কুয়ো

প্রকাশিত: ১:০০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২১

কুয়ো

 

শেলী সেনগুপ্তা

– সুমুন্ধির পুত, কি বিয়া করছস, বাড়িত কুয়া থাইকতে বউ সিকি মাইল পথ হাইটা মেম্বর বাড়িত যায় পানি আইনতে।

– কি কও আব্বা? আমগো কুয়ার পানি কি অইছে?

– পুঙ্গির পুত, জিগা তর বউরে কুয়ার পানিত কি অইছে?

– আইচ্ছা আইচ্ছা, মাতা গরম কইর না আব্বা, আমি দেকতাছি।

– গোলামের পুত, মাতা গরম করমু না, জমিদারের মাইয়া বিয়া কইরা আনছস……

গজ গজ করতে করতে করম আলি ক্ষেতের দিকে চলে গেলো।

ইউসুফ মিয়া মাত্র ঢাকা থেকে ফিরেছে। বাড়িতে ঢোকার আগেই কুয়াপাড়ে বাবার সাথে দেখা। ওকে দেখেই করম আলি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। এক একটা চিৎকারে ভূমিকম্প হওয়ার হাল। ইউসুফ মিয়া চুপাচাপ শুনলো। করম আলি তীব্র ঝড় বইয়ে দিয়ে বের হয়ে গেলো।

ঝড়ের ঝাপটা সামলে ইউসুফ আলি বাড়ির ভেতরে গেলো।

নতুন বউ মেমি মাথা নিচু করে রান্নাঘরের দরজাতে দাঁড়িয়ে আছে। ইউসুফ মিয়াকে দেখে এগিয়ে এলো। হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলো। নতুন বউ এর মুখটা শুকনো দেখে ইউসুফ আলির মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না। গামছা নিয়ে কুয়োতলায় চলে গেলো হাতমুখ ধোয়ার জন্য।

 

ইউসুফ মিয়া ঢাকায় চাকরি করে, মাসে একবার বাড়ি আসে। একমাস আগে মেমিকে বিয়ে করেছে। বিয়ের সময় মেমি স্কুলে পড়তো। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে ওকে দেখে ইউসুফ মিয়ার পছন্দ হয়ে যায়। বাবাকে রাজি করেই বিয়ে করে নিয়ে আসে। অন্য গ্রামের মেয়েকে বউ করে আনতে করম আলি প্রথমে রাজি হয় নি। ইউসুফ মিয়া অনেক বুঝিয়ে রাজি করেছে। তখনই করম আলি শর্ত দিয়েছে বউকে বাড়িতেই রাখতে হবে,কখনো ঢাকায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাতেই রাজি হয়ে ইউসুফ মিয়া মেমিকে বিয়ে করে এনেছে। নতুন ভাবী পেয়ে ইউসুফ মিয়ার বোন রাহেলা আর ভাই জব্বার খুব খুশি। দু’জনেই স্কুলে পড়ে। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া ভাবীর আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়।

বিয়ের সাতদিন পর ইউসুফ মিয়া কাজে যোগ দিতে চলে গেলো। আসলে ও ছুটি নিয়েছিলো অনেক আগে থেকে। বিয়ে বাড়ির সবকাজ ওকে এক হাতেই করতে হয়েছে। তাই বিয়ের আগেই বেশি সময় চলে গেছে। বিয়ে পর মেমির হাতের মেহেদির সুবাস নিতে না নিতেই ওর ঢাকা ফেরার সময় হয়ে এলো। নতুন বউকে অনেক আদর করে সংসারের সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে ভারাক্রান্ত মনে ইউসুফ মিয়া ঢাকা চলে গেলো।

 

মাঝখানে আর দু’মাস কাটিয়ে আবার এসেছে। এতোদিন খুব কষ্টে কাটিয়েছে, চোখের সামনে শুধু মেমির শান্ত মুখটা ভেসে উঠতো। চাইলেও ওর সাথে কথা বলতে পারতো না। এবাড়িতে একটাই মোবাইল তাও বাবার কাছে। ইউসুফ মিয়া জানে চাইলেও মেমিকে ডেকে দেবে না। তাও একবার চেষ্টা করেছিলো। বাবাকে বলেছিলো,

– আব্বা, জব্বার রে দিবা, একটু কথা কমু।

ভেবেছিলো জব্বারকে বলবে মেমির সাথে কথা বলিয়ে দিতে।

কিন্তু করম আলি ফোন রিসিভ করেই বললো,

– কি কথা জব্বারের লগে,অহন কওন লাগবো না, আমারে ক।

– ঠিগ আছে আব্বা, লাগবো না। তুমি বালা আছো আব্বা?

– হ, বালা আছি, আর কিছু কবি?

– না, বাড়ির সক্কলে বালা আছে?

– বালা আছে, ফোন রাখ, ট্যাহা নষ্ট……

বলেই বেশ বিরক্তির সাথে ফোনটা কেটে দিলো।

সেই থেকে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করে নি।

 

দু’মাস পরে ছুটির দিনের সাথে আরো দু’দিন ছুটি নিয়ে বাড়ি এলো। আসার সময় সারা রাস্তায় শুধু মেমির মুখটা চোখে ভাসছিলো। আসার সময় ওর জন্য একডজন সবুজ চুড়ি আর একটা এক পাতা টিপ এনেছে।

 

ইউসুফ মিয়া হাত মুখ ধুয়ে আসতেই মেমি খেতে দিলো। পাটশাক রান্না করেছে কুচো চিংড়ি দিয়ে আর বেগুন ভর্তা। বেশ ভালো করেই খেলো। খাওয়া শেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মেমি একটা পান বানিয়ে নিয়ে এলো। ইউসুফ মিয়ার হাতে দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

ইউসুফ মিয়া বললো,

– কাছে আইও বউ, দূরে খাড়ায় আছো ক্যান?

কিছু না বলে মেমি পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো। ইউসুফ মিয়া ওকে হাত ধরে কাছে বসিয়ে বললো,

– কেমুন আছ?

– বালা ই।

– হাঁচাই বালা আছিলা আমারে ছাইড়া?

এবার লজ্জা পেয়ে মেমি আঁচলে মুখ লুকালো। ইউসুফ মিয়া হেসে ফেললো। মেমির ফর্সা হাত দু’টো নিজের কোলের মধ্যে নিয়ে চুড়িগুলো পরিয়ে দিলো। মেমি হেসে হেসে দু’হাত নেড়ে চুড়িগুলো বাজিয়ে দেখছে।

দেখতে দেখতে ইউসুফ মিয়ার যাওয়ার সময় হয়ে এলো। দু’টো দিন কিভাবে চলে গেলো বুঝতেই পারে নি। শুধু মনে হচ্ছে মেমিকে ঠিক দেখা হলো না, বোঝা হলো না, ওর সুবাস নেয়ার আগেই যেন প্রভাত হয়ে গেলো। যাওয়ার সময় হতেই করম আলি আরেক বার চেঁচামেচি করলো। বলে দিলো মেমিকে কুয়োর পানিই ব্যবহার করতে হবে, সে কোনভাবেই টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে যেতে পারবে না।

ইউসুফ মিয়া মেমির নতমুখের দিকে তাকিয়ে কিছুই বললো না, ব্যাগ কাঁধে চুপচাপ বের হয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় মেমি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর ইউসুফ মিয়া যেতে যেতে ফিরে ফিরে দেখছে।

মেমিকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে, কেমন অসহায়ভাবে দরজার চৌকাটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইউসুফ মিয়ার বুকটা ভারি হয়ে গেলো। আবার আসতে আসতে দু’মাস, এতোদিন মেমির কান্নাভেজা মুখটা বুকের খাঁচায় ধরে রাখতে হবে।

 

বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে একমাস হয়ে গেলো। ঢাকায় আর মন বসছে না। অথচ আরো একমাস না গেলে ছুটিও পাবে না। বাড়ি থেকে আসার পর থেকে একবারও কথা হলো না মেমির সাথে। বাবার সাথে কথা হলেই চেঁচামেচি করে, তার যত অভিযোগ মেমির বিরুদ্ধে।

আগামী মাসে ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতে হবে। তখন সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। করম আলি মেমিকে পছন্দ করে না। বিয়ের পরেও খুব একটা মেনেও নিতে পারছে না। সারাক্ষণ নানা অভিযোগ চলছে ওর বিরুদ্ধে।

 

নানা চিন্তাভাবনায় ব্যাকুল ইউসুফ মিয়ার রাতে ঘুম খুব কমই হচ্ছে। সকালে উঠে নিজের হাতে রান্নাবান্না করে খেয়ে খাবার নিয়ে অফিসে যেতে হয়। ফিরে এসে আবার নিজেকেই রান্না করে খেতে হয়। বেতনের বেশিরভাগ টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে খুব কম টাকাতে নিজের খরচ চালাতে হয়।

রাতের খাওয়া দাওয়া করে সবে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে, তখনই বাবার ফোন এলো,

– হোনো, কাইলই তুমি বাড়িত আইবা, তুমার হউররেও ডাকছি, এক খান ব্যবস্থা করন লাগবো।

– কি অইছে আব্বা?

– কি অয় নাই, তুই আইলেই বুঝবি, হোন এই বউ কিন্তুক রাহন যাইবো না, তুই আইলেই কাটি দিমু।

– এইডা কি কথা আব্বা?

– কথা এইডাই, আর কুনু কথা অইবো না, যেইডা কইছি হেইডাই।

– আব্বা মেমি কি করছে?

– কি করছে? হেইডা আইসাই হোন, তয় কইলাম, এই বউ রাহা যাইবো না।

 

ইউসুফ মিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। মেমিকে ছাড়া জীবন ভাবতেও পারে না। স্বল্পবাক মেয়েটা গভীর মায়ায় জড়িয়ে নিয়েছে ওকে। সারারাত ঘুম হলো না। ভোর হতে না হতেই ইউসুফ মিয়া বের হয়ে গেলো। যেভাবেই হোক আজ বাড়ি যেতে হবে। বাবাকে বুঝিয়ে বলতে হবে। তার আগে মেমির সাথে কথা বলতে হবে। জানতে হবে কি হচ্ছে?

রাস্তার ভিড় দেখতে দেখতে যাচ্ছে। রাস্তা যেন শেষই হচ্ছে না। আজ এত গাড়ি এলো কোথা থেকে বুঝতে পারছে না। যেখানেই থামছে অনেকক্ষণ থেমে থাকছে। আর কোথাও বাস থামলে ইউসুফ মিয়া রেগে ওঠে। এ নিয়ে কয়েকবার বাসের হেলপারের সাথে কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। শেষে ড্রাইভারও হস্তক্ষেপ করলো। রেগেমেগে বললো

– হোনেন মিয়া, এইডা বাস, প্লেন না, বেশি ত্বরা থাইকলে নাইমা হাঁইটা যান।

– একডু ত্বরা কইরা চালান বাই।

– রাস্তা কি আমার বাফের? দেহেন না জ্যাম পইরা রইছে।

ইউসুফ মিয়া আর কিছুই বলতে পারলো না, অস্থির হয়ে ঘড়ি দেখছে আর ক্ষণ গুনছে। দুপুর নাগাদ বাজারে পৌঁছ্বে গেলো। বাজার থেকে বাড়ি বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে। অন্য সময় সে হেঁটেই চলে যায়। আজ এদিক ওদিক তাকিয়ে রিক্সা খুঁজছে। অন্যদিন বেশ কয়েকটা রিক্সা থাকে, কিন্তু আজ কিছুই নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখলো একটাও খালি রিক্সা আসছে না।

হেঁটেই বাড়ি যাওয়া স্থির করলো। দ্রুত হাঁটতে গিয়ে বেশ ঘেমে গেলো। ঘামতে ঘামতেই বাড়ি পৌঁছে গেলো। অনেকদুর থেকে বাড়ির উঠোন দেখা যাচ্ছে। উঠোন ভর্তি লোক। ইউসুফ মিয়া দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করছে। ও যত দ্রুত হাঁটে ততই যেন পিছিয়ে যাচ্ছে।

অবশেষে একরাশ কষ্টের বোঝা নিয়ে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় দাঁড়ালো। বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছে মেমি। ওর মধ্যে জীবনের কোন স্পন্দন নেই যেন। ইউসুফ মিয়া যে এসেছে তা দেখেই নি। মাথায় ঘোমটা একপাশ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর দু’পাশে বসে আছে ইউসুফ মিয়ার দুই ভাইবোন। ওদের চোখে জল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক কেঁদেছে তারা।

ইউসুফ মিয়াকে দেখেই দু’জন ছুটে এলো। ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। করম আলি ধমকে উঠলো,

– যা কইলাম এহান তন, নইলে পান্টি দিয়া মাইরা মাতা ফাডাইয়া ফালামু।

ওরা ভয় পেয়ে আবার মেমির কাছে চলে গেলো। ওর শাড়ির খুঁট ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নতুন করে কাঁদতে শুরু করলো।

করম আলি গর্জেই যাচ্ছে। ওদের ঊঠোনে জড়ো হয়েছে মাতবর শ্রেণির কিছু লোক। একটু দূরে বসে আছে, তাহের মোল্লা। ইউসুফ মিয়ার চোখে চোখ পড়তে তাহের মোল্লা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। বোঝা গেলো তাহের মোল্লাই পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে এ ঝামেলা পাকিয়েছে। তাহের মোল্লা মেমিকে ওর তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী করে নিতে চেয়েছিলো, ঠিক তখনই ইউসুফ মিয়ার প্রস্তাব পেয়ে ওর বাবা এখানেই বিয়ে দিয়েছে। তাহের মোল্লা তখন প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়েছিলো। করম আলিকে নানাভাবে বুঝিয়ে বিয়ে আটকানোর চেষ্টা করেছিলো। ইউসুফ মিয়ার বেশি আগ্রহের জন্য তাহের মোল্লার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তখন থেকে করম আলির সাথে যোগাযোগ রেখেছে আর সব সময় এটাসেটা নিয়ে খেঁপিয়ে যাচ্ছে। সহজ সরল করম আলির মনে সবসময় সন্দেহের বীজ বুনে দিয়েছে, এখন সেটা মহীরুহ হয়ে ইউসুফ-মেমির জীবনে বিচ্ছেদ আনার চেষ্টা করছে।

তাহের মোল্লাকে দেখে ইউসুফ মিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো, কোনভাবেই সে মেমিকে ত্যাগ করবে না। দরকার হলে ওকে নিয়ে ঢাকা চলে যাবে। কখনো বাবার রাগ কমলে ফিরে আসবে। কোনভাবেই তাহের মোল্লার মন্দ উদ্দেশ্য সফল হতে দেয়া যাবে না।

উঠোনভর্তি লোকজনের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুনে ইউসুফ মিয়া ফিরে দেখলো, মেমির বাবা আসছে, সাথে ওর চাচা। ওরা উঠোনে এতো লোক দেখে থমকে গেলো। একটু অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। মুরুব্বী গোছের একজন লোক গিয়ে ওদের নিয়ে এলো। অপেক্ষাকৃত কম বয়সী দু’জন উঠে ওদের বসতে দিলো। ওদের দেখেই করম আলির রাগ বুনো বিড়ালের মতো লাফিয়ে উঠলো, চেঁচিয়ে বললো,

– লইয়া যান আফনেগো মাইয়া, এমুন মাইয়া আমরা রাখমু না, আমার পোলারে আবার বিয়া করামু।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মেমির চাচা বলে উঠলো,

– শান্ত অন বেয়াই, কি অইছে খুইলা কন, আমরা তো আইছি, আফনেও আছেন, মায়-মুরুব্বি মিললা একখান কিছু করমু, আফনে শান্ত অন বেয়াইসাব।

– কিছু করণ লাগবো না,খালি আফনেগো মাইয়া লইয়া যান গা।

এবার মেমির চাচা গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো,

– হুনেন, লইয়া যান কইলেই তো লইয়া যাওন যাইবো না, হগল কিছুই একখান নিয়ম কানুন আছে, আমগো মাইয়া তো পায়ে হাঁইটা আহে নাই। কাবিন কইরাই আনছেন। লইয়া গেলে তো আফনাগো কিছু তেলনুন আছে, হেইডা কিছু চিন্তা করছেন? অহন হেইসব কথা বাদ দিয়া কি অইছে হেইডা কন। একখান সমাধান তো অইবোই।

এ সময় তাহের মোল্লা কিছু একটা বলার জন্য গলা খাঁকারি দিতেই ইউসুফ মিয়া ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো। সাথে সাথে থেমে গেলো। পাশের একজনের কাছ থেকে একটা বিড়ির অর্ধেক নিয়ে টান দিয়ে বিড়িটা আবার ফিরিয়ে দিলো। মুখ তুলে আর ইউসুফ মিয়ার দিকে তাকাচ্ছে না।

মেমি তখনও একই জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে, কোন কথায় যেন ওর কানে ঢুকছে না। একমনে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মেঝেতে গর্ত খুঁড়েই যাচ্ছে। যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোন কাজ ওর জানা নেই।

করম আলি লাফ দিয়ে উঠে বলে,

– আফনেগো মাইয়ার চরিত্র বালা না,আমগো বাড়িত কুয়া আছে, কুয়ার পানি বালা লাগে না, সিকি মাইল হাইডা চাপকলত জায় পানি আইনতে।

– চাপকলের পানি খাওন যায় না?

– আমি মানা করছি হ্যায় যাইবো ক্যান?

– ক্যান জায় হেইডা জিগাইছেন?

– ক্যান জিগামু? কারে জিগামু? হ্যাই তো কথায় কয় না।

– চাপকল থেইকা পানি আইনতে গেলেই কি মাইয়া খারাপ অইয়া গেল?

– আমগো বাইত কুয়া থাইকতে হ্যায় মেম্বারগো চাপকলত যাইবো ক্যান। আমরা হ্যারে ছাড়ান দিমু, আফনেরা লইয়া যান।

– হোনেন মিয়া ছারান দেওন এতো সুজা না, আমরাও দেইখা নিমু। ছাড়ন দেওনের আগে হিসাবনিকাশ আছে তো।

 

এবার করম আলি কোমরে গামছে বেঁধে এক লাফে ইউসুফ মিয়ার সামনে চলে এলো। বললো,

– এই সুম্মুন্ধির পুত, এই মাইয়ারে অহনই ছাড়ান দিবি। অহনই তিন তালাক কবি।

– আব্বা, আফনে চুপ যান, আমারে কথা কইতে দেন।

– অ, অহন তুই কথা কবি? ক, কিন্তুক, এই মাইয়া আমার বাইত থাইকবো না কইলাম থাইকবো না।

– আমি মেমির লগে কথা কমু, আমি জানবার চায় হ্যায় ক্যান কুয়াত পানি থাইকতে চাপকল র পানি আনবার জায়?

– তর এত্ত সাহস বারছে, মায়-মুরুব্বির সামনে অহন বউ এর লগে কথা কবি? আমি মইরা গেছি?

– আব্বা, গোসসা কইরেন না। কাটি দিতে কইলেই কি কাটি দেওন জায়? অরে আমি আল্লার কালাম সাক্ষি রাইখা বিয়া করছি আব্বা। আমি জানবার চায় ক্যান এমুন অইলো।

এতোক্ষণ মেমির বাবা কিছুই বলে নি। চুপচাপ সবার কথা শুনছিলো আর কাঁধের গামছাতে মুখ মুছছিলো। এবার উঠে দাঁড়িয়ে সবার সামনে হাত জোড় করে বললো,

– আফনেরা আমার মাইয়ারে কিছু কয়েন না, বড়ো বালা মাইয়া আমার। মা মরা মাইয়া, ছোটবেলা থেইকা হাতাই এর ঘরত বড়ো অইছে, কিন্রু চরিত্র খারাপ এইডা কেউ কইতে পারে নাই। আমগো বাইতও কুয়া আছিলো। ভরাইয়া দিছি। কুয়ার একখান কাহিনি আছে। আমি মনে করছিলাম মাইয়া আমার ভুইলা গেছে। হ্যায় যে ভুলে নাই অহন বুঝলাম।

ইউসুফ মিয়া এগিয়ে গিয়ে মেমির বাবার কাঁধে হাত রেখে বলে,

– আব্বা, কি অইছে খুইলা কন? আমগো বাইত কুয়া থাইকেও ক্যান মেমি চাপকলত জায় হেইডা খুইলা কন।

– মেমির বয়স যহন পাঁজ বচ্ছর তহন আমার মায়ের লগে মেমির মায়ের কাইজ্জা লাগে, আমি তহন খেতের কামে আছিলাম। বাইত আইলেই মায়ে আমার কাইন্দা কাইন্দা বউ এর নামে নালিশ দিল। কাম থেইকা আইসা আমিও খুদায় কাতর আছিলাম। সহ্য করতে না পাইরা মেমির মারে কইলা ফালাইলাম,

‘আমার মায়ের লগে কাইজ্জা করস , তরে আমি তালাক দিমু’।

তহনই হ্যায় কইলো, ‘ তালাক দিবা কারে তুমি?বাইচ্চা থাইলে তো তালাক দিবা?’

কইয়া কুয়ার মধ্যে ঝাঁপ দিয়া পড়লো। কুয়া ভরা পানি আছিলো। চিল্লাইয়া মানুষ জড়ো কইরা যহন তুইল্যা আনলাম তহন হ্যায় আমগোরে ছাইড়া চইলা গেছে। মায়ের লাশ দেইখা মাইয়া আমার জবান বন্ধ কইরা ফালাইলো। বহুত বচ্ছর পর কথা কইলো, কিন্তুক হগল সোময় ডরে ডরে থাহে।

কুয়ায় বুজাইয়া দিলাম, আমার মায়ের কষ্টের শেষ অইলো না…

বলেই মেমির বাবা হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো।

সবাই হতবাক হয়ে মেমির বাবা কথা শুনছিলো। হঠাত ধপ করে একটা শব্দ হলো। সবাই দেখলো দাওয়ায় দাঁড়ানো মেমি উঠোনে পড়ে আছে। জ্ঞান হারিয়েছে সে।

ইউসুফ মিয়া দৌড়ে গিয়ে মেমিকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলো।

 

সবাইকে অবাক করে দিয়ে করম আলি কোদাল আর টুকড়ি নিয়ে আসলো। টুকড়িভরে ভরে মাটি নিয়ে কুয়াতে ফেলতে শুরু করলো। চিৎকার করে বললো,

– অই জব্বাইরা সুম্মুন্ধির পুত, আয় আমার লগে হাত লাগা, আইজ ই কুয়া ভরন লাগবো।