খালেদার কারামুক্তির চেষ্টা বিএনপির পানি ঘোলা করার কৌশল!

প্রকাশিত: ১:০৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০

খালেদার কারামুক্তির চেষ্টা বিএনপির পানি ঘোলা করার কৌশল!

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার :

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য প্যারোল (শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি) অথবা ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় সাজা স্থগিত রাখার আবেদন ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন চতুর্থবারের মতো খারিজ হওয়ার পর এমনটাই মনে করছেন বিএনপির নেতারা; যদিও ওই দুই উপায়ে আবেদন করলেই যে ফল পাওয়া যাবে সে বিষয়েও তাঁরা নিশ্চিত নন।

বিএনপি নেতাদের মতে, আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার জামিন মিলছে না। এর জন্য পর্দার আড়ালে ‘সমঝোতা’ লাগবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতির মধ্যেও বারবার কেন জামিনের জন্য চেষ্টা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলের বিভিন্ন স্তরে। অনেকের মতে, বিএনপি নিজেই সময়ক্ষেপণ করছে; যার অর্থ হলো খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আরো অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়া। কেউ কেউ একে ‘পানি ঘোলা করে’ পান করার সঙ্গেও তুলনা করছেন। তাঁদের মতে, সরকারের অনুকম্পা চাইতে হলে আগে চাওয়াই ভালো। দিন যত গড়িয়ে যাবে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থাও ততটাই খারাপ হবে। তা ছাড়া আন্দোলন করে খুব দ্রুত খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা যাবে—এমন বাস্তবতাও এখন নেই বলে মনে করে বিএনপি। বারবার জামিন আবেদন বিফলে যাওয়া দলের জন্যও বিব্রতকর। তাই জামিনের জন্য আপিল আবেদন করা হবে কি না সে সম্পর্কে একটু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে চায় বিএনপি।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপিল আবেদন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত আছে। তবে দল এবং আইনজীবী নেতাদের আলোচনায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যে যে ফোনালাপ হয় সেখানেও প্যারোলের আবেদনের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা। তিনি বলেন, আদালত ছাড়া আরেকটি রাস্তা আছে, সেটি হলো প্যারোল, যে আবেদন করলে সরকার তা বিবেচনা করবে। অবশ্য প্যারোল বা অন্য কোনো আবেদন করলে খালেদা জিয়া কারামুক্ত হবেন এমনটি নিশ্চিত হতে চাচ্ছে বিএনপি।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, সরকারের অনুকম্পা চাইলে আগেই চাওয়া উচিত। কারণ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না হলে জামিনেরও সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে আন্দোলনও বিএনপি করতে পারবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘প্যারোল বা অন্য কোনো উপায়ে মুক্তির আবেদন করলে করুক। পানি ঘোলা করে লাভ কী! এখানে তো সরকার যা চাইবে তা-ই হবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য এবং দুজন সহসভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দলের সবাই জানে যে জামিনের আবেদন করে কোনো লাভ হবে না। তার পরও বারবার জামিনের জন্য চেষ্টা করার অর্থ সময় নষ্ট করা। ওই নেতারা বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সবই লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছ থেকে আসে। অথচ সিদ্ধান্ত ছিল ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী সাজা স্থগিতের আবেদন করার।

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিতের আবেদন করার বিষয়ে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয় গত জানুয়ারি মাসে। গত ২৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে সাক্ষাৎ শেষে তাঁর বোন সেলিমা ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার কারামুক্তির ব্যাপারে বিশেষ আবেদনের কথা ভাবছে তাঁর পরিবার। একই সময়ে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী দলের প্রবীণ নেতা খন্দকার মাহবুব হোসেনকে এ বিষয়ে আইনগত প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী এসংক্রান্ত আবেদন প্রস্তুত করা হয় এবং খালেদা জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দার তাতে স্বাক্ষরও করেছিলেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই খন্দকার মাহবুব হোসেন একাধিকবার তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় সাজা স্থগিত করে আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই।’ তাঁর বক্তব্যের পরপরই গত ১৪ জানুয়ারি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিতের আবেদন করা হলে সরকার তা বিবেচনা করবে।

এদিকে হঠাৎ করেই গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আবারও জামিনের আবেদন করার সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকে স্কাইপে অংশ নেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর তাঁর নির্দেশনায়ই আগের সিদ্ধান্ত পাল্টে যায় বলে নিশ্চিত করেন দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা।

জানা যায়, ওই ঘটনায় খন্দকার মাহবুব হোসেন কিছুটা ক্ষুব্ধ হন। এরপর তাঁকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ডাকা হলেও তিনি যাননি। শুধু তা-ই নয়, গত বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানিতে তিনি অংশ নেননি বিএনপি নেতাদের অনুরোধ সত্ত্বেও। অন্যদিকে চতুর্থ দফা জামিনের আবেদন করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরাও। কেননা সব কিছুর আগে তাঁরা খালেদা জিয়ার জীবন বাঁচাতে চান।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে শামীম এস্কান্দার ও অন্যদিকে খন্দকার মাহবুব হোসেন গতকাল বলেন, ‘আমি একটি আইনগত সমাধানের কথা বলেছিলাম। কারণ আমি মনে করেছি, আগে বিএনপি চেয়ারপারসনকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই বিষয়টি সম্পুর্ণ ভাবে দল বিএনপি মেনে নেয়নি। এতে বরং দল বিএনপি এখন খালেদা জিয়াকে নিয়ে ঘোলাটের পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031