কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার

প্রকাশিত: ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৯, ২০২১

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার

শানু মোস্তাফিজ

মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার জটারপুর গ্রামের জিয়াউর রহমান (৩০) ১০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন। আই এ পাসের পর আরো পড়ালেখার ইচ্ছে থাকলেও দরিদ্র বাবাকে সাহায্য করার জন্য জিয়াউর পড়ালেখা ছেড়ে দেন এবং চাষাবাদে পুরোপুরি মনযোগ দেন।

জিয়াউর বলেন, “সরকার কৃষির বহু বিষয় ডিজিটাল করেছেন। এজন্য চাষাবাদ এখন খুব কষ্টকর বা অবহেলিত পেশা নয়। বরং তরুণরা দিন দিন এ পেশায় এগিয়ে আসছে। এখন আমরা কৃষি বিষয়ক নানা ধরণের অ্যাপস ব্যবহার করে অনেক কিছু সহজে ও দ্রুত জানতে পারছি এবং সে অনুযায়ী কাজ করছি। আগে এক বিঘা জমিতে ২১-২২ মণ ধান উৎপাদন হতো এ বছর আমি একই জায়গায় ৩১ মণ ধান পেয়েছি। আগে জানতাম না কীভাবে লাইন করে কত দুরত্ব রেখে চারাগাছ লাগাতে হয় কিংবা বিভিন্ন পোকামাকড় ও রোগব্যাধি হলে সঠিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারতাম না এখন এসব জেনে বুঝে তা প্রয়োগ করতে পারছি।”

জিয়াউর আরো বলেন, “আমাদের এখানে প্রচুর সবজি হয়। আমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমেও সবজি বিক্রি করছি। যে সব কৃষক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন না তারাও অনেক আগ্রহ নিয়ে অন্যের কাছে তার সমস্যা বলে সমাধানগুলো জেনে নিচ্ছেন।” তাই এখন আর কৃষির প্রথাগত চাষপদ্ধতি নেই। কৃষির যন্ত্রপাতি যেমন আধুনিক হয়েছে, তেমনি উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদও হচ্ছে। কৃষকের পরিশ্রম কমিয়ে কৃষিকাজকে সহজসাধ্য করার লক্ষ্যে সরকার ডিজিটাল মাধ্যমে নানা ধরণের উদ্যোগ নিয়েছে। ই-কৃষি বা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, কিছু কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং আরো নতুন কিছু করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এতে আমাদের কৃষি এবং কৃষকরা অনেক উপকৃত হচ্ছেন বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন। কৃষকের জানালা -িি.িরহ বিভিন্ন ধরণের ফসলের রোগ, পোকামাকড় ও সারের ঘাটতিজনিত রোগ হলে কৃষকরা এর সমাধানের জন্য বা পরামর্শের জন্য কৃষি কর্মকর্তাকে জানানোর সময় রোগাক্রান্ত ফসলের নমুনা দেখাতে হয় এবং রোগের লক্ষণের বিবরণ তাকে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হয়। এ ধরণের পরিস্থিতির সহজ সমাধানের জন্য দেশের সব প্রধান ফসলের সমস্যার ছবি সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরি করে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তা সাজানো হয়েছে। এখানে ছবি দেখে কৃষক বা কৃষি সেবাদানকারী কর্মকর্তা ফসলের সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন এবং ছবিতে ক্লিক করলে সমস্যার বিবরণসহ সমাধান দেখা যায়। কৃষকের জানালা’য় এভাবেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে কৃষক তার সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারছেন। এখানে ১২০টির বেশি ফসলের ১,০০০-এর বেশি সমাধান রয়েছে। যা অনলাইন বা অফলাইনের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। কৃষকের জানালা উদ্যোগটি জাতিসংঘের তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত বিশেষায়িত সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) কর্তৃক ২০১৬ সালে ডব্লিউএসআইএস পুরুস্কার লাভ করেছে।

বালাইনাশক নির্দেশিক ঃ কোনো ফসল কোনো রোগ বা পোকামাকড়ে আক্রান্ত হলে কৃষকরা সাধারণত কীটনাশকের দোকানে গিয়ে দোকানদারের পরামর্শে কীটনাশক কেনেন। এতে তারা সঠিক কীটনাশক বাছাই করতে পারেন না এবং এর সঠিক মাত্রা সম্পর্কেও জানেন না। এজন্য তৈরি হয়েছে ‘বালাইনাশক নির্দেশিকা’। যার মাধ্যমে একজন কৃষক নিজে বা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর সাহায্যে তৎক্ষণাৎ ইন্টারনেটে ভিজিট করে সঠিক বালাইনাশকটি গ্রহণ করতে পারে। অ্যাপলিকেশনটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই আছে। এই অ্যাপলিকেশনের মাধ্যমে দেশে অনুমোদিত বালাইনাশকের পাশাপাশি কোন কোম্পানির কি কি বালাইনাশক বাজারে আছে এবং একটি গ্রুপের বালাইনাশক কোন কোন নামে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানি বাজারজাত করছে তাও জানা যাবে। কোনো একটি পণ্যের এপি নাম্বার যাচাইয়ের মাধ্যমেও জানা যাবে পণ্যটি অনুমোদিত কি না। এজন্য গুগুল প্লে স্টোরে চবংঃরপরফব চৎবংপৎরনবৎ নামে সার্চ করুন কৃষি বাতায় কৃষি বাতায়ন মূলত ই-কৃষি যার মাধ্যমে দেশব্যাপী দ্রুত এবং সহজে কৃষি বিষয়ক যে কোনো তথ্য, পরামর্শ বা সেবা প্রদান করা হয়। এটি একটি চলমান প্রকল্প। এতে ইতিমধ্যে ৮২ লাখ কৃষকের ডাটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। আগামি ডিসেম্বরের মধ্যে সারদেশের ২ কোটি ৫৪ লাখ কৃষক পরিবার এর আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এটা কৃষক ও কৃষি বিষয়ক সেন্ট্রাল ডাটাবেজ। সারা দেশের কোথায় কোথায় সার ও বালাইনাশকের দোকান রয়েছে এবং সেগুলোর নাম ঠিকানা, ফোন নম্বরও এখানে আছে। এখানে ৫,৫০০টি হাট-বাজারের তথ্য আছে। এখান থেকে একজন কৃষক জানতে পারবেন তার আশেপাশে কোন কোন বাজার ও হাট রয়েছে এবং আজকে কোথায় কি বাজার বসবে তাও জানা যাবে।

এখানে সারা দেশের কৃষি জমি, কোন এলাকায় কি ফসল উৎপাদন হয় এবং এসব ফসল কারা উৎপাদন করেন, কারা এসব কাজে কর্মরত তাদের ফোননম্বর আছে। জেলা, উপজেলা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন কৃষি সংগঠনের নাম এবং কারা এর সাথে যুক্ত তাদের নাম ও ফোননম্বর আছে। সরকার কৃষককে কোন সময় কেমন ভর্তূকি দিচ্ছে সেসব তথ্যও পাওয়া যাবে। নতুন যে সব রোগ আসছে সে সব সম্পর্কেও এখানে তথ্য থাকবে। এর আগে সরকার যে সব কৃষি পণ্য উৎপাদন করেছে সে সব বিষয়ে উৎপাদন পদ্ধতিসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু আছে। কৃষক কি কি প্রশিক্ষণ পেয়েছে, তাদের মোবাইল নম্বর এসব বিষয়ও অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে। থাকবে কৃষি বিষয়ক নানা তথ্য ও গল্প।

কৃষকবন্ধু ফোন সেবা (৩৩৩১) ঃ কৃষি বিষয়ক যে কোনো সেবা ও পরামর্শের জন্য সরকার কৃষকবন্ধু ফোনসেবার ব্যবস্থা করেছে। এলাকাভিত্তিকভাবে কৃষকগ্রুপ করা হয়েছে। এতে একজন কৃষক যখন ৩৩৩১ নম্বরে ফোন করেন তখন ঐ এলাকার কৃষি কর্মকর্তার কাছে কলটি দেয়া হয়। যাতে এলাকাভিত্তিক ভাষা কিংবা ফসল বা পোকামাকড়ের নাম ও সমস্যাগুলো তারা সহজে আলোচনা করে সমাধানে আসতে পারেন। এভাবে কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি) এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বাজারদরও জানা যায়। ১৫ হাজার কর্মী প্রায় ২ কোটি কৃষককে সহজে এবং দ্রুত এ সেবা দিতে পারবে।

কৃষি কল সেন্টার-১৬১২৩ কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩-এ ফোন করে বিনামূল্যে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ (গবাদিপশু ইত্যাদি) বিষয়ে সমস্যার তাৎক্ষণিক বিশেষজ্ঞ সমাধান পাওয়া যাবে। কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি) স্থাপন এটি তৃণমূল পর্যায়ে স্থাপিত কৃষকদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি আইসিটিভিত্তিক তথ্যসেবা কেন্দ্র। এর মাধ্যমে কৃষকরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে তথ্যসেবা গ্রহণ ও বিতরণ করছে। এর মাধ্যমে কৃষি বিষয়ক পরামর্শ অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ দ্বারা দেয়া হচ্ছে। দেশব্যাপী ৪৯৯টি তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। কৃষি ও পল্লীঋণ স এটি একটি চলমান প্রকল্প। চট্রগ্রামে এটা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। প্রান্তিক চাষীদের কৃষিঋণে ভোগান্তি দূর করার জন্য কৃষি ও পল্লীঋণের প্রক্রিয়াকে অনলাইনের আওতায় আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ চলছে। এতে কৃষকদের আবেদন করা থেকে শুরু করে ঋণ বিতরণ কার্যক্রমকে অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এতে কৃষকরা ঋণের সুদের হারও জানতে পারবে। এতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে পারবে এবং ঋণ অনুমোদিত হলে তারা এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারবে। পাশাপাশি তারা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে সহজেই কৃষিঋণের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। এসব অ্যাপস, ওয়েবসাইট, কল সেন্টার ইত্যাদি বাস্তবে কৃষকদের কতটা কাজে লাগছে এবং তারা কি তা ব্যবহার করছে জানতে চাইলে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিসুজ্জামান খান বলেন, “দুই-তিন বছর আগেও কৃষকরা ই-কৃষি বিষয়ে এতটা জানতো না। এখন তারা বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং অ্যাপস ব্যবহার করে চাষাবাদ করছেন। যারা এ বিষয়ে জানেন না তারা অন্যদের কাছে বুঝিয়ে নেন। তারা ইউটিউব দেখেও অনেক কিছু শিখছেন। অনেকে জমিতে গিয়ে আমাদের ভিডিও কল দেন। ফসলের সমস্যাগুলো দেখান এবং পরামর্শ নেন। উল্লেখ্য যে, প্রচুর তরুণ এ পেশায় আসছে এবং দ্রুত সব কিছু শিখে নিয়ে তারা ভালো করছে। কৃষি বিষয়ক সব কিছু ডিজিটাল হওয়ায় তাদের অনেক উপকার হচ্ছে।”

এসব প্রযুক্তি নিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রকল্পগুলোর সমন্বয়কারী হিেেসবে কাজ করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আজম উদ্দীন। তিনি বলেন, “প্রত্যেকটা প্রকল্প কৃষকদের ভালো সেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। সরকার এ দেশের কৃষকদের সত্যিকার অর্থেই ডিজিটাল কৃষকে পরিণত করার জন্য যে সকল পদক্ষেপ নিয়েছে তা যুগান্তকারী অনেক ভালো এবং কার্যকর পদক্ষেপ। কৃষকরাও এ বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহী এবং তারা সুফল পাচ্ছেন। সরকার মুজিব বর্ষে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ডাটাবেজে অন্তর্ভূক্ত কৃষকদের স্মার্ট কার্ড দেয়ারও প্রস্তুুতি নিচ্ছে।”

কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তিগভাবে সরকারের আরো কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইতিমধ্যে কানাডার একটি বিশ^বিদ্যালয় এ দেশের কৃষককে আরো কীভাবে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করা যায় সে বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এ বিষয়ে সরকার শীঘ্রই একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ভাবছে। এছাড়া কৃষি জমির ম্যাপিং, আবহাওয়ার পূর্বাভাস- যা কৃষি পূর্বাভাস, ক্রপ ইন্সুরেন্স ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করার কথাও সরকার ভাবছে। এগুলো হলে আমাদের কৃষি অনেক এগিয়ে যাবে।”

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক উপদেষ্ঠা এবং পিপিআরসি’র নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক বছর দেশ কৃষিতে অনেক এগিয়েছে। ইদানিং কৃষিক্ষেত্রে সরকার যেভাবে ডিজিটাল সেবার ব্যবস্থা করেছে তাতে কৃষি আরও এগিয়ে যাবে বহুদূর। আমাদের আভ্যন্তরীন অর্থনীতিতেও কৃষির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃষিক্ষেত্রে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং কৃষকদের জন্য ডিজিটাল সেবা আরও সহজ এবং সময়োপযোগী করতে হবে।’
#

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com