খেলাপিরাও প্রণোদনা পাবেন

প্রকাশিত: ১১:৫৯ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২০

খেলাপিরাও প্রণোদনা পাবেন

নুসরাত হোসেন

খেলাপিরাও প্রণোদনা পাবেন । করোনাভাইরাস সঙ্কট মোকাবেলায় শিল্প খাতের জন্য সরকার ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ করেছে । সেখানে খেলাপিদের ঋণ দেওয়ার বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের ঋণের পরিমাণ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত ইন্টারনাল ক্রেডিট রিস্ক রেটিং (আইসিআরআর) নীতিমালার শর্ত শিথিল করার মাধ্যমে ঋণ খেলাপিদের এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

রোববার নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধাতের ফলে এখন যে কোনো শিল্পদ্যোক্তা এই তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবেন।

কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দাপ্তরিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় আইসিআরআর কার্যক্রম ব্যাহত ও ঋণ গ্রহীতার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়াকে বিধিনিষেধ শিথিলের কারণ দেখিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় শিল্প ও সেবা খাতের আওতায় তাদের কার্যক্রম দ্রুত চালু করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ সুবিধা দিতে আইসিআরআর সম্পন্ন না করেও ব্যাংক ঋণ দিতে পারবে।

তবে নিজেরা বিধিনিষেধ তুলে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর উপর দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নির্দেশনায় ‘তবে’ যুক্ত করে বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যাংক বিদ্যমান নিজস্ব নীতিমালার আওতায় ঋণ ঝুঁকি বিশ্লেষণপূর্বক ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে গ্রাহক নির্বাচন করবে।

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার শিল্প খাতের জন্য যে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তাতে ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে। এর ৪.৫ শতাংশ ঋণগ্রহীতা শোধ করবে, বাকি ৪.৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে।

গত ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেওয়ার পর ১২ এপ্রিল ওই প্রণোদনা প্যাকেজের নীতিমালা ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে বলা হয়, এই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ কোনো ঋণ খেলাপিরা পাবে না।

এমনকি যে সব ঋণ খেলাপি বিভিন্ন সময়ে সরকারের দেওয়া সুযোগ নিয়ে তিন বারের বেশি তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন, তারাও এই প্রণোদনার অর্থ পাবে না বলে উল্লেখ ছিল নীতিমালায়।

রোববার এই বিধিনিষেধটিই তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণার সময় অর্থনীতিবিদরা সুপারিশ করেছিলেন, এই অর্থ যেন ঋণ খেলাপিরা না পায়।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি ঋণের ঝুঁকি পরিমাপের নতুন পদ্ধতি- আইসিআরআর চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক । চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ গত বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।

ঋণঝুঁকি নির্ধারণে ২০০৫ সালে ‘ক্রেডিট রিস্ক গাইডলাইন ম্যানুয়াল (সিআরজিএম)’ জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার আগ পর্যন্ত ওই নীতিমালাই অনুসরণ করে ঝুঁকি নির্ণয় করে ঋণ দিয়ে আসছিল ব্যাংকগুলো।

নতুন পদ্ধতি চালুর আগে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত সিআরজিএম ও আইসিআরআর একসঙ্গে অনুসরণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই অর্থাৎ গত বছরের জুলাই থেকে কেবল আইসিআরআর অনুসরণ করতে বলা হয় ব্যাংকগুলোকে।

এই পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলো এখন থেকে প্রত্যেক ঋণগ্রহীতার একটি রেটিং করবে এবং এ-সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করবে।

এই রেটিংয়ে পরিমাণ ও গুণগত উভয় ধরনের সক্ষমতার মূল্যায়ন থাকবে।

মূল্যায়নের ভিত্তিতে গ্রাহককে চার শ্রেণিতে ভাগ করবে ব্যাংকগুলো।

১,কোনো গ্রাহক ‘এক্সিলেন্ট’ রেটিং পেলে ব্যাংক তাকে ঋণ দিতে পারবে।

২, ‘গুড’ রেটিং পেলেও ব্যাংক তাকে ঋণ দিতে পারবে।

৩, ‘মার্জিনাল’ রেটিংধারী গ্রাহককে পুরোনো ঋণ নবায়ন বা নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ব্যাংককে।

৪, ‘আনএকসেপ্টেবল’ রেটিংধারীকে কোনো পরিস্থিতিতেই নতুন ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো, যদি না আগের ঋণ শতভাগ নগদ পরিশোধ হয় অথবা জামানত দিয়ে ঋণটি আচ্ছাদন করা হয়। এই শ্রেণির গ্রাহকের আগের ঋণ সর্বোচ্চ দুবার নবায়ন বা বর্ধিত করা যাবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, রেটিং করার ক্ষেত্রে একটি পার্টি বা গ্রাহকের পরিমাণগত সক্ষমতায় ৬০ শতাংশ নম্বর এবং গুণগত সক্ষমতায় ৪০ শতাংশ নম্বর থাকবে।

পরিমাণগত সক্ষমতা সূচকে ৬০ নম্বরের মধ্যে মোট গৃহীত ঋণ ও আর্থিক সক্ষমতায় ১০, চলতি দায় ও তরল সম্পদে ১০, মুনাফার সক্ষমতায় ১০, সুদ পরিশোধের সক্ষমতা ও নগদ প্রবাহের ওপর ১৫, পরিচালনগত দক্ষতায় ১০ এবং ব্যবসার মানের ওপর পাঁচ নম্বর থাকবে।

এছাড়া গুণগত সক্ষমতায় ৪০ নম্বরের মধ্যে কার্যদক্ষতার আচরণে (পারফরম্যান্স বিহেবিয়ার) ১০, ব্যবসা ও খাত ঝুঁকিতে ৭, ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিতে ৭, জামানত ঝুঁকিতে ১১, সম্পর্ক ঝুঁকিতে ৩, পরিপালন ঝুঁকিতে ২ নম্বর থাকবে।

এই রেটিংয়ে কোনো গ্রাহক ৮০’র বেশি নম্বর পেলে তিনি ‘এক্সিলেন্ট’ শ্রেণিভুক্ত হবেন। ৭০-এর বেশি এবং ৮০’র কম নম্বর পেলে থাকবেন ‘গুড’ শ্রেণিতে। ৬০-৭০ এর মধ্যে নম্বর হলে ‘মার্জিনাল’ এবং ৬০ এর নিচে নম্বর পেলে ‘আনএকসেপ্টেবল’ শ্রেণিতে থাকবেন।

তবে কোনো গ্রাহক গুণগত রেটিংয়ে যত নম্বরই পাক না কেন, পরিমাণগত রেটিংয়ে ৫০ শতাংশ নম্বর না পেলে তাকে ‘আনএকসেপ্টেবল’ রেটিং দেওয়া হবে।

নুসরাত হোসেন ঃ সিনিয়র এভিপি , ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড

ছড়িয়ে দিন