করোনায় বেড়েছে বাল্যবিয়ে : সময় এখন সচেতনতার

প্রকাশিত: ৮:১৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২১

করোনায় বেড়েছে বাল্যবিয়ে : সময় এখন সচেতনতার

মো. আব্দুল আলীম

রাজধানীর শ্যামলীর একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে স্বপ্না আক্তার। করোনার আগে সে নবম শ্রেণিতে পড়ত। ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনার কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে তাকে তার মা গ্রাম থেকে শহরে এনে বাসাবাড়ির কাজে দেন। প্রায় দেড় বছর বাসাবাড়িতে কাজ করে জমানো টাকাতেই স্বাপ্নার বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তার মায়ের। স্বপ্না বলে, অনেক আগেই মা আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু স্কুলের শিক্ষকদের জন্য পারেনি। এখন মা বলেছে আর পড়ালেখা করতে হবে না। এ বছরই আমার বিয়ে দিয়ে দিবে। পাত্র খোঁজা শুরু হয়েছে। স্বপ্নার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার। স্বাপ্নার মামাতো বোন, বান্ধবী অনেকেরই এরই মধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে। করোনার প্রাদুর্ভাব কমে আসায় স্কুল কলেজ খুলতে শুরু করেছে। ক্লাসও শুরু হয়েছে। কিন্তু স্বপ্না স্কুলে যেতে পারছে না। পরিবারের চাপে এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে তাকে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চিত্র মোটামুটি একই রকম, তবে করোনার কারণে বাল্যবিয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে চরাঞ্চলে। নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য ইত্যাদি কারণে চরাঞ্চলে বাল্যবিয়ের প্রবণতা এমনিতেই বেশি। আর করোনাকালে এই হার বহু গুণ বেড়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনেও এটি উঠে এসেছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে বেশি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে বরগুনায়। এখানে বাল্যবিয়ে হয়েছে ১ হাজার ৫১২টি। এরপর কুড়িগ্রামে ১ হাজার ২৭২, নীলফামারীতে ১ হাজার ২২২, লক্ষ্মীপুরে ১ হাজার ৪১ এবং কুষ্টিয়ায় ৮৮৪টি। আর কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার নাজিমখাঁ, চাকিরপাশা, ধরনীবাড়ী ও দুর্গাপুর ইউনিয়নে বাল্যবিয়ের হার বেশি (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক ১৯.০৯.২০২১)।

ইউনিসেফের জরিপে বাল্যবিয়ের হার দেশে বর্তমানে ৫১ শতাংশ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কোঅর্ডিনেটর অর্পিতা দাশ বলেন, করোনার যেসব দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সমাজে থেকে যাবে, তার একটি হচ্ছে বাল্যবিয়ের কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যা, বশিষে করে অপুষ্ট আর অসুস্থ শশিুর জন্ম। বাল্যবিয়ে বন্ধে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে হবে সর্বোচ্চ সমন্বিত প্রচেষ্টায়।

বর্তমানে আমাদের সমাজে যেসব সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে তারমধ্যে বাল্যবিয়ে অন্যতম। দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী- এসব কারণে আমাদের সমাজে মেয়েদের এখনও উপার্জনে অক্ষম এবং পরিবারের জন্য বোঝা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এ রকম আরও অনেক কারণে মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়। করোনাভাইরাসের কারণে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও বন্ধ ছিলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। করোনা ভাইরাসের কারনে সবমিলিয়ে সবাই একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন যাপন করছে। এসব কারণেও বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়ছে। কারণ যাই হোক না কেন, বাল্যবিয়ে কোনো সমাজের জন্য কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না। অল্প বয়সে যে ছেলে বা মেয়েটির বিয়ে হয়, সারা জীবন তাকে নানা রকম সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় এবং অপুষ্টির চক্র চলমান থাকে। এমন পরিস্থিতিতে দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অতিরিক্ত দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বাল্যবিয়ে রোধে সরকারের পাশাপাশি, গণমাধ্যম, সিভিল সোসাইটি, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে। সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব।

বাল্যবিয়ে রোধে শিশু অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে। এই অ্যাপ ১৮ বছর বয়স হয়নি, এমন মেয়েদের বিয়ে বন্ধ করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। গত ছয় মাসে এই অ্যাপ দিয়ে ৩ হাজার ৭৫০টি বাল্যবিয়ে রোধ করা গেছে বলে দাবি করেছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল সংস্থাটি। সংস্থাটি বাল্যবিয়ে রোধে এরই মধ্যে এক লাখের বেশি কন্যা শিশুদের এই অ্যাপ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। নতুন মোবাইল অ্যাপটি বিয়ে নিবন্ধনের সাথে জড়িত ঘটক, কাজী, ধর্মীয় এবং আইনি ব্যক্তিদের ডিজিটাল ডাটাবেজের সহায়তা দেবে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক জানান, বিয়ের প্রক্রিয়ার সাথে প্রাথমিকভাবে জড়িতদের যদি প্রথমেই তথ্য জানানোর ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে কেউই কম বয়সে বিয়েকে আইনিসিদ্ধ বা নিবন্ধনের সাথে যুক্ত হবেন না।এটি একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করছেন, এমন সমাজকর্মীরা বলছেন, বাল্যবিয়ের ফলে বেশিরভাগ মেয়েই স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। এরা ধর্ষণ, নির্যাতন এবং নিপীড়নসহ নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখী হয়। প্ল্যানের চালু করা অ্যাপটিতে অফলাইন মেসেজ করার সুবিধা রয়েছে। এর ফলে ব্যবহারকারীর একটি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর দিলেই, তার ব্যাপারে খোঁজ নেয়া সম্ভব হচ্ছে, তার সংশ্লিষ্ট নথিতে ঢুকে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। যদি সংশ্লিষ্ট নারীর বয়স ১৮ বা তার বেশি হয়, অ্যাপে প্রবেশের সাথে সাথেই ‘প্রসিড’ বা এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আসবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ‘লাল সতর্কতা’ সংকেত উঠবে। অ্যাপটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে সহযোগিতামূলক গুরুদ্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন অনুযায়ী বিয়ের জন্য মেয়েদের ১৮ এবং পুরুষের বয়স ২১ বছর নির্ধারণ করা হলেও বাল্যবিয়েতে বাংলাদেশের অবস্থান তালিকায় শীর্ষের দেশগুলোর সাথেই রয়েছে। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৭ পাশের আগে বাল্যবিয়ে রোধে, ব্রিটিশ সরকার প্রণীত ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেইন্ট অ্যাক্ট-১৯২৯’ ছিলো, যাতে বলা হয়েছিল কোনো নারী ১৮ বছরের আগে এবং কোনো পুরুষ ২১ বছরের আগে যদি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই শাস্তির সময়কাল এবং অর্থদ- বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম ছিলো। ফলে এই আইনটি অনুপযুক্তই হয়ে যায় সরকারের সাথে। বর্তমান বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৭ আরো যুগোপযোগী করা হয়। বর্তমান এ আইনে বয়সের সীমা একই রেখে, শাস্তির সময়কাল এবং অর্থদ-ের পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই বছর এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি শাস্তির আওতায় কারা আসবে, তার পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা বিয়ে পরিচালনা করেন এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু অপ্রাপ্ত বয়স্ক বর, কনে বা তাদের পরিবারই নয়, বাল্যবিয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই আইনভঙ্গের শাস্তি পাবে।

বাংলাদেশে সব ধরনের বিয়ের ৩০ দিনের মধ্যেই আইনগতভাবে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা হয় না। জন্ম নিবন্ধন সনদ, স্কুলের ছাড়পত্র বা জাতীয় পরিচয়পত্র বয়সের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় সন্তানকে বাল্যবিয়ে দিতে পরিবারের সদস্যরা এসবে জালিয়াতির চেষ্টা করেন। নতুন এ আইনের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, বয়স নির্ধারণকারী সনদগুলো ‘নির্দিষ্ট’ করা হয়েছে। ফলে সহজলভ্য নোটারি পাবলিক দিয়ে আর বয়সের জালিয়াতি করার সুযোগ থাকছে না। তাছাড়াও, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কমিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ ধরণের পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বিচারের জন্য মোবাইলকোর্ট যুক্ত করা হয়েছে এ আইনে।

বাল্যবিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও বাল্যবিয়ের সমস্যাটি এখনও রয়ে গেছে। করোনাকালে দশেে বাল্যবয়িে প্রবণতা বড়েে গছেে ব্যাপক হার,ে যদওি বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসর সংক্রমণের প্রভাবে বাল্যবিয়ের হার বেড়ে গেছে বহুদেেশই। বিষয়টি উদ্বেগের। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে প্রশাসন উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু এ সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরো সোচ্চার হতে হবে এ সাথে। সচেতন হতে হবে সকলকে। বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি বিষয়টি চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে, ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান মতে- সংঘাত, দুর্যোগ কিংবা মহামারির সময় বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়ে। এজন্য আমাদের প্রত্যেকেরই সচেতন হতে হবে। বাল্যবিয়ে বন্ধ করার জন্য অভিভাবকদের ব্যাপক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি এবং সবার আগে প্রয়োজন। এছাড়াও প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বাল্যবিয়ে রোধে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের দাবী।

তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং স্কুলের শিক্ষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় করোনাকালেও অনেক বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। বাল্যবিয়ের খবর পাওয়ামাত্র প্রশাসন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সাথে নিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিহত করছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে। আর জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, বাল্যবিয়ে নির্মূল করতে হবে ২০৪১ সালের মধ্যে। তাই বাল্যবিয়ে রোধে সরকার অত্যন্ত সচেষ্ট। নানা পদক্ষেপ গ্রহণসহ সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে সাজা ও জরিমানা বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, এমনকি সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ফলে সুফল পাওয়া যাচ্ছে এ ক্ষেত্রে। বাল্যবিয়ে রোধে প্রাথমিকভাবে মা-বাবাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে গণমাধ্যমও ভূমিকা রাখছে। বাল্যবিয়ে রোধে উপজেলাগুলোতে যে কমিটিগুলো এবং কিশোর-কিশোরী ক্লাব আছে, তা আরো বেশি মাত্রায় সচল করতে পারলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে নির্মূল করে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ গঠন সম্ভব হবে। সে অঙ্গীকার নিয়েই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কাজ করে যেতে হবে আমাদের সবার।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

October 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31