করোনাভাইরাস কি পারবে আমাদের উপলব্ধিতে পরিবর্তন আনতে? মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার

প্রকাশিত: ১১:৩৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২০

করোনাভাইরাস কি পারবে আমাদের উপলব্ধিতে পরিবর্তন আনতে? মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ‘করোনা ভাইরাস’ তথা (কভিড ১৯) বর্তমান সময়ে এক অপ্রতিরোধ্য ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী মহামারীরূপে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব মিডিয়ার সবটুকু জুড়ে এখন শুধুই করোনার খবর। আজ বিশ্বের কোন কোন দেশে কতজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। কে কে ভ্যাকসিন বানাচ্ছে, কতোদিন পর ভ্যাকসিন বিশ্ববাসীর নাগালে আসতে পারে, লকডাউন কতোদিন চলবে, মোট কতো মানুষ আক্রান্ত হতে পারে, মারা যেতে পারে কতোজন- একটু পর পর আপডেট। বিশ্বব্যাপী ৭০০ কোটি মানুষের চিন্তা-চেতনার পুরোটাই এখন দখল করে আছে করোনা বা (কভিড ১৯) নামক এই প্রাণঘাতী মহামারী। পুরো পৃথিবীর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এই অদেখা ভাইরাস। বিগত হাজার বছরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মহামারী হানা দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। আর তা ছিল দেশ, বড়জোর মহাদেশ-ভিত্তিক। কিন্তু কেন এবার হঠাৎ এই অচেনা অদেখা ভাইরাস পৃথিবীর কোন নির্দিষ্ট দেশ-মহাদেশ বা অঞ্চলকে গ্রাস না করে সমগ্র বিশ্ববাসীর উপর একযোগে আক্রমণ করে বসলো? ইতোপূর্বে এমন অভিনব মহামারী বিশ্ববাসী দেখেছে বা মোকাবেলা করেছে কি না তা আমাদের জানা নেই।
এমন সর্বব্যাপী বিস্তৃত আযাব-গযব হযরত নূহ্ (আ.)-এর মহা প্লাবনের পর বিশ্বের কেউ দেখেছে বা শুনেছে বলেও আমরা জানি না। আর বলতে গেলে এক দিক থেকে ‘করোনা’ নামক এই মহামারী হযরত নূহ্ (আ.)-এর সেই মহা প্লাবনের চাইতেও ব্যাপক ও ভয়ঙ্কর। কেননা, মহা প্লাবনে অন্ততঃ আল্লাহর নবী হযরত নূহ্ (আ.) ও তাঁর কিস্তিতে আরোহনকারীগণ নিশ্চিতরূপে নিরাপদ ছিলেন। পক্ষান্তরে করোনা বা (কভিড ১৯) নামক এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে বিশ্বের কোন একটি দেশ, সমাজ, পরিবার কিংবা ব্যক্তিরও কি নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা আছে? বরং বর্তমান বিশ্বের সর্ব্বোচ্চ নিরাপদ পরিবেশ এবং নিরাপত্তা বলয়ে অবস্থানকারীদের বিরাট এক অংশও আজ এই প্রাণঘাতী ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।
অতএব বিষয়টি সম্পর্কে আমাদেরকে আরো একটু গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। আর ঈমান তথা বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যা দেখতে পাই, তা হচ্ছে- অতীত যুগে মানব জাতির উপর আপতিত এই ধরণের আযাব-গযবের খবর ওহীর মাধ্যমে জানার পর রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রাণপ্রিয় উম্মতকে জন্য এই ধরণের সর্বব্যাপী আযাব-গযব থেকে নিরাপদ থাকার এবং অদূর ভবিষ্যতে নিরাপদ রাখার আবেদন পেশ করার পর আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের নিম্নোক্ত ঘোষণার মাধ্যমে তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই বলে আশ্বস্ত করেন :

“আল্লাহ্ কখনই তাদের (উম্মতে মুহাম্মদীর) উপর আযাব নাযিল করবেন না- যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ্ কখনও তাদের উপর আযাব দিবেন না।” (সূরা আল আনফাল : ৩৩)
অর্থাৎ, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় আল্লাহ্ তা’আলা আপনার উম্মতের উপর আযাব অবতীর্ণ করবেন না। কারণ, সমস্ত নবী-রাসূলগণের ব্যাপারেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নীতি এই যে, তাঁরা যে জনপদে থাকেন তাতে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন আযাব নাযিল করেন না, যতক্ষণ না স্বীয় পয়গাম্বরগণকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।
মোটকথা এ আয়াতের সারমর্ম এই যে, হে মানুষ! তোমরা তো কোরআন ও ইসলামের বিরোধিতার কারণে আযাব-গযবেরই যোগ্য, কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুনিয়ার বুকে অবস্থান এই আযাব আসার পথে অন্তরায় হয়ে আছে। আর আযাব আসার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অন্তরায় হচ্ছে :

“তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ্ ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের উপর আযাব দিবেন না।” (সূরা আল-আনফাল : ৩৩) (সহীহ্ বোখারী : ৪৬৪৮)
অর্থাৎ, আল্লাহ্ তা’আলা তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না, যখন তারা তাওবা-ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে। এর মর্ম এই যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর যদিও ব্যাপক আযাবের পথে যে অন্তরায় ছিল তা দূর হয়ে গেছে, অর্থাৎ, তাঁর দুনিয়ার বুকে বর্তমান থাকা, কিন্তু তারপরেও আযাব আসার পথে আরেকটি বাধা রয়ে গেছে। আর তা হল এই যে, আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে উম্মতের তাওবা-ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা অব্যাহত রাখা।
আর তাই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর হযরত আবু হোরায়রা (রা.)মুসলিম উম্মাহ্কে সম্বোধন করে বলতেন :

“হে উম্মতে মুসলিমা! আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নিম্নোক্ত বাণীর প্রতি মনোনিবেশ কর, যেখানে তিনি ঘোষণা করেছেন : “আল্লাহ্ কখনই তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না যতক্ষণ আপনি (মুহাম্মদ সা.) তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ্ কখনও তাদের উপর আযাব দিবেন না।” (সূরা আল-আনফাল : ৩৩) “আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত আযাব প্রতিহতকারী একটি নেয়ামত তো তোমাদের জীবন থেকে গত হয়ে গেছে, তবে অপরটি (তাওবা-ইস্তেগফার) এখনও অবশিষ্ট রয়েছে।” (মুস্তাদরাক হাকেম : ১৯৮৮)
অর্থাৎ, যে কোন ধরনের আযাব-গযব থেকে এই উম্মতের নিরাপত্তা লাভ করার দুটি নিশ্চিত উপায় স্বয়ং রাব্বুল আলামীন বলে দিয়েছেন-যার একটি হচ্ছে: উম্মতের মাঝে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য অনুসরণ করা অপরটি হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাঃএর মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত সকল বিষয়াবলি মেনে চলা।

ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দো‘আ :
~~~~~~
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন
যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এই দো‘আ পাঠ করবে,দিনে পাঠ করে রাতে মারা গেলে কিংবা রাতে পাঠ করে দিনে মারা গেলে, সে জান্নাতী হবে।
اَللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّىْ لآ إِلهَ إلاَّ أَنْتَ خَلَقْتَنِىْ وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوْذُبِكَ مِنْ شَرِّمَا صَنَعْتُ، أبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَىَّ وَأَبُوْءُ بِذَنْبِىْ فَاغْفِرْلِىْ، فَإِنَّهُ لاَيَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلاَّ أَنْتَ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা আনতা রব্বী লা ইলা-হা ইল্লা আনতা খালাক্বতানী, ওয়া আনা ‘আবদুকা ওয়া আনা ‘আলা ‘আহদিকা ওয়া ওয়া‘দিকা মাসতাত্বা‘তু, আ‘ঊযুবিকা মিন শার্রি মা ছানা‘তু। আবূউ লাকা বিনি‘মাতিকা ‘আলাইয়া ওয়া আবূউ বিযাম্বী ফাগফিরলী ফাইন্নাহূ লা ইয়াগফিরুয্ যুনূবা ইল্লা আনতা।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার পালনকর্তা। তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমার দাস। আমি আমার সাধ্যমত তোমার নিকটে দেওয়া অঙ্গীকারে ও প্রতিশ্রুতিতে দৃঢ় আছি।

আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট হ’তে তোমার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি আমার উপরে তোমার দেওয়া অনুগ্রহকে স্বীকার করছি এবং আমি আমার গোনাহের স্বীকৃতি দিচ্ছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কেননা তুমি ব্যতীত পাপসমূহ ক্ষমা করার কেউ নেই’।

সহীহ বুখারী ৬৩০৬, ৬৩২৩, তিরমিযী ৩৩৯৩, নাসায়ী ৫৫২২, আহমাদ ১৭১১১, মু‘জামুল আওসাত লিত্ব ত্ববারানী ১০১৪, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৭১৭২, শু‘আবূল ঈমান ৬৫৮, ইবনু হিব্বান ৯৩৩, আদাবুল মুফরাদ ৬২০/৪৮৪, আল কালিমুত্ব ত্বইয়্যিব ২১, সহীহ আত্ তারগীব ৬৫০, সহীহ আল জামি‘ ৩৬৭৪, ;!

লেখকঃ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক – জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশক | সদস্য ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ( ডিইউজে )

ছড়িয়ে দিন

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031