করোনা মহামারীঃ জীবন –জীবিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল

প্রকাশিত: ১২:৩৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৫, ২০২১

করোনা মহামারীঃ জীবন –জীবিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল

 

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও ভয়াবহ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে দ্বিতীয় ঢেউ যে কত ভয়াবহ তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি । করোনা সহজে চলে যাবে বা ভ্যকসিন পেলেই করোনা থেকে মুক্ত হয়ে যাব এমন প্রত্যাশা এখনও দুরাশা। তাই করোনাকে সহজ ভাবে না দেখে যে সময় আমাদের হাতে ছিল তার সৎ ব্যবহার করা উচিত ছিল যা করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ফলস্বরুপ অধিক সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে চলছে নিত্যদিন। এই একবছরে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অধিক সংখ্যক করোনা হাসপাতাল গড়ে তোলা উচিত ছিল। করোনা চিকিৎসার যাবতীয় সরঞ্জাম জোগাড় করে রাখা উচিত ছিল। তা না করে বরং করোনাকে আমরা জয় করে ফেলেছি এই জাতীয় বাক্য আওড়াতে আওড়াতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে দেখা গেছে অনেককেই। যাই হোক যা হবার হয়ে গেছে ,পুরনো কিস্তি খেউর টেনে আর লাভ নেই। এখনকার বাস্তবতা থেকে কিভাবে উত্তরন ঘটানো যায় তার একটা উপায় বের করা প্রয়োজন। কারণ আবারও মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকির সম্মুখীন। জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি চিন্তা করা যায় না। তাই জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে সময়োপযোগী,সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক কৌশল নির্ধারণ করাটাই নীতি নির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকের মতে জীবন জীবিকার যেখানে দ্বন্দ্ব, সেখানে জীবিকার প্রয়োজনটাই বড় করে দেখতে হবে।কারণ, দীর্ঘকাল ধরে জীবিকা বন্ধ রাখা যাবে না।তাহলে আবার জীবন সংকটে পড়বে। তবে জীবিকাকে সচল করতে গিয়ে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তা কমাতে আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যবিধি যেমন মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। করোনা পৃথিবী থেকে খুব সহজে যাচ্ছে না, তাই উন্নয়ন চিন্তায় অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে অর্থনীতির সঙ্গে স্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই স্বাস্থ্য-অর্থনীতি যুগপৎ ভাবতে হবে। করোনা হয়তো সহসাই আমাদের ছেড়ে যাবে না, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এ বিশ্বাস এত দিনে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকদের হয়েছে। তাই সারা পৃথিবীর নীতিনির্ধারকরা ব্যস্ত এখন ভারসাম্য রক্ষার খেলার কৌশল নির্ধারণে। জীবন ও জীবিকা ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি ক্রান্তিকালের সব থেকে জটিল ও সংবেদনশীল। এটি খুব পরিষ্কার, চরম পন্থা অবলম্বন করে করোনাযুদ্ধে বিজয়ী হওয়া খুব কঠিন। শুধু জীবন নিয়ে ভেবে জীবন রক্ষা করা যাবে না অথবা শুধু জীবিকা নিয়ে ভেবেও জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না।ভাবতে হবে সমন্বয় করে, ভাবতে হবে যুগপত্ভাবে।কারণ জীবন ও জীবিকা একটি আরেকটির ছায়া, বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না কোনোভাবেই। জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমাদের অবশ্যই অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড নিদেন পক্ষে পাশের দেশ শ্রীলঙ্কা এবং ভিয়েতনামের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। সর্বোপরি জীবন ও জীবিকাকে সচল রাখতে হলে জীবনকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি জীবিকাকেও সুরক্ষা দিতে হবে।করোনা সংক্রমণরোধ এবং মহামারীর পরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয় ঠেকাতে আমাদের স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণ করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে রেশন কার্ড ব্যবস্থা চালু করতে হবে।সর্বোপরি হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে। কৃষি তথা খাদ্য উৎপাদনে এবং মজুদে জোর দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় এক ইঞ্চি জায়গাও যেন পতিত পরে না থাকে। ছাদ কৃষি কার্যক্রমে ব্যাপক জোর দিতে হবে। তবে কঠোর লকডাউন অবস্থায় জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে বেশ কিছু সুপারিশ করা যেতে পারে যা স্বল্পমেয়াদে আমাদের এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সহায়তা করতে পারে। করোনা কালে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছে কাজ হারানো মানুষ, খেটে খাওয়া দিনমজুর, দোকান কর্মচারী, ক্ষুদ্র, মাঝারী শিল্পের সাথে জড়িত মালিক-শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, পাঠাও চালক, ভিখারি ইত্যাদি অতি দরিদ্র এবং দরিদ্র মানুষগুলো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিম্ন বিত্তের মানুষজনও আছে, যারা চাপা কস্টের মধ্যে দিন পার করছেন। কাজ না থাকার তাদের উপার্জন নেই। আর উপার্জন না থাকার ক্রয় ক্ষমতা শুন্যের কোটায়। ফলে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য সামগ্রী মজুদ থাকা সত্ত্বেও তারা খাদ্য সামগ্রীসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করতে পারছে না। দুটি বিষয় এখানে ভেবে দেখা যেতে পারে একঃ দেশে পর্যাপ্ত মজুদ আছে, দুইঃ সরকারের হাতে টাকা মজুদ আছে । টাকা আছে কিন্তু সার্কুলেশনে যেতে পারছে না । এই টাকা অচল হয়ে পরে আছে। অচল টাকাকে কিভাবে সচল করা যায় তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। মানুষের কাছে টাকা কিভাবে পৌঁছানো যায় সেই ব্যবস্থার কথা ভাবা যায়। মানুষকে অনুদান দিয়ে, ঋণ দিয়ে তাদের কাছে টাকা পৌঁছানোর কথা ভাবা যায় । ধরুন আগে যিনি যে পেশায় কাজ করতেন এবং যে পরিমাণ আয় করতেন সেই পরিমাণ টাকা তাকে অনুদান (বা কর্জে হাসানা, যখন উনি সক্ষমতা অর্জন করবেন তখন পরিশোধ করবেন) বা ঋণ হিসাবে দেয়া যেতে পারে। সেটি তিন মাস বা ছয় মাসের জন্য হতে পারে। এই পন্থা অবলম্বন করে ‘কঠোর লকডাউন’ সহজে কার্যকর করা যায়। আর ‘কঠোর লকডাউন’ পনের বা একমাস কার্যকর করা গেলে আশা করা যায় করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। আমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব। প্রথমত সারা দেশব্যাপী এটি করা না গেলে এডহক ভাবে করা যায়। তবে এক্ষেত্রে শতভাগ সততার সাথে কাজটি করতে হবে। পরীক্ষিত সৎ মানুষদের দিয়ে এই কাজ করাতে হবে তবেই এর সফলতা আশা কর

 

আনোয়ার ফারুক তালুকদার :ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক