করোনার টিকা নিন, সুস্থ থাকুন

প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১

করোনার টিকা নিন, সুস্থ থাকুন

ডা: মোহাম্মদ ইশতিয়াক

করোনা ভাইরাস বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি ঘোষণা করে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে প্রথম ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাস সারাবিশ্বকে উলটপালট করে দিয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যক্তিক্রম নয়। করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এবং মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। জীবন জীবিকার তাগিদে অনেক সময় আমাদের সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভবও হয় না। তাই এ রোগ নিরাময় এবং নির্মূলে স্বাস্থ্যবিধির পাশাপাশি টিকা গ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ লেগেছে। যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে করোনার নতুন ধরন দেখা দিয়েছে। তবে সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশে ২৭ জানুয়ারি থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে কিছু মানুষের মধ্যে অনীহা থাকলেও সময়ের সাথে সাথে এ ধারনার পরিবর্তন হয়েছে এবং মানুষ এখন স্বেচ্ছায় উৎসবমুখর পরিবেশে টিকা গ্রহণ করছে। সরকার যে টিকা এনেছে, তা ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটে তৈরি এবং মূল ফর্মুলা ও উপাদান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের। এ পর্যন্ত আট লাখের বেশি মানুষের টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে, টিকা গ্রহণের পর অল্প কিছু মানুষের সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া সবাই সুস্থ আছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি এ টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। টিকাদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, কোভিশিল্ড নামের যে টিকাটি বাংলাদেশে দেয়া হচ্ছে, অন্যসব ভ্যাকসিনের তুলনায় এ পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে নিরাপদ ভ্যাকসিন। ছোটখাট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমাদের নিত্যব্যবহার্য যে কোনো ওষুধ থেকেই হতে পারে। অল্প সময়ে টিকা তৈরি বিজ্ঞানীদের একটি যুগান্তকারী সাফল্য। টিকা গ্রহণ করে নিজে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। সরকার বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের উচিত নিজে টিকা নেয়া এবং অন্যদের টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করা।

করোনায় মানুষের জীবন রক্ষার্থে বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে কবে টিকা আসবে। এ নিয়ে জল্পনা কল্পনা হয়। অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটেছে। কাঙ্খিত টিকা মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে গেছে। স্বল্প সময়ে ভারতে সাথে চুক্তি এবং টিকা পাওয়ার পুরো কৃতিত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আগামী ছয় মাসের মধ্যে তিন কোটি ডোজ টিকা ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটের কাছ থেকে পাবে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জানুয়ারি ২০ লাখ ডোজ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে পাঠায় বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত। আর ২৫ জানুয়ারি প্রথম চালান হিসেবে ৫০ লাখ ডোজ টিকা বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন দুই লাখ মানুষ এ টিকা গ্রহণ করতে পারবে।

বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে টিকা দেওয়া হয়েছে এবং কোনো জটিলতা বা প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই আতঙ্কিত না হয়ে টিকা গ্রহণ করতে হবে। টিকার দুটি ডোজ নিতে হবে। প্রথম ডোজটি গ্রহণের কিছুদিন পরেই শরীরে কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। তবে প্রথম ডোজটি নেওয়ার পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজটিও অবশ্যই নিতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনে সহায়ক হবে।

সরকার ন্যায্যতা ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী অগ্রাধিকার পাবেন। এছাড়া সম্মুখ সারির সেবাপ্রদানকারী, জরুরি সেবাপ্রদানকরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক, শিক্ষক ও যাদের বয়স আঠারো বছরের ওপরে তাদেরসহ সকল জনগণকে পর্যায়ক্রমে টিকা দেয়া হবে।

নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নির্ধারিত কেন্দ্রে নির্দিষ্ট দিনে টিকা দেয়া হবে। কোভিড-১৯ টিকা পেতে অনলাইন নিবন্ধনের জন্য িি.িংঁৎড়শশযধ.মড়া.নফ লিংকটি ব্যবহার করতে হবে।
দেশব্যাপী সাড়ে ছয় হাজার কেন্দ্রের মাধ্যমে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন দেয়ার কার্যক্রম চলছে। এরমধ্যে চার হাজার আটশত ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, পুলিশ হাসপাতাল, নগর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠিান, সংসদ সচিবালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ সচিবালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র। প্রায় ২১ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী টিকাদান কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের সহায়তার জন্য আছেন আরো ৪১ হাজার ৬ শত জন স্বেচ্ছাসেবক।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন একটি নিরাপদ ভ্যাকসিন। ভ্যাকসিন নেয়ার পরে কারো কারো ক্ষেত্রে অন্যান্য ভ্যাকসিনের মতো মৃদু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের জায়গায় ফুলে যাওয়া, সামান্য জ্বর হওয়া, বমি বমি ভাব, মাথা ও শরীর ব্যাথা ইত্যাদি লক্ষণগুলো দুই-একদিন থাকতে পারে। ভ্যাকসিন নেয়ার পর কেন্দ্রে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে; ভ্যাকসিন নেয়ার পর যে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে নির্ধারিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র/স্বাস্থ্যকর্মী/চিকিৎসকের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। ভ্যাকসিন নেয়ার পরেও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

অনলাইন নিবন্ধনের জন্য রোগীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর থাকবে, যা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ভ্যাকসিন নেয়ার পর গ্রহীতার স্বার্থেই এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাকে ফলো-আপ বা পর্যবেক্ষণ করে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো কিনা, টিকা কত দিন সুরক্ষা দেবে এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাই এতে অযথা আতঙ্কিত হবার কিছু নেই।

যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, গর্ভবতী নারী, যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে, বেশি বয়স্ক মুমূর্ষু রোগী এবং যাদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কম (যেমন ক্যান্সারের রোগী যারা কেমোথেরাপি বা রেডিও থেরাপি নিচ্ছেন) তারা টিকা নিতে পারবেন না। তবে গর্ভবতী নারী যাদের পেশাগত বা অন্য কোনো কারণে সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন, তারা চাইলে টিকা নিতে পারবেন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, টিকা গ্রহণের পর থেকে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর হার কমেছে। কাজেই টিকা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। তবে এটাও সত্য, বিশ্বের কোনো টিকাই করোনা প্রতিরোধে শতভাগ কার্যকরী নয়। তাই টিকা নেওয়ার পরও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে। ভ্যাকসিন গ্রহণকারী নিজে হয়তো করোনায় আক্রান্ত হবেন না, কিন্তু যদি তিনি ভাইরাসটি বহন করেন, তবে তার মাধ্যমে অন্যদের তা ছড়াতে পারে। তাই ভ্যাকসিন নিলেও মনে করার কারণ নেই যে, তার আর করোনা হবে না। ভ্যাকসিন গ্রহণ করলেও গ্রহণকারীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক পরিধান করা, হাত সাবান-পানি দিয়ে বারবার ধোয়া এবং যথাসম্ভব শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা এ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে কোনো সৈথিল্য বা উদাসীনতা প্রদর্শন করা যাবে না।

গত ২৭ জানুয়ারি থেকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। বাংলাদেশে প্রথম করোনার টিকা নেন কুর্মিটোলা হাসপাতালের নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তা। টিকা গ্রহণের পর তিনি জানান, এ টিকা নিলে কোনো সমস্যা নেই এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ। গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশব্যাপী শুরু হয় কোভিড-১৯ টিকাদান কার্যক্রম। জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সরকারের মন্ত্রীবর্গ, সেনাবাহিনী প্রধান, সচিবগণসহ সব পর্যায়ের মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে এ টিকা গ্রহণ করছেন। টিকা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য দেশবাসী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। একটি ভয়াবহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র এই ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিন নিয়ে অনর্থক ভয় বা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন।

করোনা নামক এক অদৃশ্য ভাইরাসের তান্ডবে সারা বিশ্ব বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত। জীবনযাত্রা ও জীবিকায় এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর ভয়ংকর প্রভাবে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি। মানুষের জীবনযাত্রায় ঘটেছে ছন্দপতন। এই অতিমারির প্রভাব মোকাবিলা এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে ভ্যাকসিন আলোর বর্তিকা হয়ে এসেছে। তাই আমাদের নির্ভয়ে দ্বিধাদন্দ্ব ভুলে সবাইকে ভ্যাকসিন নিতে হবে এবং অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তবেই কেবল করোনা আঁধার কেটে যাবে, আবার আলোকিত হবে আমাদের আগামীর দিনগুলো।