খাসিয়াদের বর্ষ বিদায়ে

প্রকাশিত: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৫, ২০১৯

খাসিয়াদের বর্ষ বিদায়ে

খাসিয়া সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায় ২৩ নভেম্বর। খাসিয়াদের ভাষায় একে বলা হয় ‘খাসি সেঙ কুটস্যাম’। বর্ষ বিদায়ের এই অনুষ্ঠান চিরাচরিত ঐতিহ্যবাহী প্রথায় উদযাপন করেন খাসিয়ারা। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে খাসি সোসিয়্যাল কাউন্সিলের আয়োজনে ব্যতিক্রমী আয়োজনে শনিবার (২৩ নভেম্বর) দিনব্যাপী মাগুরছড়া খাসিপুঞ্জি মাঠে এ উৎসব শুরু হয়। বর্ণাঢ্য আয়োজনে খাসি (খাসিয়া) বর্ষবিদায় উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরীন। খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতি ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান জিডিসর প্রধান সুচিয়াং-এর সভাপতিত্বে এবং লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান ফিলা পত্মী, খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সেক্রেটারী এলিসন সুঙ এর সঞ্চালনায় খাসি বর্ষ বিদায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সম্প্রীতি বাংলাদেশ এর আহবায়ক ও বিশিষ্ট নাট্য অভিনেতা পীযুষ বন্ধোপাধ্যায়,কবি সৌমিত্র দেব, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মল্লিকা দে, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের চেয়ারপার্সন পিডিশন প্রধান সুচিয়াং, , মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সালেহ এলাহী কুটিসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যানবৃন্দ।
জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন বলেন, খাসিয়াদের বিভিন্ন সমস্যা ও জমি নিয়ে কিছু জটিলতা আছে ।এ ব্যাপারে আমাকে জানালে সমাধানের জন্য চেষ্টা করবো। । আমাদের সংবিধানে সব নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রয়েছে। কোন বিশেষ গোষ্ঠী কারো ওপর আঘাত আনতে পারে না। জেলা প্রশাসক বলেন, নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারন ও লালন করতে হবে। আগামী প্রজন্মরা লেখাপড়া শিখে এই সংস্কৃতিকে আরো বিকশিত করতে পারে সে দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি, আগামী বছর সবার জীবন আনন্দে ভরে উঠুক এই প্রত্যাশা করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সম্প্রীতি বাংলাদেশ এর আহবায়ক বিশিষ্ট নাট্য অভিনেতা পীযুষ বন্দোপধ্যায় বলেন, বাংলাদেশটা হচ্ছে ফুলের বাগান। এখানে নানা ধর্মের, নানা গোত্রের, নানা বর্ণের, নানা গন্ধের, নানা ফুলের ও নানা জনগোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। একের ভিতর বৈচিত্র। বৈচিত্রের ভিতর ঐক্য, এই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের দীর্ঘ দিন ধরে আছে। এই আমরা ভবিষ্যতে দেখতে চাই। সুন্দরভাবে দেখতে চাই, সুন্দরতরভাবে দেখতে চাই। বিশ্বের মাঝে এটি দৃষ্টান্ত হিসাবে তুল ধরতে চাই। এখানে যেন কোন রকম বিভেদ না থাকে, সেটাই প্রত্যাশা করি। তিনি সম্প্রীতি বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে খাসিদের বর্ষ বিদায় অনুষ্ঠানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও নতুন বর্ষকে স্বাগত জানান।
কবি সৌমিত্র দেব বলেন, উৎসব মানুষের মধ্যে মিলনের মেলবন্ধন রচনা করে । এই উৎসবের মধ্য দিয়ে খাসিয়াদের সংস্কৃতির একটি দিক উঠে এসেছে ।

অনুষ্ঠানস্থল লাউয়াছড়া মাঠের এক প্রান্তে বাঁশের খুঁটির উপর প্রাকৃতিক পরিবেশে নারিকেল গাছের পাতায় ছাউনি দিয়ে আলোচনা সভার মঞ্চস তৈরী করা হয়। মাঠের চারপাশে তাদের নিজস্ব পণ্য সামগ্রী নিয়ে মেলায় স্টল বসে। স্টল সমুহে খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়াও খেলনা, খাদ্য, পোশাক ও মশলা সামগ্রী স্থান পেয়েছে। বৃহত্তর সিলেট বিভাগের ৭০টি খাসিয়া পুঞ্জি থেকে আগত নারী-পুরুষ, শিশু কিশোররা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে এসে এসব স্টল থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনছেন।

উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল ঐহিত্যবাহী খাসি পোশাক পরে মেয়েদের নাচ-গান, তৈল যুক্ত একটি বাঁশে উঠে উপরে রাখা মোবাইল ফোন গ্রহন, দুটি পুকুরে বড়শী দিয়ে মাছ শিকার, তীর ধুনক খেলা, গুলতি চালানো, খাসি মেয়েরা পান সলি প্রতিযোগিতা, র‌্যাফেল ড্র ও মেলা।

২০১২ সাল থেকে মাগুরছড়া থাসিয়া পুঞ্জির ফুটবল মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে খাসি বর্ষ বিদায় “খাসি সেঙ কুটস্যাম” পালন করা হয়। ৭২টি থাসিয়া পুঞ্জির থেকে খাসি নারী পুরুষ, কিশোর- কিশোরীরা এ উৎসবে যোগ দেয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের এ আয়োজন সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে।

মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান জিডিশন প্রধান সুচিয়াং ও লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান ফিলা পত্মী জানান. ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে ভারদের মেঘালয় রাজ্যে ২৩ নভেম্বর খাসি বর্ষ বিদায় “খাসি সেঙ কুটস্যাম” পালন করা হয়। পরদিন ২৪ নভেম্বর থেকে শুরু হবে খাসি বর্ষ বরণ |
অনুষ্ঠানে কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ছড়িয়ে দিন