটি করতে হবে তা হল দিন আনে দিন খায় এমন মানুষদের চিহ্নিত করে সরকারি বা বেসরকারিভাবে খাদ্য এবং অন্যান্য সাহায্যের ব্যবস্থা করতে হবে। এব্যাপারে দলমতের উর্ধে উঠে সমাজের নিরপেক্ষ ভালো মানুষদের নিয়ে কমিটি গঠন করে খাদ্যের সুষ্ঠ বণ্টনের ব্যবস্থা করা । মনে রাখা প্রয়োজন খাদ্য পর্যাপ্ত থাকলেও সঠিক বণ্টনের কারণে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। দুর্নীতির ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে। অসহায় মানুষের খাদ্য নিয়ে কেউ যেন ফায়দা লুটার চেষ্টা না করে। অবশ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আমলাদের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করে সামনের দিনের করনীয় ঠিক করতে হবে। সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ করোনার প্রথম ধাক্কা অতিক্রম করতে পারবে বলে অর্থনীতিবিদের আশাবাদ।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার, ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

ছড়িয়ে দিন

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031