করোনায় টিকাদান কর্মসূচি

প্রকাশিত: ৫:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০২০

করোনায় টিকাদান কর্মসূচি

ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে শিশুদের সুস্থতার ব্যাপারে মা-বাবার চিন্তার অন্ত নেই। এক রকম আতঙ্কের মধ্যে যেন রয়েছেন সবাই, যদিও এখন মা-বাবারা অনেকটাই সচেতন হয়েছেন তাদের শিশু-সন্তানদের ব্যাপারে। কিন্তু করোনার সময়কালে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে বা হচ্ছে। কখনো এলাকা লকডাউনের জন্য, কখনো বা নানারকম বাধাবিপত্তির জন্য। তাই পিতা-মাতার মনে একটা ভয় কাজ করছে। কিছুদিন ধরেই আমাদের দেশের মা-বাবারা এ বিষয়টি নিয়ে ডাক্তারদের সাথে আলোচনা করছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম একটি সফল প্রোগ্রাম হচ্ছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই। ইপিআই একটি বিশ্বব্যাপী কর্মসূচি যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সংক্রামক রোগ থেকে শিশুদের অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব রোধ করা। ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচির ঘোষণা ও বাস্তবায়নের পর থেকে দেশে এক বছরের কম বয়সী সকল শিশুদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করতে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচির সফলতা আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত এবং সমাদৃত। সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহের সকলের মাঠ-পর্যায়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই বাংলাদেশে শতকরা ৯০ ভাগের উপরে শিশুকে নিয়মিত টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছিলো, ফলে শিশু মৃত্যুর হার আজ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ টিকাদান কর্মসূচির ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগসমূহ- শিশুদের যক্ষ্মা, পোলিও মাইলাইটিস, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, মা ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি জনিত রোগসমূহ, হাম, রুবেলা, নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া ইত্যাদি এখন অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যক্ষ্মার টিকাদানের ফলে অনেকাংশেই করোনার ঝুঁকিও কম রয়েছে। ইপিআই কর্মসূচি আমাদের দেশের জন্য এক আশীর্বাদ।

করোনার কারণে সাময়িক বন্ধ থাকার পর ফের শুরু হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি। তবে সংক্রমণের ভয়ে শিশুকে নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রে যাচ্ছেন না অনেক মা-বাবা। করোনা আতঙ্কে গ্রামীণ এলাকায় আগের মতো নিজের বাড়িতে টিকাদান ক্যাম্প বসাতে দিচ্ছেন না অনেকে। ফলে কমে গেছে ক্যাম্পের সংখ্যা। অনেক স্থানে করোনায় আক্রান্ত টিকাদানকর্মী, তাদের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব কারণে টিকা কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। অনেক শিশু টিকা কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ছে। বিষয়টি করোনার পাশাপাশি দেশকে নতুন সংকটের মুখে দাঁড় করাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। সারা দেশে গত ১৮ মার্চ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করে সরকার, যা করোনার কারণে স্থগিত হয়। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, করোনার আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যক্ষ্মা প্রতিরোধী বিসিজি টিকার কভারেজ ছিল ৯৪.২০ শতাংশ। এপ্রিলে এসে তা কমে হয় ৫২ শতাংশ। টিকা পায়নি ৪৮ শতাংশ শিশু। নানা কর্মসূচি নেওয়ায় মে মাসে কভারেজ কিছুটা বেড়ে হয় ৬৬.৯০ শতাংশ। তবুও টিকা থেকে বাদ পড়ে ৩১ শতাংশ শিশু। হাম ও রুবেলা প্রতিরোধী এমআর প্রথম ডোজের কভারেজ ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯১.৩০ ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ছিল ৯৬.৭০ শতাংশ। এপ্রিলে এসে তা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫৪.৯০ ও ৬০.২০ শতাংশে। মে মাসে কিছুটা বেড়ে হয় ৬৮.৯০ ও ৭০.৭০ শতাংশ। একইভাবে করোনার এই সময়ে পোলিও, হেপাটাইটিস-বি, ধনুষ্টংকার, নিউমোনিয়াসহ সব রোগের প্রতিষেধক টিকার কভারেজ কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। টিকাদান কভারেজ কমে গেলে নতুন সংকটের মুখে পড়বে দেশ। অনেক কষ্টে আমরা পোলিও দূর করতে পেরেছি। বিশ্বের দুয়েকটা দেশে এখনো পোলিও আছে। কোনোভাবে রোগটি আবার বাংলাদেশে ঢুকে গেলে স্বাস্থ্য খাতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, নিউমোনিয়াসহ অন্য রোগগুলোর প্রাদুর্ভাবও বেড়ে যাবে। যে কোনো মূল্যে বাদ পড়া শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে বিশ্বে রোগ প্রতিরোধের উপরে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কারণ করোনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে রোগ প্রতিকারের চেয়ে রোগ প্রতিরোধই উত্তম। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে শিশুরা সহজে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। টিকা একটি নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। রোগের ভিন্নতায় টিকা ও ভিন্ন ভিন্ন। যে সব রোগের টিকা এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে তার অধিকাংশই শিশুদের জন্য। সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচি শুরু করার আগে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ শিশু ৬টি রোগে মারা যেত। এর মধ্যে এক বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রোগ ও মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এদের তিন ভাগের একভাগ মারা যায় ডায়রিয়া রোগে, এক ভাগ ছয়টি প্রতিরোধ যোগ্য রোগে এবং বাকী এক ভাগ অন্যান্য রোগে। তাই সময়মতো টিকা প্রদান করে শিশুদের মৃত্যু হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য সঠিক সময়সূচি অনুসরণ করে এবং ন্যূনতম বিরতি মেনে টিকা প্রদান করলে অনেক রোগ থেকে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হবে।

করোনা পরিস্থিতিতে অনেক মা-বাবা এখন প্রশ্ন করে থাকেন, কিছুদিন আগেই টিকাদানের তারিখ চলে গিয়েছে কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে দিতে পারেন নি, এতে কোনো সমস্যা হবে কি না”। এক্ষেত্রে কিছুদিন পর দিলেও কোনো সমস্যা নেই। ১ম ডোজ দেওয়ার ৪ সপ্তাহ পর ২য় ডোজ এর অর্থ ন্যূনতম ৪ সপ্তাহ পর এ ডোজটি দিতে হবে, এর পর দেওয়া যাবে কিন্তু আগে নয়। তাই চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু টিকা প্রদান বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দিতে হবে। এলাকাভিত্তিক টিকাদান কেন্দ্র বাড়াতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন করতে প্রচারণা বাড়াতে হবে। অভিভাবকদেরও ভয় পেলে চলবে না, সচেতনতা বজায় রেখে শিশুকে টিকা কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব ও সাবধানতা বজায় রেখে টিকা দিতে হবে। ভ্যাকসিন সেন্টারে সবার বাধ্যতামূলক মাস্ক পরতে হবে। প্রতিটা শিশুকে টিকা দেওয়ার পর টিকাদান কর্মীকে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করতে হবে। টিকাদানে সাফল্যের কারণে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা Ôভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কার পেয়েছেন। এখন করোনার মধ্যে অন্য রোগ ঢুকে গেলে সব সাফল্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। সরকার আমাদের শিশুদের জন্য সবধরণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছেন। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার প্রচারণা করে আমাদেরকে সচেতন করতেও চেষ্টায় ত্রুটি রাখছেন না। আমাদের দায়িত্ব এসব বিষয়ে নিজেদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে সরকারের এ উদ্যোগকে সফল করা, ইপিআই এর সাফল্য ধরে রাখতে সরকারকে সহায়তা করা।

দেশে সরকার আছে সরকার করবে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আছে মানুষের সেবা দিতে, এ দায়িত্ব তাদের এমন ধারণা নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখবো এ কোনো সভ্য সমাজের কথা নয়। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এ নীতিকে বুকে ধারণ করে আমরা এগিয়ে যাব, একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হবো, দেশের জন্য সকলে মিলে কাজ করবো, দেশ এগিয়ে যাবে, আমাদের সুদিন আসবে, আমরাও উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবো এটাই আমাদের কাম্য।

Calendar

January 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

http://jugapath.com