করোনা প্রতিরোধের টিকা কার্যক্রম প্রসঙ্গে

প্রকাশিত: ১:০৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২১

করোনা প্রতিরোধের টিকা কার্যক্রম প্রসঙ্গে

– খছরু চৌধুরী

দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার ওপর লিখতে যেয়ে বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার দু’টি পংক্তি মনে পড়ে গেল। “বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে/দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে ক’ই মুখে/- কাজী নজরুল ইসলাম।” জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগপ্রতিরোধের বিভ্রান্তিমূলক কর্মপদ্ধতি দেখে-দেখে কবি নজরুলের মতো আমারও মনের অবস্থা একই জায়গায় এসে ঠেকেছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নানা অসংগতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, বিভ্রান্তি ও দূর্নীতি এতটাই জেঁকে বসেছে যে, কোনটা লিখবো আর কোনটা লিখবো না – সেটিও যেন নির্বাচন করা মুশকিল হ’য়ে পড়েছে।

যে কোনো রাষ্ট্রীয় কাজের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য তো থাকেই – সেই লক্ষ্যের দিকে কাজটিকে এগিয়ে নিতে হলে কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকদের একটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা সমীচীন। আমাদের দেশের ব্যবস্থাপকেরা সেই মহত ধারণা কতটুকু ধারণ ও লালন করেন – সে আমি ঠিক বুঝতে না পারলেও যেটি বুঝি তা’ হলো উল্লেখিত কাজগুলো যে – আদর্শ, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিগত ঐক্যের ভিত্তিতে হচ্ছে না – সে তো দিবালোকের আলোর মতন স্পষ্ট। আদর্শটা হলো সুনির্দিষ্টভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শ। চিন্তাটা হলো জনগণের সার্বিক জনকল্যাণ সাধনের পথে মানুষের মুক্তি। ঐক্যের ভিত্তিটা হবে সুন্দর কর্মপরিকল্পনা। ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে দেশের জনগণের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কর্মপদ্ধতিতে না আছে মুক্তির আদর্শ, না আছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে গৃহিত কোনো কর্মপন্থা! রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে-বাইরে রয়েছে চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের জয় জয়কার।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজের ধারায় অসুখ-বিসুখ নিয়ে গবেষণা, অসুখের প্রতিরোধ ও চিকিৎসা বিষয়ক আলোচনা-পর্যালোচনায় সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে অসুখের প্রতিরোধ কর্মে। পৃথিবীর এমন অনেক দেশ রয়েছে যারা রোগের প্রতিরোধ কর্মে সফলতার দরুন স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। আমাদের স্বাধীন দেশেও “চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম” নীতির আলোকে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা ও কর্মপরিকল্পনা ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন। কিন্তু ৭৫ সালের মহাট্র্যাজেডির পর বাংলার জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় রোগের প্রতিরোধের কর্মপন্থাকে সুক্ষ্ম-কৌশলে কারচুপি করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। যার ফলস্বরূপ দেশে ভেজাল খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট ২’শতের অধিক রোগের বিস্তার ঘটেছে, সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ-বালাইও বহুগুণ বেড়ে গেছে, ব্যাঙের ছাতার মত রাস্তার আশেপাশে গড়ে ওঠেছে চিকিৎসা সেবার নামে মানহীন চিকিৎসা বাণিজ্যের দোকান। মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সংবিধান জনস্বাস্থ্য বিষয়ক আইন-বিধি ও জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি উপেক্ষা (ক্ষেত্র বিশেষে লঙ্গন করে) চিকিৎসা সেবার নামে চিকিৎসা বাণিজ্যের প্রকাশ্য ও গোপন আশকারায় রয়েছে স্বয়ং রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের অধীনস্ত স্বাস্থ্য- প্রশাসনের আমলাতন্ত্র ও তাদের গৃহিত (অপ)কৌশলের কর্মসূচি।

জনস্বাস্থ্যের রোগপ্রতিরোধী কর্মধারায় বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নিয়োজিত ২৬ হাজার ৫০০ স্বাস্থ্য-জনবল কাজ করেন ডিজিএইচএস এর অধীনে। এদের মধ্যে রোগপ্রতিরোধী কাজে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয়-বিনিয়োগে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য জনবলের নাম স্যানিটারী ইন্সপেক্টর। যাদের মৌলিক কর্মপরিধিতে রয়েছে মহামারি রোগের নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন ও খাদ্যভেজাল প্রতিরোধের মত জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু রাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর বেসরকারি চিকিৎসা বণিকদের একচেটিয়া আধিপত্য থাকায় ১৯৭৩ পরবর্তী সময়ে জনগণের বর্ধিত সংখ্যার অনুপাতে কিংবা জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির আলোকে স্যানিটারী ইন্সপেক্টরের একটি পদও বাড়ানো হয়নি। উপরন্তু এই বৈশ্বিক অতিমারীর সময়েও স্যানিটারী ইন্সপেক্টরশীপ ডিপ্লোমা ডিগ্রির সনদ অর্জনকারী ২৬২০ জন দক্ষ-স্বাস্থ্য জনবলকে সুনির্দিষ্ট করে দায়িত্ব দিয়ে কাজে লাগানো হয়নি। কেন এমন হচ্ছে বা কি কারণে রোগের প্রতিরোধের জনবলকে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জনস্বার্থে কাজে লাগানো হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছে গোলক ধাঁধাঁর মতো হলেও যাঁরা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কর্মকৌশল বুঝেন, চিকিৎসা বাণিজ্যের সূত্র বুঝতে সক্ষম – তাঁদের কাছে খুব সোজা। সহজ সমীকরণটা হলো এই যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে রোগপ্রতিরোধী জনবল ও কার্যক্রম বাড়ালে রোগের বিস্তার হ্রাস পাবে, অনেক ধরনের সংক্রামক-অসংক্রামক ও খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট-রোগ শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। রোগের শূন্যতা মানে চিকিৎসা বাণিজ্যের বাজারে মন্দা। সুতরাং চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য বিষয়ক আইন-কানুন বা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জাতীয় নীতিমালায় যা-ই নির্দেশনা থাকুক অসুখের বিস্তার রোধ করার মতো কার্যকর কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করার মতো এত বড় ভুল করা (?) এই কমিশ লোভী আমলাতন্ত্রের দ্বারা কখনোই সম্ভব নয়।

দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে রোগপ্রতিরোধের স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় ১২০ হাজার টিকাদান কেন্দ্র হতে সপ্তাহে ২ দিন নিয়মিত টিকা গ্রহণ করেন ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলা ও ০১ দিন থেকে ১৮ মাস বয়সের শিশুরা। কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট-ইপিআই। সম্প্রসারিত টিকাদান কার্যক্রমের শুরু থেকে আজ অবধি কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা সংঘটনের খবর পাওয়া যায়নি। হঠাৎ করে কি এমন বিশৃঙ্খলার আশংকা ডিজিএইচএস এর মাথায় চেপে বসলো যে, উল্লেখিত কেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন প্রদানের কাজটি ভোট কেন্দ্রের আদলে সম্পাদন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো? জানি, সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যবস্থাকেরা সহজেই বলে বসবেন যে, সরকারের সক্ষমতার অভাব। একটি বিষয়ে আমাদের স্পষ্টতর জ্ঞান থাকা চাই। অর্থাৎ সরকারের সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপকদের ব্যর্থতা কিন্তু এক জিনিস নয়। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যেটা দেখা যায় তা হলো এই যে, রোগপ্রতিরোধের জনবলের ভীষণ অপর্যাপ্ততা সত্বেও যা আছে – এই স্বল্প পরিমাণের দক্ষ-জনবলেরও সর্বোচ্চ ব্যবহার ব্যবস্থাপকেরা নিশ্চিত করতে পারেননি বা নিশ্চিত করাতে মনোযোগ ছিলো না। তাহলে এই আলোচনা থেকে আমরা কি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনা যে, সরকারের সক্ষমতা আছে কিন্তু কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি অথবা ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি রয়েছে। কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন প্রদানে দীর্ঘ সূত্রিতার নীতির কারণে সরকার বেসরকারি পর্যায়ে ভ্যাকসিন প্রদানের অনুমতি দিবেন এবং আর্থিকভাবে মোটামুটি সক্ষম পরিবারের সবাই জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন থেকেই কিনে টিকা নিতে বাধ্য হবেন। জয় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা বণিকদেরই হবে! তা হোক! রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য প্রশাসনের আমলাতন্ত্র যেখানে সকল ধরনের কৌশল খাটিয়ে চিকিৎসা বাণিজ্যের সহায়ক ভূমিকা পালন করেন – সেখানে জনগণের জয়ের সম্ভাবনা নেই বলেই অনুমিত। কিন্তু সারা দেশে ভোট কেন্দ্রের আদলে ৭৩৪৪ টি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে টিকাদানের এই অভিনব পদ্ধতি নিয়ে আমার একটি প্রশ্ন আছে। সেটি হলো এই, প্রশাসন সতর্ক থাকার প’রেও দেশের ভোট কেন্দ্র গুলোতে ভোট নিয়ে এখও কাড়াকাড়ি, মারামারির সংস্কৃতি আছে, কারো কারো প্রাণও যায়! তবে কি করোনার টিকা নিয়ে এরকম কিছু ঘটবে?

করোনাভাইরাস প্রতিরোধের টিকা নিয়ে ডিজিএইচএস এর সব আশংকা উড়িয়ে দিয়ে শুধু এটুকুই বলবো যে, সমস্ত বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা বাদ দিয়ে রোগ-প্রতিরোধী টিকাদানের জনবলের উপর শতভাগ ভরসা রাখুন। দি ভ্যাকসিনেশ এক্ট-১৮৮০, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি-২০১১ এ প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। এবং মনে রাখুন, বহিঃবিশ্বে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুনাম বাড়িয়ে দিয়েছে এই টিকাদানের স্বাস্থ্য জনবল। স্বাস্থ্য বিভাগের সকল পুরস্কার অর্জনে এদের কাজের অবদান-ই অগ্রগণ্য। আপনারা টিকার পার্শপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা ও টেকনোলজির সাপোর্ট দিন – টিকাদানের স্বাস্থ্য কর্মীরা প্রত্যাশিত কাজ দেবে। ২০ জানুয়ারি- ২০২১ খ্রিস্টাব্দ।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ