খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনী কাঠামো প্রণয়ন জরুরি

প্রকাশিত: ২:০৭ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০১৮

খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনী কাঠামো প্রণয়ন জরুরি

বর্তমানে দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ আসছে কৃষি খাত থেকে । এর মধ্যে শস্য খাতের অবদান ১৩ শতাংশ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যত অর্জন আছে, তার মধ্যে কৃষি খাতে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ‘টেকসই কৃষি ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠিত হলে সকল মানুষের খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রধান শর্ত পূরণ হবে। এজন্য প্রয়োজন, কৃষিখাতে স্বয়ম্ভরতার পাশাপাশি খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনী কাঠামো প্রণয়ন। ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ২২ মে, ২০১৮ তারিখে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে এবং ক্রিশ্চিয়ান-এইডের সহায়তায় আয়োজিত ‘কৃষিখাতে স্বয়ম্ভরতা ও খাদ্য অধিকার’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি । সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিবিদ ড. মাহবুবার রহমান, প্রাক্তন উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর; কৃষিবিদ মোঃ হামিদুর রহমান, সাবেক মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর; এবং সঞ্জীব কুমার সঞ্জয়, কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন ও সঞ্চালনা করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক জনাব মহসিন আলী। এছাড়া সেমিনারে বক্তব্য রাখেন প্রাকটিক্যাল একশন বাংলাদেশ, হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড, বাংলাদেশ আদিবাসি সমিতি, ভূমিহীন সমিতি, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন-এর নেতৃবৃন্দসহ দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কাজ করে এমন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সঞ্জীব কুমার সঞ্জয় বলেন, উৎপাদনযোগ্য পরিবেশ ও আবহাওয়া এবং বাজার চাহিদা বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট ফসলের চাষাবাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করে কৃষিজ উৎপাদনের উপযুক্ত দাম প্রাপ্তির মাধ্যমে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন করা সম্ভব। কৃষিবিদ মোঃ হামিদুর রহমান বলেন, আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তার পুষ্টিমান-এর বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রাখা। দেশের বাজার ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন কৃষির উৎপাদনকে প্রভাবিত করে থাকে সুতরাং খদ্যের স্বয়ম্ভরতার জন্য এগুলো প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া দরকার এবং প্রয়োজন যথাযথ গবেষণা ও সম্প্রসারন কার্যক্রম। কৃষিবিদ ড. মাহবুবার রহমান বলেন, কৃষিতে আমরা এখন স্বয়সম্পূর্ন সুতরাং প্রয়োজন খাদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনী কাঠামো প্রণয়ন করে সকলের নিকট প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি বলেন, নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তির ব্যাপকহারে সম্প্রসারন-এর মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরন সহায়তা বিশেষত কৃষি বিনিয়োগের সুদ কমানো ও কৃষকদের উৎপাদিত পন্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করে দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন সম্ভব। সভাপতির বক্তব্যে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদিত হলেও যথাযথ বন্টন ব্যবস্থার অভাবে খাদ্য সকলের কাছে পৌছায় না, পাশপাশি রয়েছে নীতিমালা অনুযায়ী বাস্তবায়নের সমস্যা। এজন্য ৪ কোটি অতি দরিদ্র ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ‘খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খাদ্য অধিকার আইন করা প্রয়োজন।
প্রবন্ধ উপস্থাপনে বলা হয়, কৃষি তথ্য সার্ভিস ২০১৮ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ফসল উৎপাদনের নিবিড়তা হয়েছে ১৯৪ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে ফসলের ভাল উৎপাদন হলেও ফসল উত্তোলনের সময় ব্যাপক ক্ষতি হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রধান ৭ শ্রেণীর ফসলের মোট উৎপাদন ৫ কোটি ৮৪ লাখ টন এবং যার প্রায় ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টন নষ্ট হয়েছে। যা মোট উৎপাদিত ফসলের প্রায় ১৪ শতাংশ এবং এর বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ৩১ শতাংশ। সম্প্রতি বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃষিখাতের গুরুত্ব কম বলে মনে হচ্ছে। ২০১০-১১ সালে মোট বাজেটে বৃহত্তর কৃষিখাতের বরাদ্দ ছিল ১০.৪৭ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ সালে ৮.৩৩ শতাংশে নেমে আসে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ সকল মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধানে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে প্রায় দিগুণ। প্রতি বছর উৎপাদন বাড়িয়ে যেতে হবে গড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষির উৎপাদন ৪.৫ শতাংশ হারে বাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল কিন্তু তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ লক্ষ্যমাত্রা নামিয়ে আনা হয় সর্বোচ্চ ৩.৫ শতাংশে। গত তিন বছর ধরে এ লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। কৃষিখাতে আধুনিক প্রযুক্তির ধারণা উৎসাহিত করার জন্য প্রদান করা হয় উপকরণ ভর্তুকি। স্বাধীনতার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে কৃষিখাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫০ শতাংশের বেশী। এরপর অর্থনৈতিক সংস্কারের কারণে দ্রুত প্রত্যাহার করা হয় কৃষি ভর্তুকি কিন্তু মোট বাজেট বৃদ্ধির তুলনায় তা হ্রাস পাচ্ছে বছর বছর। ২০১২-১৩ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ৬.৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছর ২০১৭-১৮ হয় ৯ হাজার কোটি টাকা যা ২.২৫ শতাংশে হ্রাস পায়। এটা দেশের কৃষি ও কৃষকের ক্ষতি। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কৃষির উৎপাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্যের হার ০.৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। তবে কৃষি বহির্ভূত খাতে উৎপাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্য হ্রাস পায় ০.২ শতাংশ। অর্থ্যাৎ কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধির তুলনায় দিগুণ হারে দারিদ্র কমায়। কারণ কৃষিখাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে খাদ্য ও পুষ্টির সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্যপন্যের মূল্যে স্থিতিশীলতা আসে।
‘কৃষিখাতে স্বয়ম্ভরতা ও খাদ্য অধিকার’ ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’-এর সুনির্দিষ্ট সুপারিশসমূহ হল, ১. টেকসই কৃষি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণে ‘মূল্য কমিশন’ গঠন করা; ২. টেকসই কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট বৃদ্ধি করা; ৩. কৃষিখাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ভাল ফসল উত্তোলন ব্যবস্থাপনা ও আগামীতে কৃষি শ্রমিকের ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি ব্যবস্থার যান্ত্রিকীকরণে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি প্রদান করা। ৪. দেশে কৃষি জমি সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি/আইন প্রণয়ন করা; এবং ৫. ৪ কোটি অতি দরিদ্র ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ‘খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়নে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা।