ঢাকা ১৮ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১১ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


খাদ্যভেজাল প্রতিরোধ কার্যক্রমে পরিদর্শক সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন

redtimes.com,bd
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯, ১১:১৩ অপরাহ্ণ
খাদ্যভেজাল প্রতিরোধ কার্যক্রমে পরিদর্শক সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন

  • এম. খছরু চৌধুরী
    বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) গঠনের আগে ২০১৪ সাল সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫৫৬ জন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ৮৩ জন স্যানিটারী ইন্সপেক্টর-সহ কোনো-কেনো পৌরসভা ও সিটিকর্পোরেশন নিয়োজিত স্যানিটারী ইন্সপেক্টরশীপ-সনদ-বিহীন জনবল দিয়ে খাদ্যস্থাপনা পরিদর্শন, নিবন্ধন, প্রিমিসেস লাইসেন্স, ফুডহেন্ডলারদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ইত্যাদি বিষয়াদি সম্পাদন করা হতো। একই ধরনের কাজে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমের অধীনেও ১০ বা ১২ জন স্যানিটারী ইন্সপেক্টরের পদ রয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের স্বার্থে এই অঞ্চলে ১৮৬৪ সালে বৃটিশ সরকারের হাত ধরে খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণ কাজের গোড়াপত্তন হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে কাজটি সম্পাদন হতো বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ- ১৯৫৯ ও বিশুদ্ধ খাদ্য বিধি- ১৯৬৭’র অধীনে। খাদ্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ রাখার প্রয়োজনে দেশে খাদ্য বিষয়ক ৫০ এর অধিক আইন-বিধির উপস্থিতি পরিলক্ষিত হলেও এর প্রয়োগ প্রক্রিয়া দৃশ্যমান ছিলনা।
    ১৯৭৫ সালের শোকাবহ ট্র্যাজেডির পর প্রয়োজন থাকা সত্তেও, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট ২’শতাধিক রোগের প্রতিরোধে নিয়োজিত স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের পদের সংখ্যা আর বাড়ায়নি। সিটিকর্পোরেশন ও পৌরসভা গুলোর সেবা বিতরণ কার্যক্রমে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর ও খাদ্যভেজাল প্রতিরোধে প্রত্যাশিত মনোযোগও পরিলক্ষিত হয়নি। বিদ্যমান বাস্তবতায় খাদ্যভেজালের পরিধি, ধরন-ধারণ, ভেজালকারীর সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়। খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট অসুখও বাড়তে থাকে জ্যামিতিক হারে! ক্যান্সার, কিডনি রোগ-সহ ভেজাল খাদ্য-সৃষ্ট অন্যান্য রোগের ব্যয়-বহুল চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ব্যাপক মানুষ দিশেহারা হতে থাকেন! মানব-সৃষ্ট এই অনাকাংখিত মানবিক-বিপর্যয় ঠেকাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বীয় আন্তরিকতায় প্রণয়ন করা হয় নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩। আইনের ৫১ ধারায় নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক তথা স্যানিটারী ইন্সপেক্টর নিয়োগের বিধান রেখে রহিত করা হয় বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ- ১৯৫৯ এবং খাদ্য ভেজালের প্রতিরোধে গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)।
    বিএফএসএ ২০১৫ সালের ২’রা ফেব্রুয়ারি ভেজাল নিয়ন্ত্রণ কাজের দায়িত্ব নিয়ে বাণিজ্যিক খাদ্য স্থাপনা পরিদর্শন কাজের জনবল বাড়ানোর পরিবর্তে আরও কমিয়ে দিলেন(?)। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৪৩ জন পরিদর্শককে দেশের ২৫ লাখ বাণিজ্যিক খাদ্য স্থাপনা পরিদর্শনের দায়িত্ব দিলেন! দুই বছর এভাবে চলার পর, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে সবমিলিয়ে জগাখিচুরি পন্থায় ৬৬৯ জন পরিদর্শককে বিএফএসএ এর কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এখনও সরকারের হাজার কোটি টাকা ব্যয়-বিনিয়োগে খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণ কাজের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরও ১৬০০ স্যানিটারী ইন্সপেক্টরকে কাজে লাগানো হয়নি(?)। সারে-চার বছর পেরিয়ে গেলেও কিভাবে বা কোন পদ্ধতিতে ভেজালের লাগাম টেনে ধরবেন, কর্তৃপক্ষের তরফে উহারও কোন দিক-নির্দেশনা নেই। বিগত ৫ বছরের আগের চেয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ! ভেজালে-ভেজালে সয়লাব সারা দেশ! ভেজাল যেন দানবরূপে আবির্ভূত হয়েছে এই বাংলায়! কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ ও নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন, ভেজাল নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা আমদানি করতে ঘন-ঘন বিদেশ ভ্রমণে যান। মাঝে-মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গবেষক-বিজ্ঞানীর মত তথ্য দেন! জনমনে আতংক আরোও বাড়ে! তবে কি, ভেজালের দানবীয় আক্রমণ থেকে এই জাতির মুক্তি নেই? ভেজালের নিয়ন্ত্রণ কি অসম্ভব? মোটেও সেরকম নয়। কর্তৃপক্ষের কার্যকর. বাস্তব ও বিজ্ঞান সম্মত পরিকল্পনার অভাবে পরিস্থিতি এমন অবনতি হয়েছে!
    যে কোন বড় কাজের পরিকল্পনায় প্রথমেই কোয়ালিটির প্রত্যাশা ভালো সংগঠন, সংগঠক বা ম্যানেজারের বৈশিষ্ট্য নয়। কাজটি শুরু করতে হয় কোয়ান্টিটি দিয়ে। কাজের গুণগত মানের উন্নয়ন করতে হয় ধীরে ধীরে ও কাজের ধারাবাহিকতা দিয়ে। বিএফএসএ যদি প্রথমেই তার কর্মপদ্ধতি ও কর্ম-পরিকল্পনার মধ্যে – পরিদর্শকদের কর্মএলাকা নির্দিষ্ট করে দেশের ২৫ লাখ খাদ্যস্থাপনা’র নিবন্ধন ও ২৪ ঘন্টা নজরদারির জন্য কি পরিমাণ পরিদর্শক প্রয়োজন; এই সংখ্যাটা নির্ধারণ করতেন; তাহলে, পরিস্থিতি এতটা অসহনীয় হতোনা! বিএফএসএ নামের কর্তৃপক্ষের উচ্চ-পর্যায়ের কর্তা-ব্যক্তি দেশ-বিদেশ ঘুরে নিশ্চয়ই এই ধরণের কাজ সম্পাদনের একটা অভিজ্ঞতা পেয়েয়েছেন এবং তা’ হলো কাজের মৌলিক জনবল (পরিদর্শক) নির্ধারণ করা ও বাস্তবতার নিরিখে তাদের কর্মএলাকা বিভাজন করা। আমেরিকার এফডিএ কিংবা অন্যান্য দেশের এই ধরণের অথরিটিতে “পরিদর্শক” পদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু, আমদের এখানে বিএফএসএ এর কার্যক্রমের শুরু থেকেই এর একটা বিপরীত মুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। নিরাপদ খাদ্য আইনের “নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকের” পদ-সৃজন ও কর্মএলাকা বিভাজনপূর্বক পরিদর্শকের সংখ্যা নির্ধারণের আগেই “জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার” নামে ৬৪ জন আমলার পদ সৃজন করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩ ও ১৯৬৭’র বিশুদ্ধ খাদ্য-বিধি মোতাবেক (যে বিধিটি এখনও কার্যকর) স্বাস্থ্য বিভাগের ৬৪ জন “জেলা স্যানিটারী ইন্সপেক্টরকে” জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব অর্পনের পর এরকম পদ-সৃজনের যৌক্তিকতা কি, তা’ আমার মগজে ঢোকে না! ভেজাল নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিএফএসএ এর এই বিতর্কিত কার্যক্রমগুলো কার্যত: মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ও জন-আকাংখার বিপরীতে চলে যাচ্ছে! এখনোও সময় আছে, পরিস্থিতি উন্নয়নের। খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণে স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদ (স্বাসেপ) বিএফএসএ এর পরিদর্শক পর্যায়ের জনবল-কাঠামোয় যে পরিমাণ পরিদর্শক নিয়োগ বা পদায়নের প্রস্তাবনা দিয়েছেন তা বিবেচনা করা উচিত। প্রস্তাবনাটি নি¤œরূপ:-
    মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাস ভবন-বঙ্গ ভবন-কার্যালয়ে ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য ০৪ জন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-বাস ভবন-গণভবনে ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য ০৪ জন, মহামান্য হাইকোর্টের খাদ্যস্থাপনা তদারকির জন্য ০১ জন, ৩ টি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য ১৪ জন, ২ টি আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দরে ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য ০৮ জন, বাংলাদেশ সচিবালয় এর জন্য ০২ জন, জাতীয় সংসদ ভবন এর জন্য ০২ জন, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও জাতীয় নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষাগারে ০৪ জন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় দপ্তর এর জন্য ০২ জন, ১২ টি সিটি কর্পোরেশনের ৪৬৪ ওয়ার্ডের জন্য ৪৬৪ জন, ৩২৯ পৌর সভায় ঃ- ‘ক’- শ্রেণী ১৭৭ * ৩ = ৫৩১ জন, ‘খ’- শ্রেণী ১০৯ * ২ = ২১৮ জন, ‘গ’- শ্রেণী ৪৩ * ১ = ৪৩ জন, ৪৫৫৩ টি ইউনিয়নের জন্য ৪৫৫৩ জন, আইসিডিডিআরবি- ঢাকা ০২ জন, ইসিডিআর- ঢাকা ০২জন, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান- ঢাকা ০২ জন, জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউট- ঢাকা ০১ জন, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসাপাতাল- ঢাকা ০১ জন, ১৩ টি স্থল বন্দরের জন্য ১৩ জন, ২৫ টি সেনানিবাস এলাকার জন্য ২৫ জন, ১০০-২৫০ শয্যার হাসপাতাল (৪৭ টি জেলা সদরে) এর জন্য ৪৭ জন, সরকারী-প্রাইভেট-সামরিক-মেডিকেল-কলেজ ৭১ টির জন্য ৭১ জন, স্কয়ার, ইউনাইটেড, ল্যাবএইড, ডেল্টা, এ্যাপোলো এর মত বিশেষায়িত/আধুনিক প্রাঃ হাসপাতালের জন্য ০৫ জন, ৪৯২ টি উপজেলায় “উপজেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক” পদে ৪৯২ জন, ৬৪ টি জেলা নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক পদে ৬৪ জন। এরূপ জনবল কাঠামোর ধারণা বাস্তবায়নে মোট পরিদর্শক প্রয়োজন হবে ৬৬৯৫ জনের। স্যানিটারী ইন্সপেক্টর/নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক পদায়নে এই জনবল প্রস্তাবনার ধারণাপত্র ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন-চিত্রের আলোকে তৈরী করা হয়েছে। ভেজাল প্রতিরোধ ও খাদ্য-স্বাস্থ্যের উন্নয়নে পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখিত পরিমাণ পরিদর্শক নিয়োগ দেবার প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে, জরুরী ভিত্তিতে প্রতি ০৩ ইউনিয়ন এবং সিটি-কর্পোরেশনের প্রতি ০৩ ওয়ার্ডের বিপরীতে ০১ জন ও অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অতি-প্রয়োজনীয় সংখ্যায় অর্থাৎ, সাকুল্যে ২২৮৮ জন পরিদর্শক নিয়োগ বা পদায়নের মাধ্যমে সারা দেশে একযোগে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনার বিকল্প নাই।
    নিরাপদ খাদ্য ভাবনা, খাদ্যভেজাল প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর হলেন আদি ও বুনিয়াদি জনবল। ভেজালের গতি-প্রকৃতি, উৎস ও ইহার লাভ ভোগী শ্রেণির মানসিকতা সম্পর্কে একজন দক্ষ স্যানিটারিয়ানের অভিজ্ঞতার ইতিহাস প্রাচীন এবং তথ্য সমৃদদ্ধ। ভেজাল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণ সমূহ তাদের দর্পনে। অতএব, মাঠ-পর্যায়ের জনবল কাঠামোতে তাদের এই প্রস্তবানা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দেশের সকল বাণিজ্যিক খাদ্যস্থাপনার নিবন্ধন-সহ ২৪ ঘন্টার নজরদারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন; তাহলে, ২ – ৩ বছরের মধ্যে ভেজালের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতের মুঠোয় চলে আসবে এবং খাদ্য স্থাপনার প্রিমিসেস ফি-বাবত বছরে সরকারের রেভিনিউ আয় হতে পারে ৩০০ – ৫০০ কোটি টাকা। (১৭/৯/১৯)

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031