কোনো আলোচনা ছাড়াই একটা পারস্পরিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেল

প্রকাশিত: ৬:৪৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩১, ২০১৮

কোনো আলোচনা ছাড়াই একটা পারস্পরিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেল

জেসমিন চৌধুরী

সিংগাপুরে আমাদের তিন বেডরুমের বাসাটায় তিনটা ছোট পরিবারের বসবাস, ইংরেজিতে এর প্রতিটাকে বলে একটা আলাদা হাউসহোল্ড- হাউস একটা, হাউসহোল্ড তিনটা। একজন ভারতীয় ব্যাচেলর থাকেন সবচেয়ে বড় কামরাটায়, এক বার্মিজ দম্পতি মাঝারি কামরাটায়, আমাদের ভাগে পড়েছে সবচেয়ে ছোটটা। ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং স্পেসটা বিশাল, সবমিলিয়ে তিনটা কামরার চেয়েও বড় হবে, চাইলে এখানে লন টেনিসও খেলা যেতে পারে, স্নুকার টেবিল বসানো কোনো ব্যাপারই না। সিংগাপুরে এখন ভীষণ গরম হলেও আমাদের একুশ তলার ফ্লাটটায় সমস্তদিন ফুরফুরে স্নিগ্ধ বাতাস বয়ে যায়।

লক্ষ করলাম ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা কাজ থেকে ফিরেই যার যার কামরায় বন্দী হয়ে পড়ে, খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত কামরাতেই। বুঝলাম বেডরুমের এসির আরাম থেকে বেরোতে চায় না এরা কারণ ড্রয়িং স্পেসে এসি বা ফ্যান কিছুই নেই। আমার আরামের চাহিদা কম, কাজেই আমি আস্তানা গাড়লাম ড্রয়িং স্পেসের সোফাটায়। ভোরে যখন সূর্য ওঠে তখন সরাসরি রোদ ঢুকে বলে ঘন্টাদুয়েকের জন্য কামরাটায় আগ্নেয়গিরির উত্তাপ, সূর্য মাথার উপর উঠে গেলে আবার শুধুই ফুরফুরে বাতাস।

ফ্ল্যাটের অন্যান্য বাসিন্দাদের সাথে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বন্ধুত্ব হলো না খুব একটা। বার্মিজ দম্পতি ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নয়, কথা জমানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। ভারতীয় যুবক নিরামিষ-ভোজী, আমাদের সাথে খেতে বসানো গেলো না তাকে।

আরো লক্ষ করলাম এরা প্রতিদিন গোসল করে, কাপড় ধোয়, নিজেদের কামরা পরিষ্কার করে কিন্তু কমন স্পেসটায় হাত লাগায় না কেউ। স্পেসটা তারা কেউ ব্যবহার করে না সত্যি তবু এর ভেতর দিয়েই রান্নাঘর/বাথরুম/বাইরের জগতে সবার আনাগোনা। আপাতদৃষ্টিতে ফ্ল্যাটটাকে পরিষ্কার মনে হলেও এখানে ওখানে প্রচুর ধূলা জমেছে, রান্নাঘরের মেঝেতে ছোপ ছোপ আঠাযুক্ত ময়লা, ব্যালকনিতে এক ইঞ্চি পুরু কাদা, চুল ইত্যাদি। প্রথম দিনই কোমর বেধে কাজে লেগে গেলাম, একে একে ঘষে মেজে পরিষ্কার করলাম ব্যালকনিসহ পুরোটা ফ্ল্যাট। কাজেই দুইদিন পর এজেন্ট যখন এসে বলল, ‘তোমরা কমন স্পেসটা ব্যবহার করতে পারো, কিন্তু মনে রেখো এটা তোমাদের একার না।’ তখন মনটা খুব খারাপ হলো। সে আরো বলল, ‘ভারতীয় ছেলেটা খুব আন্ডারস্ট্যান্ডিং, বার্মিজ লোকটাও ঠিক আছে, ওর বৌটাও তেমন খারাপ না কিন্তু বুঝোই তো সবার মন সমান না।’

এরপর থেকে এরা বাসায় থাকলে কমন স্পেসে নিজেদের উপস্থিতিকে অপ্রকট রাখার চেষ্টা করি। ভাবি, হয়তো এরা বুঝতে পারছে না আমরা এখানের স্থায়ী বাসিন্দা নই, চিকিৎসার জন্য এসেছি, হসপিটাল এপয়েন্টমেন্টের সময়টুকু বাদে সারাক্ষণই আমরা বাসায়, পুরোটা সময় দুটো মানুষ একটা কামরায় বন্দী থাকবে কী করে? তারা সমস্তদিন কাজে থাকে, রাত এবং সকালের অল্প সময় নিজেদের কামরায় কাটিয়ে দেয়া তাদের দ্বারা সম্ভব। খুব অভিমান হলো মেয়েটার উপর, নিজে তো কমন স্পেসটা ব্যবহার করবেই না, তবু অভিযোগ ঠুকে দিল? আমি যে বাসাটাকে তকতকে পরিষ্কার করে রেখেছি সেটা দেখলো না?

চাইলে বাসা পরিষ্কার করা বন্ধ করে দিতে পারতাম, চাইলে ওর সাথে শীতল সম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু এর কোনোটাই করলাম না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মাত্রা বাড়িয়ে দিলাম, মেয়েটার সাথে নতুন করে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। অভিযোগ ঠুকে দেয়ার পরও আমাদের আন্তরিক ব্যবহারে বিস্মিত হলো কী না জানি না, এবার সে আমাদেরকে দেখলে মুচকি হাসি দিতে শুরু করল। আলাপ খুব বেশিদূর না গড়ালেও তার নামটা জানতে পারলাম- টান্ডার। যদিও নামটা বজ্রপাতের কথা মনে করিয়ে দেয় তবু পরিস্থিতি আগের চেয়ে স্বাভাবিক, বরফ খানিকটা হলেও গলেছে।

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বাসার আসবাবপত্রের ধূলাবালি ঝেড়ে, মেঝেটা ঝাড়ু দিয়ে, ডেটল-পানি দিয়ে ধূতে গিয়ে দেখি ময়লা খুব একটা নেই। টান্ডার এর মধ্যে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাচ্ছে। আমার দিকে বিশাল একটা হাসি ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘উই ক্লিন ইয়েস্টারডে’।

গতকাল আমরা বাসায় ছিলাম না, পক্ষান্তরের ইস্টারের ছুটি উপলক্ষে তারা কাজে যায়নি। গত একমাসের মধ্যে এই প্রথম তারা আমার মত করেই পুরো বাসাটাকে পরিষ্কার করেছে। আজ আমার মনটা খুব ভালো, টান্ডার এবং তার হাজব্যান্ড বাসা সাফ করেছে বলে নয়, বরং কোনো আলোচনা ছাড়াই একটা পারস্পরিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেল বলে। উদাহরণের চেয়ে বড় প্রশিক্ষণ কৌশল আর হতেই পারে না।

লাইভ রেডিও

Calendar

May 2024
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031