কলকাতার এক অন্য যিশুর কথা অাজ মনেপড়ে

প্রকাশিত: ৪:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮

কলকাতার এক অন্য যিশুর কথা অাজ মনেপড়ে

বীথি চট্টোপাধ্যায়

বড়োদিনের সকাল থেকে মনটা রোদুর হয়ে গিয়েছে। কলকাতার এক অন্য যিশুর কথা অাজ মনেপড়ে গেল অমলকান্তির কথা ভাবতে ভাবতে।

একদিন বিকেলে পুরোনো নিউমার্কেটের ভিতর ঘুরছিলাম। বেশ কয়েক বছর পর নিউমার্কেটে গিয়েছিলাম সেবার। কলকাতায় ইতিমধ্যে বহু শপিং মল তৈরি হয়েছে। সাউথ সিটি মল, কোয়েস্ট মল, অ্যাক্রোপলিশ মল অারও কত কী। এইসব মলে যা যা পাওয়া যায় নিউমার্কেটে সেই সবই প্রায় পাওয়া যায়, অাবার নতুন নতুন মলে যা কিছু পাওয়া যায়না তাও পাওয়া যায় নিউমার্কেটে। দশটাকার জিনিস পাওয়া যায়, দশলক্ষ টাকার জিনিস পাওয়া যায়। এইসব ভাবতে ভাবতে নিউমার্কেটে ঘুরছিলাম। সস্তায় শ্বেতপাথরের টেবিল, শোপিস এসব পাওয়া যেত এখানকার একটা দোকানে সেই দোকানটা খুঁজছিলাম। মনেমনে ভাবছিলাম দোকানটা গেল কোথায়? অামি তো দোকানটা স্পষ্ট চিনি। নাহুমস বলে এখানে যে বিখ্যাত কেকের দোকান তার বিপরীতেই তো ছিল সেই দোকান। বছর খানেক এদিকে অাসা হয়নি তারমধ্যে দোকানটা উঠে গেল নাকি?

নাহুমসের সামনে দাঁড়িয়ে এধার ওধার দেখছি। পা-দুখানি ভারি ভারি লাগছে, ক্লান্ত লাগছে৷
এমন সমশ অামার পেছন থেকে বেরিয়ে এলেন রহিমচাচা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, মাথায় টুপি, ছোটখাটো চেহারা। বেশ অবাক হলাম। প্রায় কুড়ি বছর রহিম চাচাকে দেখিনি। অামি ভেবেছিলাম উনি বুঝি অার নেই৷ উনি নিউমার্কেটে কুলি ছিলেন প্রথমে তারপর ধীরে ধীরে নিউমার্কেটের অনেককিছু উনি শাসন করতে শুরু করেন। হকারের থেকে কমিশন, জিনিসের বিক্রি থেকে বখরা, কোন ভিখিরি কোথায় বসবেন এসব ঠিক করবার বিষয়ে ওঁর অধিকার জন্মায়৷ মার্কেটের অনেকগুলি দোকানের মালিক হয়ে যান রহিম মিঞা।

বহুযুগ অাগে তখন অামি কলেজে পড়ি, নিউমার্কেটের অানাচে কানাচে রহিম মিঞার দাপট দেখেছি। সাধারণ খদ্দেরদের সবসময় সাহায্য করতেন রহিম মিঞা অার তাঁর লোকজন। অামি যখন কলেজের গন্ডি পেরোইনি তখন থেকে রহিম মিঞাকে চিনি। উনিও অামার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন যেন অামি ওঁর খুব অাপনজন।
কলেজের ছাত্রদের হাতে তখন পয়সা থাকতনা একেবারে। পুজোর বাজার করতে বা বড়দিনে নিউমার্কেটে বেড়াতে এলে প্রায়ই রহিম মিঞা বলে দিতেন, কোথায় পাব শাড়ির পাড়, জামায় বসানোর লেস। নিজের লোক দিয়ে দোকান চিনিয়ে দিয়ে অাসতেন। তখন তো তাঁর লোকজনের হাতে সেভাবে বকশিস দিতে পারতামনা। কিন্তু রহিমচাচা প্রতিবারই সাহায্য করতেন। বিশাল অাকারের চারটি কুকুর ছিল তাঁর। তার রহিম চাচার দুপাশে সার বেঁধে শুয়ে থাকত। একটা বেড়াল থাকত রহিমচাচার কোলে। তার নাম নূরী। যখন রহিমচাচার সঙ্গে অামার একটা পাকাপাকি স্নেহ ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। তখন নূরীকে কত কোলে নিয়েছি। নূরী ছিল যেন ঠিক রহিমচাচার মেয়ে। তারমানে সে অামার বোন হোত সম্পর্কে। তবে নূরী বোধহয় অাগন্তুকদের এত অাদিখ্যেতা পছন্দ করতনা। কোলে নিলে ছটফট করে নেমে যেত, ঢুকে যেত টেবিলের তলায়। কিছু কিছু ব্যক্তিগত কথা হোত রহমচাচার সঙ্গে। বছরের পর বছর ধরে বলা টুকরো টুকরো কথা সেসব।
জেনেছিলাম ছেচল্লিশের দাঙ্গায় রহিমচাচার পুরো পরিবারটি ধ্বংস হয়। রহিমচাচার বয়স তখন অাট বছর। ‘অাল্লাহর মর্জি’তে তিনি বেঁচে যান। মসজিদের সামনে বসে ভিক্ষে করতেন ছোটবেলায়। তারপর কুলি, তারপর রীতিমতো মস্তান হয়ে ওঠেন। তার মানে নাকি মানুষ খুনের মামলাও হয়েছিল — প্রমাণ করা যায়নি। রহিমচাচা মাথা নেড়ে নেড়ে এসব বলতেন। নিউমার্কেটে অামার তেষ্টা পেলে, দোকানে দোকানে ঘুরে পা ব্যথা করলে রহিমচাচার দোকানে বসে বিশ্রাম নিতাম। তারপর একদিন দেখলাম রহিমচাচার কোল শূন্য। সেখানে নূরী নেই। নূরী না-ফেরবার দেশে চলে গেছে।

শূন্য কোলে রহিমচাচাকে কী উদাস দেখাচ্ছিল। নূরী যেভাবে অদৃশ্য হয়েগিয়েছিল সেভাবে অাস্তে অাস্তে অদৃশ্য হয়ে গেলেন রহিম চাচার দোকানের বুড়ো কর্মচারী, সময়ের নিয়মে উবে গেল ওঁর কুকুর। চারপাশের কত দোকান বদলে গেল। হয়তো ছিল কাপড়ের দোকান হয়ে গেল বাসনের। রহিমচাচার বয়স বেড়ে চলল৷ নতুন মস্তান উঠে এলো মহল্লায়। রহিমচাচা পুরো দস্তুর দোকানদার হয়ে গেলেন। অামিও বাউন্ডুলে ছাত্র থেকে হলাম হিসেবি নাগরিক। কিন্তু অামাদের পুরোনো সম্পর্ক বজায় ছিল।

এরপর একদিন নিউমার্কেটে গিয়ে অার রহিমচাচাকে দেখলামনা। তাঁর কাপড়ের দোকানের ওই চেয়ারটি দেখলাম শূন্য। তারপর একদিন দেখলাম তার কাপড়ের দোকানে অন্য এক মাড়োয়াড়ি ভদ্রলোক। তিনি খুব ভক্তিভরে মা লক্ষ্মী অার গণেশের ছবিতে মালা পরাচ্ছেন। বছর দুই পরে সেই মাড়োয়াড়ি ভদ্রলোকটিকেও অার দেখা গেলনা। ওই কাপড়ের দোকানে গড়ে উঠল একটি ছোট বিউটিপার্লার৷ এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলাকে সেখানে বসে থাকতে দেখলাম একবার।

ক্রমে কেটে গিয়েছে প্রায় কুড়ি বছর। অামার নিজের নিউমার্কেটে যাওয়া এখন প্রায় হয়েই ওঠেনা। হঠাৎ কিছুদিন অাগে অামার বাড়ির একটা খুব পুরোনো শ্বেতপাথরের টেবিল ভেঙে গেল। ওইরকম অার একটা টেবিল কোথাও পাইনা। অাবার অনেকদিন পর গেলাম নিউমার্কেটে। কিন্তু শ্বেতপাথরের জিনিস বিক্রি হোত যে দোকানে সেটা খুঁজে পাচ্ছিলামনা। হাঁপিয়ে উঠছিলাম।

সেই অাকস্মিক সামনে এসে পড়লেন রহিম চাচা! এতদিন পরে! চেহারা তো বিশেষ কিছুই বদলায়নি! অামাকে বললেন ” অার অাসেননাতো এদিকে? অামাদের ভুলে গিয়েছেন?”
অামি কিছুটা বিহ্বল হয়ে বললাম, ” এদিকে অাসা হয়না এখন খুব একটা কিন্তু অাপনাদের কি ভুলতে পারি রহিমচাচা? অামি তো অাপনাকে খুঁজেছিলাম। অাপনি কোথায় ছিলেন এতদিন? “

রহিমচাচা হাসলেন, “রিস্তেদারের কাছে। ” বলে অামাকে হাত নেড়ে ডেকে নিজে হাঁটতে শুরু করলেন। এই ভঙ্গি অামি খুব চিনি। রহিমচাচা এবার অামাকে দোকানটা চিনিয়ে দেবেন। অামি হাঁটলাম ওঁর পেছন পেছন৷ নিউমার্কেটের পিছনে একটা দোকান দেখিয়ে দিলেন অাঙুল তুলে সেটা শ্বেতপাথরের অাসবাবের দোকান৷ এই দোকানটা অাম চিনতামনা। যে দোকানটা চিনতাম তারমানে সেটা অার নেই৷ দোকানে ঢুকবার অাগে রহিমচাচাকে বললাম, “অাসুন অাপনিও।” উনি বললেন, ” অাপনি যান, কিনুন জিনিস। অামি এখানেই অাছি। এখানেই থাকব।”

পছন্দমতো টেবিল কেনা হোল। দোকান থেকে ওরা টেবিল বাড়িতে দিয়ে যাবে টেম্পো করে সেই ব্যবস্থা করলাম। দোকান থেকে বেরিয়ে রহিমচাচাকে খুঁজছি ওঁর কাছে বিদায় নেব বলে, কথা বলব বলে৷ কিন্তু কোথায় গেলেন রহিমচাচা। অামাকে যে বললেন, ‘ এখানেই অাছি, এখানেই থাকব৷ ‘ এতদিন পরে উনি কোথা থেকে এলেন? কুড়ি বছর পার হয়ে যাবার কোনও ছাপ নেই কেন ওঁর চেহারায়? অামার বয়স বেড়েছে কিন্তু রহিমচাচার বয়স বাড়েনি কেন? অামি যে শ্বেতপাথরের টেবিল খুঁজছি তা উনি জানলেন কীভাবে? অদ্ভুত! অামি দোকানটা চিনতাম বলে অাশেপাশে কাউকে তো জিজ্ঞাসাও করিনি কিছু। রহিমচাচা বুঝি এখন না বলা কথা বুঝতে পারেন?

পুরোনো নিউমার্কেটের ওপর অন্ধকার নেমে অাসছে। জায়গাটা ফাঁকা। চারপাশের পুরাতন শ্যাওলা ধরা দেওয়ালগুলো গম্ভীর। ফিরব বলে পা বাড়ালাম৷ এখানেই কোনও পুরোনো পুরোনো দেওয়ালের পাশে হয়তো রহিমচাচা দাঁড়িয়ে অাছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

লাইভ রেডিও

Calendar

April 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930