করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর ব্যাপারেও সচেতনতা প্রয়োজন

প্রকাশিত: ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২১

করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর ব্যাপারেও সচেতনতা প্রয়োজন

ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী

কিছুদিন পর পর ভ্যারিয়েন্ট পরিবর্তনের মাধ্যমে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে ‘করোনা’। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট যখন দেশে বিপর্যয় ডেকে আনছে, তখনই বর্ষার পুরানো ভাইরাস ডেঙ্গু শুরু করেছে তার চোখরাঙানি। করোনার এই পরিস্থিতি সরকার যেমন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য ভ্যাক্সিনের ব্যবস্থা করেছেন, তেমনি ডেঙ্গু মোকাবেলায় ও মশক নিধনসহ নানাবিধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এখন আমাদের সময় সচেতনতার, না হলে চরম বিপর্যয়ে পড়বে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
ডেঙ্গুজ্বরের জন্য দায়ী ডেঙ্গু ভাইরাস বা ডেঙ্গিভাইরাস। এটি ফ্ল্যাভি ভাইরাস গণের অন্তর্ভুক্ত। এডিস মশা (A. aegypti) ডেঙ্গু ভাইরাসসহ ইয়েলো ফিভার ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক। এই ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ পাওয়া গিয়েছে। যাদের প্রত্যেকেই রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। জীবাণুবাহী এডিস মশা কাউকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ায় তাহলে সেই মশা ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এই জীবাণুবাহী মশাটি যখন অপর কোনো ব্যক্তিকে কামড়ায় তখন তার দেহে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে খুব সহজে একজন থেকে অপরের দেহে এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তিন ধরনের ডেঙ্গু হতে দেখা যায়: ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম।
ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত অল্প দিনেই সুস্থ হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে অসুস্থতা বাড়তে থাকে এবং মৃত্যুও ঘটতে দেখা যায়, যেমনটা হয়েছিলো গত ২০১৯ সালে। চলতি বছর জানুয়ারি হতে এ যাবৎ মোট ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬০ জন। জুলাই থেকে এ পর‌্যন্ত ডেঙ্গুর কারণে প্রাণহানি ঘটেছে ৫৯ জনের (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন অনলাইন)।
সাধারণত ভাইরাস জ্বরের যে লক্ষণ তার সবই ডেঙ্গুজ্বরে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে- সারা শরীরের মাংসপেশিতে বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যথা, জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচ দিনের সময়ে এলার্জি বা ঘামাচির মতো সারা শরীর জুড়ে লালচে দানা দেখা যায়। এ জ্বর কম বা বেশি উভয়ই হতে পারে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। খাবারে অরুচি ও বমি বমি ভাব হয়। সাধারণত জ্বর তিন-চার দিন পর ভালো হয়ে যায়, তবে রক্তের প্লাটিলেট কমতে থাকে। কখনো মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে আবার জ্বর আসে এবং শরীরে র‍্যাশ দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রচণ্ড মাথাব্যাথার সঙ্গে শরীরেও প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয় এবং জ্বর থাকে। কখনো চোখের পিছনে ব্যথা অনুভব করে। যাদের বেশি জ্বর থাকে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে যেমন চামড়ার নিচ, নাক, মুখ, দাঁত ও মাড়ি, চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে, কফ, বমি ও পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হতে পারে আবার রোগীর রক্তনালী থেকে প্লাজমা লিকেজের কারণে বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে। পানিশূন্যতা বেশি হওয়ায় প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে, অনেক সময় লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনি আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে। চিকুনগুনিয়া সাধারণত দ্বিতীয় বার হয় না তবে ডেঙ্গু দ্বিতীয় বার হলে জটিলতা আরো বেড়ে যায় বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
করোনা এবং ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রায় কাছাকাছি ই। COVID-19 সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সৃষ্ট বায়ুকণা (Respiratory Droplets) থেকে ছড়ায়। এছাড়া সংক্রমিত ব্যক্তির জীবাণু হাঁচি-কাশির কারণে বা জীবাণুযুক্ত হাত দিয়ে স্পর্শ করার কারণে পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুর পৃষ্ঠতলে লেগে থাকলে এবং সেই ভাইরাসযুক্ত পৃষ্ঠতল অন্য কেউ হাত দিয়ে স্পর্শ করে নাকে-মুখে-চোখে হাত দিলে করোনাভাইরাস নাক-মুখ-চোখ দিয়ে দেহে প্রবেশ করে। আক্রান্ত হওয়ার ২-১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়; গড়ে ৫ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা যায়। ব্যাধিটির সাধারণ উপসর্গ হিসেবে জ্বর, শুকনো কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে মাংসপেশির ব্যথা, গলায় ব্যথা, সর্দি, পেটের পীড়া দেখা যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো নমনীয় আকারে দেখা যায়, কিন্তু কিছু গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুস প্রদাহ (নিউমোনিয়া) এবং বিভিন্ন অঙ্গের বিকলতাও দেখা যায়।
সাধারণত বর্ষাকালে শহর এলাকায় ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ লক্ষ্য করা যায়। এজন্য বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে করোনা টেস্টের পাশাপাশি ডেঙ্গুর টেস্ট করাও জরুরি, বিশেষত শহরাঞ্চলে। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও সেরকম নির্দেশনা দিয়েছে।
খুবই সাধারণ কিছু নিয়মকানুন যা প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সবসময় সকলের সচেতনতার জন্য সরকার কর্তৃক প্রচারিত হয় এগুলো মেনে চলে আমরা ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারি। আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়াসহ নতুনভাবে এ রোগের জীবাণুবাহী মশার আরো প্রসার না ঘটে সেজন্য সকলকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাসার পাশে, ছাদে, পরিত্যক্ত জিনিসের ভেতর, ফুলের টব, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্রিজ, বাথরুম ইত্যাদি জায়গায় যেন পানি না জমে থাকে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। অন্তত ৩ দিনে ১ বার এসব জায়গা পরিষ্কার করতে হবে। সরকার এবং সিটি কর্পোরেশন এই করোনা মহামারীর মধ্যেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করছেন। এছাড়া জলাশয়, নর্দমা, রাস্তার পাশের গর্ত এগুলোও পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে আমাদের সকলকেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হবে। করোনার জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতা (ঘনঘন সাবান-পানি বা ৬০% এলকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরা, যথাসম্ভব বাসায় থাকা, হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার ইত্যাদি) মেনে চলার পাশাপাশি বাসাবাড়ি এবং উল্লেখিত স্থানসমূহ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এডিস মশা সকালে ও সন্ধ্যায় বেশি কামড়ায়, তাই এ সকল সময়ে বেশি সচেতনতা প্রয়োজন। সর্বোপরি ঢাকা শহরের সকল শিক্ষিত জনসাধারণ আমরা কমবেশি সবাই এ বিষয়ে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই রাজধানীবাসী এ রোগ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবেন। করোনার এই দিনগুলোতে বর্ষাকাল আসার আগেই ডেঙ্গুর বিষয়ে আগাম সতর্কতা না থাকলে তা আমাদের জন্য বিশাল বিপদ ডেকে আনতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এবং সিটি কর্পোরেশন যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন এ পরিস্থিতি মোকাবেলার, কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে উদ্যোগ না থাকলে তা ফলপ্রসূ হবে না। তাই সচেতন হওয়ার এখনই সময়।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

October 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31