ক্রুজের গল্প > কয়েক দিনের জলে ভাসা ‘ঊর্মি-তরঙ্গের জীবন’

প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২১

ক্রুজের গল্প > কয়েক দিনের জলে ভাসা ‘ঊর্মি-তরঙ্গের জীবন’

লুৎফর রহমান রিটন
অনেক দিন ধরেই একটা ক্রুজ ট্যুরের গল্প বলবো বলবো করেও বলছি না। বারো তলা বিশাল জাহাজে চেপে আমেরিকার হিউস্টন থেকে মেক্সিকোর দু’টো দ্বীপে পাঁচ-দিন চার-রাত্রির দুর্দান্ত সেই জাহাজ ট্রিপের ঘটনাটা না বললে আর চলছে না। আমার আর শার্লির জীবনে ২০১৮ সালের জানুয়ারির শেষান্তের সেই ট্রিপটা অবিস্মরণীয় একটা স্মৃতি হয়ে আছে। আমি চাই সাধ-সাধ্য-সময়ে কুলোলে আমার বন্ধুরাও ওরকম কোনো একটা ট্রিপে যাক। স্বামী-স্ত্রী যুগল কিংবা পরিবারের ক্ষুদে সদস্যদের নিয়েও এই ট্যুরটা করা যেতে পারে। একঘেঁয়ে জীবনের পানসে পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পাঁচ-সাত দিনের ওরকম একটা জাহাজ ভ্রমণ জীবনকে নতুন করে দেখার এবং উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। চাইলে এই সময়টায় এমনকি ওয়াইফাই থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকা যায়। যার ফলে পরিচিত দুনিয়াদারি থেকে চলে যাওয়া যায় অপরূপ এক হাইবারনেশনে।
২০১৮ সালের বইমেলায় যাবার প্রস্তুতি হিশেবে টিকিট কেনা ইত্যাদি সম্পন্ন করে আমি আর শার্লি জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কন্যা নদীর সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটানোর পরিকল্পনা নিয়ে হিউস্টনে গেলাম। সেই সময়টায় আমি খুব বেদনার্ত ছিলাম। বইমেলায় যাবো কি যাবো না এরকম একটা দ্বিধার দোলাচলে ছিলাম। আমার এক প্রীতিভাজন আজীবন অনুজের ভালোবাসা পাওয়া খুব কাছের একজন আমাকে সামাজিক ভাবে হেয় করার নেশায় উন্মত্ত হয়ে পেছন থেকে ঈর্ষার ছুরি মেরে রক্তাক্ত করে ফেলেছিলো আমাকে। এক জীবনে পাওয়া সবচে অবিশ্বাস্য স্মৃতি আমার সেটা। বইমেলায় গেলে রোজ তার সঙ্গে আমার দেখা হবে। কিন্তু আমি চাই না ওর সঙ্গে আমার আর দেখা হোক। সেই কারণে বিমান টিকিট আগেই কেটে ফেললেও বইমেলায় যাওয়াটা অনিশ্চিত ছিলো।
আমার মন খারাপের এই সময়টায় কন্যা নদী একদিন আমার আর শার্লির হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিলো। খামের ভেতরে Royal Caribbean Cruise রয়াল ক্যারিবিয়ান ক্রুজ নামের একটা জাহাজ ট্রিপের দু’টো টিকিট আমাদের দু’জনার নামে এবং কিছু আনুষঙ্গিক কাগজপত্র। নদী আর ওর বর ডেভিড বললো–বইমেলায় এবার যাওয়ার দরকার নেই। একবার না গেলে কিচ্ছু হবে না। তারচে বরং এই জাহাজ ট্রিপটা দিয়ে আসো। মন ভালো হয়ে যাবে।
আমার বাংলাদেশ যাবার বিমান টিকিট ক্যান্সেল করালাম ট্রাভেল এজেন্টকে বলে। বড় একটা অংকের টাকা গচ্চা গেলো। আমরা প্রস্তুতিতে নেমে পড়লাম জাহাজ ট্রিপের। ফার্মেসির মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে দুই পাতা ট্যাবলেট কিনে আনা হয়েছে ‘মোশন সিকনেস’ নামে একটা ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থেকে বাঁচতে। অনেকেরই এটা হয় এরকম জাহাজ ট্রিপে। নদী বা সমুদ্রের অসীম জলরাশির আছাড়ি-পিছাড়ি ঢেউয়ে জাহাজ যখন দুলতে থাকে ওপর নিচে কিংবা ডানে বামে, যেটাকে বলে রোলিং, তখন অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকটা ভার্টিগো টাইপের বিপর্যয় ঘটে তখন শরীরে বা মস্তিষ্কে। প্রতিদিন সকালে একটা এবং রাতে একটা কিংবা প্রতিদিন মিনিমাম একটা ট্যাবলেট এস্তেমাল করলে এই মোশন সিকনেস থেকে রেহাই পাওয়া যায় অনায়াসে।
একটা বড় লাগেজ এবং দুইটা ক্যারি অন লাগেজসহ ওয়ান ফাইন মর্নিং নদী আমাদের পৌঁছে দিলো হিউস্টনের গ্যালভেস্টোন জাহাজ ঘাটে।
এয়ারপোর্ট স্টাইলে চেক ইন করে পাসপোর্ট শো করে কাস্টম সিকিউরিটি পার হয়ে বোর্ডিং পাস নিতে হলো। আমাদের লাগেজগুলোয় রুম নাম্বার লেখা একটা ট্যাগ বসিয়ে দেয়া হলো বিমানের কায়দায়। বলা হলো–যাবতীয় অফিসিয়াল আনুষ্ঠানিকতা পার হয়ে রুমে পৌঁছানোর আগেই রুমের দরোজায় আমাদের লাগেজ অপেক্ষমান থাকবে। নো টেনশন। আমাদের নাম ও রুমের নাম্বার লেখা ভিসা কার্ডের মতো দু’টো কার্ড ইস্যু করলেন হাসিখুশি এক নারী কর্মকর্তা। বললেন–এই কার্ড যত্নে রাখিও। হারাইয়া ফেলিলে ঝামেলায় পড়িবে। রুম পর্যন্ত পৌঁছুতে পারিবে না তাহা হইলে। রুমে ঢুকিতেও পারিবে না।
–হায় হায় বলিলে কী! আমার তো হারিয়ে যাওয়ার বাতিক রহিয়াছে! বললাম আমি।
তিনি হাসলেন। খুব মিষ্টি সেই হাসি–মহাশয় টেনশনের কিছু নাই। রুম নাম্বারটা অন্তত মনে রাখিও। পুরো জাহাজের সর্বত্র আমাদের আমাদের লোকজন তোমার সহায়তায় সদা সর্বদা প্রস্তুত রহিয়াছেন!
আমি বললাম, আর যদি কার্ড হারাইবার ফলে টেনশনে আমার স্মৃতিশক্তিও দুর্বল হইয়া পড়ে? তাহা হইলে উপায়?
মাঝ বয়েসী রূপসী কর্মকর্তাটি একটুও বিরক্ত না হয়ে বললেন, অসুবিধা নাই। তোমার পাসপোর্ট দেখাইও।
আমার মশকরা তবুও থামে না–সঙ্গে যদি পাসপোর্টও না থাকে তাহা হইলে কি আমি হারাইয়া যাইবো এতো বিশাল বারোতলা জাহাজে?
আনন্দের তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে ভদ্রমহিলা বললেন, ফর গড সেক জেন্টলম্যান সেই ক্ষেত্রে তুমি অন্তত তোমার নামটি স্মরণে রাখিও। তোমার নাম সার্চ করিয়াও তোমার রুম এড্রেস খুঁজিয়া দিতে সক্ষম হইবে আমাদের স্মার্ট কর্মীরা। এবং তাহারা তোমাকে নতুন করিয়া রুম খুলিবার কার্ডও ইস্যু করিয়া দিবে কারণ তুমি আমাদের সম্মানিত অতিথি। অতিথিদের সেবায় আমাদের সুনাম রহিয়াছে।
০২ > হইয়া আমি দেশান্তরি দেশ বিদেশে ভিড়াই তরী রে…
আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলো বিশাল একটা জাহাজ। জাহাজের নাম VISION OF THE SEAS ভিশন অব দা সীস। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আমরা জাহাজে প্রবেশ করলাম। আয়োজক কোম্পানির পক্ষ থেকে আমাদের স্বাগত জানিয়ে আমাদের গৃহপ্রবেশ করানো হলো জাহাজের ভেতরে। কিছু বক্তৃতা হলো। এগুলো জরুরি টিপস, যাত্রীদের জন্যে। নির্দেশনা সম্বলিত মুদ্রিত ম্যাপ আমাদের হাতে। সেখানে নিজেদের কক্ষ খুঁজে পাবার সকল পথ বাতলে দেয়া আছে। না বুঝলে জাহাজ কর্মীরা তো আছেই সর্বত্র।
যে কক্ষটা বা কেবিনটা নদী আমাদের জন্যে বুক করেছে পাঁচ দিন চার রাত্রির জন্যে সেটা আয়তনে খুব বড় নয় কিন্তু এই কেবিনে জামা কাপড় ঝুলিয়ে রাখার একটা ক্লজেট, একটা ডাবল চৌকি বা খাট, দু’জন বসা যায় এরকম টু সিটেড একটা খুবই স্লিম সোফা, একটা খুব ছোট্ট টেবিল,একটা টুল, একটা আয়না, আয়নার সঙ্গে যুক্ত ক্লজেট, ক্লজেটের পাশে একটা ঝুলন্ত টিভি, একটা সিঙ্গেল শাওয়ার স্পেস, একটা টাইট টয়লেট বা ওয়াশরুম, সেখানে একটা মাঝারি আয়না এবং একটা বেসিন। বিছানার ডানদিকের দেয়ালে বড় সাইজের একটা পেইন্টিং। বিছানার মাথার দিকে কাচঘেরা বড় একটা ফিক্সড্‌ জানালা, হালকা রঙের একটা পর্দা দিয়ে জানালাটা ঢাকা। পর্দা সরাতেই চক্ষু ছানাবড়া! ঝকঝকে গ্লাসের ওপাশে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ঢেউয়ের পরে ঢেউ। হাত দিয়ে ধরা যায় সে ঢেউগুলো, এমন দূরত্বে! ঢেউয়ের ঝাপটার কণা এসে জানালায় তৈরি করছে কী অপূর্ব বিন্দুচিত্র! যতোদূর দৃষ্টি যায় শুধু জল আর জল। এবং অনেক দূরের জলের ওপরে নেমে এসেছে মস্ত আকাশ।
বিশাল জলরাশির ওপর ভাসতে ভাসতে ছুটে চলেছে আমাদের বহনকারী দানবাকৃতির জাহাজ VISION OF THE SEAS ভিশন অব দা সীস। মাথার বালিশ লাগোয়া এমন একটা জলস্পর্শী জানালা পেয়ে আমি আর শার্লি একযোগে চিৎকার করে উঠলাম–কী সুন্দর! মনে হয় যেনো বাস্তব নয়, স্বপ্নদৃশ্য এটা।
বুঝলাম পাঁচটা দিন আর চারটা রাত্রি আমাদের কাটবে মোটামুটি ঘনঘোর স্বপ্নের ভেতরেই।
ফিটফাট বিছানার ঝকঝকে শাদা চাদরের ওপর একটা ফাইলের ভেতরে কয়েকটা মুদ্রিত পাতা সাজিয়ে রাখা। সেখানে পুরো জাহাজের ম্যাপ আঁকা। জাহাজের কোন তলায় কি আছে তার বিবরণ লেখা। খানাখাদ্যের মূল বুফে আয়োজন কোন তলায়। কোন তলায় অভিজাত রেস্টুরেন্ট স্টাইলের খানাপিনার ব্যবস্থা। কোন তলায় কালচারাল শো নৃত্যগীতের আসর। কোন তলায় সিনেমা হল মুভি থিয়েটার। কোন তলায় সোমরস পানের বার। কোথায় সুইমিং পুল। কোথায় ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর। কোথায় ছোটদের খেলাধুলার আয়োজন খেলনাসামগ্রী। কেনাকাটার বাতিকগ্রস্তদের জন্যে কোন তলায় রয়েছে বুটিক-পোশাক-জুতো-ব্যাগ-পারফিউম-জুয়েলারি ইত্যাদির শপিংসেন্টার। আছে ফিটনেস সেন্টার এবং স্পা।
আজকের শো নামে আলাদা একটা রঙিন পাতায় চার পাঁচটা আনুষ্ঠানিকতার স্থান এবং সময়সূচি। এক কথায় জাহাজের একটা সার্বিক চিত্র বা নির্দেশনা।
বিভিন্ন তলায় যাওয়ার জন্যে চমৎকার সুসজ্জিত সিঁড়ি তো আছেই, আমার মতো আরামপ্রিয় ও অলসদের জন্যে আছে এলিভেটর বা লিফ্‌ট। প্রতিটি ফ্লোর বা তলাকে বলা হয় ডেক। যেমন সাত তলা মানে ডেক ৭। ১০ তলা মানে ডেক ১০।
রুম বন্ধ করে আমি আর শার্লি জাহাজ পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়লাম। ইতোমধ্যে জাহাজ নোঙর তুলে ফেলেছে। আমাদের জাহাজ রওনা দিয়েছে মেক্সিকো অভিমুখে। পুরো জাহাজটায় এক চক্কর দিতে গিয়েই ক্লান্ত হবার দশা। এতো বিশাল।
০৩ > আবদুল হাই করে খাই খাই…
দুপুরে খেতে গেলাম নবম তলার সুবিশাল বুফে ভোজনালয়ে যার নাম WINDJAMMER উইন্ডজেমার। পুরো ফ্লোরটাই বুফের জন্যে সাজানো। এই ফ্লোরটার তিনদিকই খোলা বা উন্মুক্ত (কাচ ঘেরা)। ডান বাম এবং পেছনের অংশটা উন্মুক্ত শুধু ফ্রন্টাল ভিউ ছাড়া। তিনদিকেই বিপুল জলরাশির থই থই দৃশ্যপট। সবচে সুন্দর একেবারে পেছনের অংশটা। জলরাশি কেটে কেটে জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলে পেছনে তার ফেনায়িত ঢেউয়ের উত্তাল কলরোল। সেই ঢেউয়ের অনুসারী হয়ে কিছু দুরন্ত সীগাল সব সময় ক্লান্তিহীন পিছু নিচ্ছে তো নিচ্ছেই।
বুফে ফ্লোরটাকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে সব কয়টি জোনেই থরে থরে সাজিয়ে রাখা অজস্র রাশি রাশি খাবার। শয়ে শয়ে আইটেম। গুণে শেষ করা যাবে না। বিফ চিকেন পর্ক-এর বিপুল সম্ভার। এক দিকে ওরিয়েন্টাল ফুড। একদিনে স্টেক ইত্যাদি। একদিকে ভেজিটেরিয়ান কর্ণার। এবং একটা বিশাল এলাকা নিয়ে ডেজার্ট সেকশন। এই সেকশনটাই আমার কাছে মনে হয়েছে সবচে আকর্ষণীয়। সেখানে অগুন্তি মুখরোচক কেক-পেস্ট্রি-কুকি-ফিরনি-ইয়োগার্ট এবং চকোলেটের অফুরান যোগান। সেখানে আইসক্রিমই আছে অন্তত দশ রকমের। একটা আছে মিঠাই সেকশন। সেখানে ছোট ছোট একেকটা আইটেম খাইবেন আর পস্তাইবেন টাইপের মজা!
এই ফ্লোরটা গণবুফে বলে ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেয়া অনেক অভিজাত পুঙ্গব’ এইখানে আসতে সংকোচ বোধ করেন। আভিজাত্যের অসুখে ভোগাদের জন্যে জন্যে নিচে অন্য একটি ফ্লোরে রয়েছে লাঞ্চ ও ডিনারের জন্যে বিশেষ ডাইনিং রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা। (টাইটানিক সিনেমায় যেমনটা দেখা গিয়েছে)। এই রেস্টুরেন্টে খেতে হলে আগে থেকে বুকিং দিতে হয়। কারণ এখানে আসন সংখ্যা সীমিত। তবে প্রবেশাধিকার সকলের জন্যে সমান। কোনো ডিস্ক্রিমিনেশন নেই। এই রেস্টুরেন্টে মুদ্রিত মেনুর বাইরে অর্ডার করলে এক্সট্রা চার্জ করা হবে। এখানে পানি ফ্রি হলেও কোক-ফান্টা ফ্রি নয়। ডেজার্টের একটা আইটেম ফ্রি। এরপরের গুলো পয়সা দিয়ে খেতে হবে।
খুচরো আভিজাত্যের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যে একবার লাঞ্চ ও একবার ডিনার করেছি আমরা এই রেস্টুরেন্টে। এখানকার সেট ম্যেনুর সীমিত খানাখাদ্যে আমার মন ভরেনি। তবে এই রেস্টুরেন্টে খাবার সার্ভ করা একটা টিঙটিঙে ছেলের সঙ্গে আমার খুব খাতির হয়ে গেলো মুহূর্তেই। আমি বাড়তি কোনো খাবার এমন কি কোকাকোলা অর্ডার না করলেও সে নিজের থেকে সেগুলো সার্ভ করছিলো আমাদের টেবিলে। কাহিনি কি জিজ্ঞেস করাতে হাসিমুখে সেই তরুণ বলেছিলো–তোমাদের দু’জনকে কেনো যেনো খুব আপন আপন লাগছে। তোমরা নিশ্চয়ই এশিয়ান? বলেছিলাম–ঠিক ধরেছো। আমার মূল দেশটার নাম বাংলাদেশ তবে আমি এই ক্রুজে এসেছি কানাডা থেকে। তরুণের নাম সুনীল। সে ভারতীয়। বয়েস ত্রিশের নিচে। ওর কাছেই জেনেছিলাম–এই ক্রুজের শুধুমাত্র ফুড ডিপার্টমেন্টেই কর্মীর সংখ্যা দেড়শোর মতো। এবং সেখানে ভারতীয়দের আধিক্য।
এই জাহাজে এই ধরণের আরো কয়েকটা রেস্টুরেন্ট আছে যেগুলো খানিকটা ছোট্ট পরিসরের, যেখানে খুব নিরিবিলি মুখোমুখি বসে পানাহার করা যায়। ইটালিয়ান ফুড এবং বিখ্যাত ওয়াইন নিয়ে আছে আলাদা ক্যাফে। আছে সুশি বার। আছে কয়েকটা খুব বেশি এক্সপেন্সিভ ক্যাফে যেখানে অতিমাত্রায় ধনাঢ্যরা গিয়ে বসেন টুকটাক এটা সেটা খান। ড্রিংক করেন। এবং প্রচুর ডলার খর্চা করেন।
০৪ > নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে…
ক্রুজের প্রথম দিনের বিকেলটা কেমন ঝিম ধরা ছিলো। হালকার মোড়কে খানিকটা জমাট শীতও ছিলো বাতাসে। সুইমিং পুল এরিয়ায় গিয়ে দেখি শীতের কারণে সাঁতারের দাপাদাপি নেই। এখানে একটা ছোট্ট বার-এ বিয়ার-ওয়াইন-ভদকা-হুইস্কির কেনাবেচা চলছিলো। এই ক্রুজে অফুরান খানাখাদ্যের সঙ্গে আনলিমিটেড মদ্য সরবরাহের একটা প্যাকেজও ছিলো। একদল অদ্ভুত মানুষ এই প্যাকেজ নিয়ে থাকেন।
পুল এরিয়ায় একজন আমুদে ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন হাত বাড়িয়ে। তিনি খানিকটা টলছিলেন ডানে বামে। প্রথমে ভাবলাম ঢেউয়ের তোড়ে জাহাজ কাঁপছে বুঝি। জাহাজ কাঁপলে তো আমার আর শার্লিরও কাঁপার কথা। কিন্তু আমরা তো কাঁপছি না! লক্ষ্য করলাম লোকটার এক হাতে সদ্য খোলা একটা বিয়ারের বোতল। বুঝে গেলাম তিনি হচ্ছেন আনলিমিটেড মদ্য প্যাকেজের যাত্রী। এবং তাঁর ‘নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে’। লোকটাকে পেয়ে আমার খুশি আর ধরে না। তাঁকে পেয়ে আমার উল্লসিত হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তিনি এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। শার্লিকে ইশারা করলেন–আমার এই বন্ধুর সহিত একখানা আলোকচিত্র তুলিয়া দাও তো হে বিউটিফুল লেডি।
আমি খুব মুটিয়ে গেছি। দিন দিন মোটা হচ্ছি তো হচ্ছিই। সেই কারণে ভেতরে ভেতরে খানিকটা চাপা দীর্ঘশ্বাস টের পাই। কিন্তু আনলিমিটেড এই ‘ঝুমবারাবার ঝুম তারাবি’ লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে অতিশয় স্লিম স্লিম অনুভূত হচ্ছিলো! জয় বাবা ফেলুনাথ। তুমি বোঝো নাই ভাইডি, বুঝিবেও না তোমাকে দেখে কেনো আমি এতোটা উল্লসিত ছিলাম সেই বিকেলে! হাহ হাহ হাহ……
০৫ > চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে
বুফে ভোজনালয়ে রাতের ডিনার সেরে চলে গেলাম জাহাজের সর্বোচ্চ তলার টানা ছাদ বারান্দায়। ওখানে ইজি চেয়ারে শুয়ে থেকে আকাশ জুড়ে মেঘ বালিকাদের হুটোপুটি এবং চাঁদের আলোর লুকোচুরি দেখছিলাম। চাঁদের আলো লুটিয়ে পড়ছিলো জলরাশির ওপর। ঢেউয়ের ঝাপটায় চাঁদের আলো টুকরো টুকরো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিলো সমুদ্রের জলরাশির গভীর অতলে।
রবীন্দ্রনাথ এসে জাপটে ধরলেন হালকা শীতের বাতাস হয়ে–চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে/উছলে পড়ে আলো/ও রজনীগন্ধা তোমার/গন্ধ সুধা ঢালো……
০৬ > দ্বীপের নাম কোস্টামায়া
নাগাড়ে দুই দিন জলে ভাসতে ভাসতে স্থলে বা মাটিতে একটু পা রাখার জন্যে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মানুষের এক জীবনের অভ্যস্ততা বলে কথা। শুধু জলে মন ভরে না তার। মাটি চায় সে মাটি।
সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখলাম আমাদের জাহাজ নোঙর ফেলেছে একটা ঘাটে। ব্রেকফাস্ট ইত্যাদির পর সকাল দশটা থেকে যাত্রীরা নামতে পারবেন ল্যান্ড বা ভূমিতে। জায়গাটা মেক্সিকোর একটা দ্বীপ। দ্বীপের নাম COSTA MAYA কোস্টা মায়া। মায়া সভ্যতার নিদর্শন আছে এই দ্বীপে।
আমাদের নোঙর ফেলা কোস্টা মায়া দ্বীপের এই ক্রুজস্পটে বহু ছোট ছোট স্যুভেনির শপ, কয়েকটা রেস্টুরেন্ট ও বার, এবং টাকিলা নামের বিখ্যাত পানীয়র দু’তিনটে দোকান আছে। এখানে ডলফিনের নাচ দেখাটা এই দ্বীপের কয়েক ঘন্টার অতিথিদের কাছে সবচে আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত। আমরা দু’জন জীবনে প্রথম ডলফিনের নৃত্য দেখেছিলাম টোকিওতে, ২০০১ সালে। কোস্টা মায়ায় দেখলাম দ্বিতীয়বার। ডলফিন নামের প্রাণিটা খুবই বুদ্ধিমান এবং দর্শকদের বিনোদিত করতে পটু।
জাহাজ থেকে নেমে ল্যান্ডে পৌঁছুতে একটা দীর্ঘ জেটি পেরোতে হয় যাত্রীদের। অধিকাংশই হেঁটে পার হন এই দুরত্ব। তবে দ্বীপ দেখার আগেই হেঁটে ক্লান্ত হতে চান না যাঁরা তাঁদের জন্যে শাটল কারের ব্যবস্থা আছে। তাও আবার বিনে পয়সায়। চাইলে খুশি হয়ে চালক এবং তাঁর সহকারীকে কিছু বখশিস অবশ্য দিতেও পারেন যাত্রীরা। কোনো বারণ নেই। শার্লির আর্থারাইটিসের সমস্যা আছে পায়ে। আমরা তাই শাটল কার নিলাম।
কোস্টা মায়া দ্বীপটা পুরোটা ঘুরে দেখতে এবং মন ভরে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে ছবি তোলা কম হলো আমার। স্যুভেনির কেনাকাটায় শার্লির আগ্রহ বিপুল। কেনাকাটায় আমার আগ্রহ বরাবরই কম।
বেঁধে দেয়া সময় ফুরিয়ে আসছিলো। জাহাজে ফিরতে হবে। এক পর্যায়ে আমি তাড়া দিচ্ছিলাম শার্লিকে। কিন্তু সে নির্বিকার। সমানে মুগ্ধ হচ্ছে আর ছবি তুলছে। আমার তাড়ায় সে বিরক্ত হচ্ছিলো। এক পর্যায়ে ওকে অপার স্বাধীনতা দিয়ে আমি ফিরে এলাম জাহাজে। এবং জাহাজ কর্মীদের অস্থির করে দিয়ে বেঁধে দেয়া সময়ের শেষ মুহূর্তে শার্লিসহ কয়েকজন যাত্রী ‘শেষ পাড়ানির কড়ি’ হয়ে জাহাজে উঠলেন দয়া করে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ রওনা হলো।
এবারের গন্তব্য মেক্সিকোর অন্য আরেকটি দ্বীপ। নাম COZUMEL কোজুমেল।
০৭ > দ্বীপের নাম কোজুমেল
কোজুমেল-এর বর্ণনায় যাবার আগে দু’টি কথা।
এরমধ্যে একদিন দুপুর না হতেই মোশন সিকনেসে কাবু হয়ে পড়লো শার্লি। আগের রাতে মোশন ট্যাবলেট খেতে ভুলে যাওয়ার মাশুল দিলো সে শুয়ে থেকে। সারাদিন ধরে। একটা দিনের প্রায় পুরোটাই ঘুমালো সে বেঘোরে। সন্ধ্যার স্টেজ শো মিস করলো। খাওয়া মিস করলো রাতের। শো দেখলাম ডিনার করলাম একা একা।
মধ্য রাতে ঘুম ভাঙলো তার প্রচণ্ড ক্ষিদে নিয়ে। নদী আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছিলো তারপর ক্রুজের ম্যাপে আমি দেখেছি পুরো জাহাজের চার পাঁচটা স্পটে দিবারাত্রির সার্ভিস হিশেবে কনফেকশনারী টাইপের দোকান চালু থাকে। শার্লির মতো অসময়ে কারো খিদে চাগাড় দিয়ে উঠলে তাকে ফ্রি খাবার সরবরাহ করে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াশ হিশেবে এই মহৎ প্রকল্প। খুঁজে খুঁজে একটা স্পটে গিয়ে পেয়ে গেলাম গরমা গরম পিজা-কেক আর মাফিনের চালান। সঙ্গে ডেজার্ট আইটেম ফ্রুট পেস্ট্রি। এবং জুস আর চা কফির অফুরান যোগান। ওখানে বসার ব্যবস্থাও রয়েছে। সারাদিনের অভুক্ত শার্লি খেলো প্রায় হালুম হুলুম করে। ইটালিয়ান পিজাই তাকে বাঁচিয়ে দিলো সেই যাত্রা।
এই জাহাজে আরেকটা ব্যবস্থা খুব পছন্দ হলো আমার। সেটা হচ্ছে–সঙ্গী যদি বুফে কিংবা কনফেকশনারীতে গিয়ে খেতে অসমর্থ অনাগ্রহী বা ব্যর্থ হয় কোনো কারণে তাহলে তার জন্যে প্রয়োজনীয় খাবারগুলো সংগ্রহ করে রুমেও নিয়ে আসা যায়। খাওয়া শেষ করে এঁটোঝুটোর প্লেট-পেয়ালা রুমের বাইরে দরোজার পাশে রেখে দিলেই হবে। জাহাজ কর্মীরা সেটা সরিয়ে ফেলবে। দারুণ না!
রোদ ঝলমল এক সকালে আমাদের শিপ এসে ভিড়লো ম্যাক্সিকোর আরেকটা দ্বীপ কোজুমেল-এ। বিকেল চারটা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হলো যাত্রীদের। এর মধ্যে ফিরতে হবে।
খুবই সুন্দর এই কোজুমেল ক্রুজস্পটটা।
এখানকার স্যুভেনির শপগুলোও দুর্দান্ত। স্বশিক্ষিত মেক্সিকান শিল্পীর তুলিতে আঁকা বেড়ালের ছবিঅলা দু’টো মগ কিনলাম নদী আর ডেভিডের জন্যে। আমার জন্যে শার্লি পছন্দ করলো ছোট্ট কিউট একটা লকেট। কালো মোটা সুঁতোয় ঝুলন্ত কালো এইটুকুন একটা বেড়ালছানা। (২০১৯-এর বইমেলায় যেটা আমার গলায় ছিলো সব সময়। টিভি সাক্ষাৎকার এবং বহু স্থিরচিত্রে আমার সঙ্গে এই বিল্লিটাকেও দেখা গেছে!)
০৮ টাকিলা রে টাকিলা কেনো মোরে ডাকিলা?…
টাকিলা TEQUILA একটা জগৎ বিখ্যাত মদ্য যার জন্মস্থান মেক্সিকো। ইংরেজি বানানে উচ্চারণ টেকিলা হলেও বাংলাদেশে ইহাকে আমরা টাকিলা বলে থাকি! মেক্সিকান দোকানিও টেকিলা উচ্চারণ করছিলো।
বাংলাদেশে কয় রকমের টাকিলা পাওয়া যায়? কোস্টা মায়া এবং কোজুমেলে টাকিলার আট দশ রকমের ভ্যারাইটি দেখে এবং নানান সাইজ ও ডিজাইনের বোতল দেখে আমার তো মাথা খারাপ দশা!
ঢাকায় KAHLUA ছাড়াও আরো একটা দু’টো টাকিলার নাম দেখেছি কিন্তু কোজুমেলের টাকিলার কয়েকটা ছোট্ট দোকানে ঢুকে আমি তো রীতিমতো বিস্মিত! এতো কিসিমেরও হয় টাকিলা! একেকটা টাকিলার রঙ ভিন্ন। বোতলের আকার আকৃতি ও সাইজও ভিন্ন। মিনিয়েচারও আছে হরেক প্রকারের। (প্রীতিভাজন আর্টিস্ট ধ্রুবর পছন্দের কথা ভেবে ওর জন্যে কয়েকটা বগলদাবা করা হইয়েছিলো। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছে জিনিসগুলো ওর পর্যন্ত যাওয়ার আগেই আরেক প্রীতিভাজন সেগুলো ছিনতাই করে ফেলেছিলো!)
কোজুমেলে ঘুরন্তি আর কেনন্তি করতে করতে সহসা চোখে পড়লো একটা মাঝারি পাকা বিল্ডিং-এর দিকে। ওখানে ঝোলানো সাইনবোর্ডে লেখা TEQUILA MUSEUM টাকিলা মিউজিয়াম! আরে কী দারুণ ঘটনা! টাকিলারও মিউজিয়াম হয়! হতেই হবে। মেক্সিকোর এই দুর্দান্ত জিনিসটা পৃথিবীব্যাপি বিপুল ভাবে মদারুনন্দিত যে!
মিউজিয়ামের মূল ফটকের দু’পাশে দু’টো ভাস্কর্য। ভাস্কর্য দু’টোও মারাত্মক ইন্টারেস্টিং!
প্রথমটায় বড় একটা হ্যাট মাথায় নীল প্যান্ট লাল শার্ট পরা ইয়া গুম্ফধারীর, যাঁর এক হাতে একটা টাকিলার বোতল অন্য হাতে ধরা মোটা চুরুট, যেটা তিনি ফুঁকছেন! কালো জুতো পরা লোকটা তাঁর একটা পা রেখেছেন মানুষের মাথার একটা খুলির ওপরে!
বলাই বাহুল্য, ভাস্কর্যের দেহভঙ্গিই বলে দিচ্ছে টাকিলার প্রভাবে মানুষটার অবস্থা ‘ঝুম বারাবার ঝুম তারাবি ঝুম বারাবার ঝুম’…। এই মদারুকে খুব পছন্দ হলো শার্লির। ওর সঙ্গে একটা ক্লোজ শটের ছবি তুলে দিলাম শার্লিকে।
প্রতিদানে শার্লি লংশটে দুই মদারুভাস্কর্য এবং সাইনবোর্ড সমেত টাকিলা মিউজিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার একটা ছবিও তুলে দিলো সে। আমি দাঁড়িয়েছিলাম দ্বিতীয় ভাস্কর্যের সঙ্গে। এই ভাস্কর্যটা মাথায় চমৎকার হ্যাট পরা একটা নারীর। যাঁর এক হাতে সরু লম্বা একটা টাকিলার বোতল। আগের ভাস্কর্যটা একটা পা রেখেছিলেন মানুষের মাথার খুলির ওপরে কিন্তু এই নারী ভাস্কর্যের মাথাটাই একটা খুলি বা কংকাল! শুধু তাই নয়, এই নারীর বুকের পাঁজরের কংকালগুলোও দৃশ্যমান হয়ে আছে লো কাট কামিজের কারণে!
ভাস্কর্য দু’টো ট্যুরিস্টদের যে উপদেশ দিচ্ছে সেটা মনে হয় এরকম–ওহে পাবলিক তোমরা টাকিলা খাইও কিন্তু মাত্রা ছাড়াইয়া যাইও না। তাহা হইলে পরিণাম হইবে এই……।
০৯ > মেক্সিকোতে কবি বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা!
কোজুমেল দ্বীপের বেষ্টনি পেরিয়ে ডাউন টাউনে যাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা আছে। বাস কিংবা টেক্সিতে করে যাওয়া যায়। আমি আর শার্লি টেক্সিটাই প্রেফার করলাম। এখানে ভাড়ায় পাওয়া যায় শাদা টেক্সি। গাইড আমাদের জানিয়ে রেখেছেন এই টেক্সি ড্রাইভাররা খুবই বিশ্বস্ত। তোমরা ভয় পাইও না। তাহারা কোনোই ক্ষতির কারণ হইবে না কোনো ট্যুরিস্টের। তাহাদিগের ওপরে বিশ্বাস রাখিও।
একজন মাঝ বয়েসী হাসিখুশি ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বললাম। ড্রাইভার জানালেন–ডাউন টাউন খুব একটা দূরে নহে। যাইতে বড়জোর মিনিট দশেক লাগিবে। ভাড়া পড়িবে ১১ ডলার।
আমি বললাম–চলুন। আমাকে এমন একটা জায়গায় নামাইবেন যেইখানে গেলে আমার মেক্সিকো সিটি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা হইবে।
তিনি বললেন–সেনর, (মানে সিনিয়র বা রেস্পেক্টেড), ইহা একটি টাইনি সিটি। মেক্সিকো সিটি সে তো দুর্দান্ত শহর। কোজুমেল দ্বীপের পাশবর্তী এই ক্ষুদ্র শহরটিকে তোমরা মূল মেক্সিকো সিটির অতিসামান্য একটা নমুনা বলিতে পারো। তবে কিছুটা ফ্লেভার তো পাইবেই পাইবে।
তিনি আমাকে একটি জায়গায় নামিয়ে বললেন–সেনর তুমি কতোক্ষণ থাকিবে এইখানে?
আমি বললাম, তা বলতে পারি না। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করিবো। দোকানপাট মানুষজন দেখিবো। বিল্ডিং দেখিবো। গাছপালা দেখিবো।
তিনি বললেন, আবার তো জাহাজেই ফিরিবে তাই না? তাহা হইলে তুমি ঘুরিয়া ফিরিয়া এইখানেই আসিও। তুমি না আসা পর্যন্ত আমি তোমার অপেক্ষায় থাকিবো।
সমুদ্র তীর ঘেঁষা শহরট চমৎকার ছিমছাম। ছোট ছোট বিল্ডিং। প্রচুর নারকেল গাছ। এখানকার নারী পুরুষদের অধিকাংশই মোটামুটি মোটাসোটা। আমি আর শার্লি হাঁটছি। শার্লি মাঝে মধ্যেই দোকানে ঢুকে পড়ছে। শোপিস এটা সেটা দেখছে দরদাম করছে। আর আমি দেখছি মানুষ। দোকানের ভেতরের মানুষ। পথে হেঁটে চলা মানুষ। মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে।
হঠাৎ দেখি ফুটপাত ধরে আমার দিকে হেঁটে আসছেন বেলাল চৌধুরী। কবি বেলাল চৌধুরী। পাকা গমের ঔজ্জ্বল্য তাঁর চেহারা জুড়ে। মুখে চিরচেনা সেই হাসি। পরনে চক্রাবক্রা রঙিন হাফ হাওয়াই শার্ট। ছোট করে ছাঁটা মাথার চুলগুলো। বিস্মিত আমি একটা হাত আমি এগিয়ে দিলাম ভদ্রলোকের দিকে–হ্যালো সেনর।
আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে করতে খানিকটা বিস্মিত ভদ্রলোক শুধু বললেন–হ্যাল্লোওওও।
আমি বললাম, তোমার সহিত মোলাকাত করিয়া আমি যারপরনাই খুশি। আমি বাংলাদেশ হইতে আসিয়াছি। বাংলাদেশে আমার একজন কবিবন্ধু ছিলেন দেখিতে অবিকল তোমারই মতো! তোমাকে দেখিয়া আমি বিস্মিত এবং হতবাক হইয়াছি বন্ধু!
ও ওয়াও! পৃথিবী বড়ই বিচিত্র, এক এক চেহারার দুইটি মানুষ দুইটি দেশের! বলতে বলতে একটা অপূর্ব হাসিতে উদ্ভাসিত মানুষটা চলে গেলেন আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে। ঠিক যেভাবে আমার কাছ থেকে বিদায় নিতেন বেলাল ভাই, কবি বেলাল চৌধুরী!
না এটা আমার কোনো ক্ষণিকের বিভ্রম ছিলো না। (বেলাল ভাইয়ের মৃত্যুর পর ফেসবুকে প্রকাশিত আমার স্মৃতিগদ্যেও ঘটনাটা লিখেছিলাম।)
সত্যি, পৃথিবীটা আসলেই একটা বিচিত্র জায়গা!
১০ > ভাসমান একটা জাহাজে প্রতিদিন রচিত হচ্ছে কতো না গল্প!
থিয়েটার হলে পাঁচদিনে বেশ কিছু মুভি-ডকুমেন্টারি-টম এন্ড জেরি-স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো সহ অসাধারণ কিছু কালচারাল শো দেখা হলো। ডান্সিং ফ্লোরে দেখা হলো দুর্দান্ত কিছু নাচ আর বাদ্য বাজনার সমন্বয়ে নানান দেশের নারী পুরুষের ছন্দোময় উচ্ছ্বাস।
ফটোগ্যালারি নামের একটা কর্ণারে গিয়ে তো মাথা খারাপ অবস্থা। প্রতিদিন যাত্রীদের নানান এক্টিভিটিস কয়েকজন ফটোগ্রাফার বিরামহীন ক্যামেরাবন্দী করেন। তবে লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই। আমার আর শার্লির কিছু ছবিও দেখলাম ঝুলছে প্রদর্শনীতে। ছবির নিচে নাম্বার লেখা। সেটা টুকে নিয়ে কাউন্টারে পেমেন্ট করলে পরদিন ছবি পৌঁছে দেবেন তাঁরা। তবে চার্জ একটু বেশিই করবেন। আমরা নিয়েছিলাম দু’টো ছবি।
আর্ট গ্যালারিতে কিছু পেইন্টিং রাখা আছে। পছন্দ হলে কিনতে পারবেন যাত্রীরা। কেউ কেউ কিনেছেনও দেখলাম।
পাঁচদিনের ট্রিপে একটা জাহাজের চৌহদ্দির ভেতর কতো বিচিত্র মানুষই না দেখলাম!
একটা কাপলকে দেখে মনে হলো বাড়িতে তাঁরা খুব একটা সময় পান না। তাই ঠিক মতো ঝগড়াটাও করা হয়ে ওঠে না। পাশাপাশি চেয়ারে কিংবা হেলান দেয়া ইজি চেয়ারে বসে থাকেন তাঁরা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেন না। কেউ কারো দিকে তাকান না। হাসেন না। এই কাপলটাকে প্রতিদিন দেখে দেখে আমার মনে হয়েছে শুধুমাত্র ঝগড়া করার জন্যেই তাঁরা এসেছেন ক্রুজে।
একদিন বুফে লাঞ্চের এক পর্যায়ে কোক আর অরেঞ্জের রিফিল নেয়ার জন্যে শূন্য গ্লাস দু’টো নিয়ে ড্রিংক কর্ণারে গিয়েছি। খেয়াল করলাম কম বয়েসী সদ্যতরুণ একটা ছেলে আমাদের টেবিলে এসে শার্লির সঙ্গে খুব হাসিহাসি মুখে কথা বলছে। পার্স খুলে শার্লি কিছু একটা গুঁজে দিলো ছেলেটার হাতে। আমি আসার আগেই ছেলেটা কার ডাকে যেনো ছুটে চলে গেলো। আরেকদিন আমার উপস্থিতিতেই ছেলেটা হাসিমুখে এগিয়ে এলো আমাদের টেবিলে। ওর হাতে একটা হাফপ্লেট। প্লেটভর্তি দু’টো ডেজার্ট আইটেম। শার্লির জন্যে সে নিয়ে এসেছে। শার্লিও দেখলাম খুব খুশি হয়ে ডেজার্টটা নিলো। এবং পার্স থেকে কিছু ডলার নিয়ে ছেলেটার হাতে গুঁজে দিলো। ছেলেটাও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেই ডলার নিজের পকেটে রেখে দিলো। শার্লি আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ছেলেটাকে বললো–এই যে এই লোকটাই আমার স্বামীরত্ন। আর ছেলেটার পরিচয়ে বললো–ও এই ক্রুজের ফুড টিমে আছে। চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়েসী ছেলেটা আমার সঙ্গে মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে হ্যান্ডশেক করলো–নাইস টু মিট ইউ।
আমি বললাম–নাইস টু মিট ইউ টুও।
ছেলেটা চলে যাবার পর শার্লি কী রকম উদাস হয়ে গেলো–ওকে দেখলেই আমার শাম্মীর কথা মনে হয়। (শাম্মী শার্লির ছোট ভাই। জার্মানিতে থাকে।) ইস এই বয়েসী একটা ছেলে কীনা পরিবার পরিজন ছেড়ে সমুদ্রে সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে মাসের পর মাস কিছু টাকা রোজগারের কারণে! ওর জায়গায় তো শাম্মীও হতে পারতো!
আমরা কানাডায় আসার পর পর ২০০২ সালের দিকে একবার শাম্মী নামের এই ছোটভাইটাকে নিয়ে শার্লির অতিরিক্ত আদিখ্যেতা দেখে সামান্য একটু রসিকতা করেছিলাম আমি। আমার রসিকতায় কী রকম ডুকরে কেঁদে উঠেছিলো শার্লি–জানিস তুই ওকে আমি গোসল করিয়ে দিতাম? চুল আঁচড়ে দিতাম, গায়ে পাউডার মাখিয়ে দিতাম? আমার কোলে কোলেই তো বড় হলো শাম্মী! কিন্তু তোর কারণে চিরদিনের জন্যে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি বলে আমার আদর থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে শাম্মীকে!
অনেক সরিটরি বলে সে যাত্রা পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলাম। এরপর একাধিকবার শাম্মী এসেছে অটোয়ায় ওর বোনের কাছে। শার্লিও আমাকে অটোয়ায় রেখে একা একা একাধিকবার ছুটে গেছে প্রিয় ছোটভাইটার কাছে জার্মানিতে। ভাইবোনের এই ভালোবাসার মাঝখানে আমি তাই কোনোরকম ঝামেলা পাকাই না। কাবাব মে হাড্ডি হই না। ক্রুজের কম বয়েসী খাদ্যকর্মীর মাঝে নিজের ছোটভাইটার ছায়া দেখে শার্লি ফের ভ্রাতৃপ্রেমে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। আর তাই ছেলেটার সঙ্গে দেখা হলেই ওর সঙ্গে কথা-টথা বলে হাতে ক’টা ডলার সে গুঁজে দিতে চায়। ছেলেটাও প্রয়োজন নেই জেনেও শার্লির জন্যে নিয়ে আসে একটা দু’টো ডেজার্ট আইটেম!
বাঙালির ঘরে ঘরে অপু-দুর্গার অপরূপ ভালোবাসার গল্প রচিত হয়েছে যুগে যুগে।
দিনে দিনে বর্ণ-ধর্ম এবং জাতীয়তা নির্বিশেষে ভাইবোনের গল্পটা ভিন্ন অবয়ব পেয়েছে, পেরিয়েছে আন্তর্জাতিক সীমানাও।
১১ > গার্সিয়া চেনে না মার্কেজকে!
বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক আমাদের রুম কীপার বা হাউস কীপার। সকালে আমরা বেরিয়ে গেলে রোজ প্রতিদিন তিনি আমাদের কক্ষটা ঝকঝকে চকচকে করেন। বিছানার চাদর পালটে দেন। পুরনো টাওয়েল পালটে দেন। শাওয়ার স্পেস টয়লেট সবকিছু পরিচ্ছন্ন করেন। টাওয়েল নিয়ে এই মানুষটার অদ্ভুত একটা স্কিল লক্ষ্য করেছি প্রথম দিনেই যেদিন তিনি আমার সঙ্গে পরিচিত হতে এসে বলেছিলেন–আমার নাম গার্সিয়া। এই ডেক-এ আমি তোমাদের দেখাশুনা করিবার দায়িত্বপ্রাপ্ত। তোমরা অবশ্যই বাইরে বেরুবার সময় কক্ষ লক করিয়া যাইবে। তোমাদের অনুপস্থিতিতে আমি তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করিবো মাস্টার কী দিয়া। বিছানা বালিশ চাদর পাল্টাইয়া দিবো। নতুন টাওয়েল ঝুলাইয়া যাইবো এবং প্রতিদিনকার অনুষ্ঠানসূচি বা ইভেন্ট মুদ্রিত লিফলেটসমূহ তোমাদের বিছানায় রাখিয়া যাইবো। তবে নিশ্চিন্ত থাকিও তোমাদের কোনো জিনিস খোয়া যাইবে না। কিছু লাগিলে আমাকে বলিও।
আমি তাঁর কাছে এক্সট্রা দু’টো বড় এবং দু’টো ছোটো টাওয়েল চেয়েছিলাম। তিনি তক্ষুণি সেটা নিয়ে এসেছিলেন। এবং পরবর্তী প্রতিদিন তিনি এই যোগান অব্যাহত রেখেছিলেন।
জিজ্ঞেস করেছিলাম এই যে আমাদের বিছানায় টাওয়েল দিয়ে দু’টো হাঁস বানিয়ে রাখা এটা কার কাজ? কে করেছেন চমৎকার এই শিল্পকর্মটি?
খানিকটা লজ্জিত ভঙ্গিতে হাস্যোজ্জ্বল গার্সিয়া বলেছিলেন–ইহা আমারই কর্ম। তোমার পছন্দ হইয়াছে?
আমি বলেছিলাম, তুমি হইতেছো একজন প্রতিভাবান শিল্পী। আমি অভিভূত।
এরপর একটা দশ ডলারের নোট আমি তাঁর হাতে গুঁজে দিয়েছিলাম। তিনি সহাস্যে বিনয়ী ভঙ্গিতে সেটা গ্রহণ করেছিলেন।
শেষ দিনে যেদিন আমি বিদায় নিচ্ছি তিনি এলেন দরোজার সামনে রাখা আমাদের লাগেজগুলো বুঝে নিতে।
বললেন–এইগুলি তোমরা মেইন কাউন্টারে পাইবে। রুম নাম্বার বলিলেই কর্মীরা লাগেজগুলো তোমাদের বুঝাইয়া দিবে। ভালো থাকিও তোমরা। তোমাকে অতিথিরূপে পাইয়া খুব খুশি ছিলাম আমি।
তাঁকে কুড়ি ডলারের একটা নোট হাতে গুঁজে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম–আচ্ছা গার্সিয়া তুমি কি জানো তোমার নামে নাম–গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ নামে একজন জগৎ বিখ্যাত লেখক আছেন? এবং তিনি নোবেল লরিয়েট?
চিনি বলে গার্সিয়া এমন ভাবে মাথা নাড়ালেন যে তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজেই আমি বুঝে গেলাম তিনি আসলে চেনেন না।
হাহ হাহ হা গার্সিয়া চেনে না মার্কেজকে! জগৎ বড়ই রহস্যময়!
১২ > সমাপনী উৎসবে নতুন উপলব্ধি
আমাদের রয়াল ক্যারিবিয়ান ক্রুজ ‘ভিশন অব দা সীস’-এর পাঁচদিনের এই জলযাত্রায় আমেরিকা-কানাডা-রাশিয়া,উরুগুয়ে, ব্রাজিল, কলাম্বিয়া, অস্ট্রিয়া, ইটালি, জেমাইকা, আর্জেন্টিনা, রোমানিয়া,পানামা, ইউকে, তুর্কি, মেক্সিকো, স্কটল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেন, চায়না, ইন্ডিয়াসহ বহু দেশের নাগরিকই শামিল হয়েছিলেন। প্রায় দু’হাজার যাত্রীর মধ্যে আমি আর শার্লিই ছিলাম সবেধন নীলমনি–বাংলাদেশের।
শেষ দিনের সমাপনী রাত্রির শ্যাম্পেইন খুলে উন্মাতাল নৃত্য গীত বাদ্যি বাজনার আনন্দ উল্লাসের আলো ঝলমল উৎসবের এক পর্যায়ে স্টেজের উঁচু বেদিতে বিভিন্ন দেশের পতাকা স্ট্যান্ড হাতে নারী পুরুষের আগমন দৃশ্য অন্যরকম একটা আবহ তৈরি করলো। মাইক্রোফোনে ঘোষিত হচ্ছে এই শিপের এবারের জলযাত্রায় অংশ নেয়া একেকটা দেশের নাম আর সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে একেকজন যাত্রী স্ট্যান্ডে ঝোলানো সেই দেশের পতাকাটি নাড়াতে নাড়াতে উঁচু বেদির সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন। আমি জানি ওখানে আমার বাংলাদেশের পতাকাটি উড়বে না আজ। কারণ বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী কোনো অতিথি এখানে নেই। যে দু’জন আছেন দুর্ভাগ্যক্রমে তারা অন্য একটি দেশের পাসপোর্ট নিয়ে এসেছেন। বোর্ডিং পাস অনুযায়ী যে যে দেশের নাগরিকরা এখানে তালিকাবদ্ধ শুধু সেই দেশের পতাকাই উড়বে আজ। মন খারাপ করে বসে আছি আমি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মন খারাপের মাত্রাটা আরো বেড়ে গেলো। এখানে বহু দেশের পতাকা উড়লেও কানাডার পতাকাটা এখনো উড়ছে না। নিজেকে কী রকম শূন্য মনে হলো। নিজেকে নো ম্যান্স ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দুখি মানুষ বলে মনে হলো। এরকম মন খারাপ হওয়ার মুহূর্তে কানাডার নাম ঘোষণা শুনে এবং কানাডিয়ান ফ্ল্যাগ ওড়াতে ওড়াতে একজনকে এগিয়ে আসতে দেখে কী রকম প্রসন্ন হয়ে উঠলাম। শার্লি আর আমি দু’জনেই তুমুল করতালিতে মুখর হয়ে উঠলাম একযোগে।
ক্রুজের সমাপনী অনুষ্ঠানে আমার মন খারাপ হওয়া এবং প্রসন্ন হওয়ার ব্যাপারটা নতুন একটা উপলব্ধি দিয়েছে আমাকে। উপলব্ধিটা এরকম–জগতের প্রাণিদের বেঁচে থাকার জন্যে শুধু খাদ্য এবং সঙ্গী হলেই চলে। কিন্তু প্রাণিদের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই কেবল–খাদ্য এবং সঙ্গীর সঙ্গে একটা দেশও লাগে!
অটোয়া ০৫ জুলাই ২০২১

ছড়িয়ে দিন