গণতন্ত্র মানে সামগ্রিক মুক্তি

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১২, ২০১৮

গণতন্ত্র মানে সামগ্রিক মুক্তি

 হাসান আজিজুল হক

আপনার ছেলেবেলার কথা দিয়েই শুরু করুন?
আমার জন্ম কিন্তু রাঢ় বাংলার বর্ধমান জেলায়। সেটা একটা প্রাচীন ভূমি। বর্ধমান জেলার মঙ্গলকুট থানাটি প্রাচীন বঙ্গভুমিরই একটা অংশ। হাজার বছর আগের প্রাচীন নিদর্শনাদি পাওয়া গেছে সেখানে। সেখানকার ঐতিহ্য আর পটভূমি আমি বহন করে বেড়াই। প্রত্যন্ত গ্রামে কিছু সুবিধা তো আছেই। তবে কিছু অসুবিধাও আছে। অসুবিধাগুলোর কথা এখন আর মনে নেই। রাঢ় অঞ্চলে গাছপালা কম। বড় বড় প্রান্তর। মাঝে মধ্যে বিশাল আকারের বটগাছ, অশ্বথ গাছ। এসব জায়গায় নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ানো, দৌড়ানো ছিল খুব রোমাঞ্চকর। প্রধান ফসল ছিল আমন ধান। বর্ধমানকে বলা হতো পশ্চিমবঙ্গের শস্যাগার। অথচ সেখানে আমন ছাড়া আর বড় কোন ফসল হতো না। হয়তো কখনো আশপাশের কোন জমিতে কিছু কিছু আউশ ধান ও রবিশস্যও হতো। আমার ছেলেবেলাটা কেটেছে ওই উন্মুক্ত প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যদিয়ে। বেড়ে উঠেছি প্রকৃতির সন্তানের মতো। জামা জুতো কি পরেছি মনে পড়ে না। খালি পায়ে ঘুরেছি। এখনকার ছেলেমেয়েরা এসব বিশ্বাসও করবে না। পায়ের নিচে বাবলা কাঁটা ঢুকেছে। কিন্তু পাত্তা দেইনি। বড় পরিবারের সন্তান ছিলাম আমরা। প্রচুর গরু-ছাগল-মোষ। রাঢ় অঞ্চলের শক্ত মাটিতে গরুর লাঙল চলতো না। সেখানে মোষের লাঙল ব্যবহার করতে হতো। প্রচুর লোকজন ছিল আমাদের বাড়িতে। জমিদারি না থাকলেও জমিজমার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, বাইরে থেকে লোক আনতে হতো চাষ করার জন্য।
সে জন্য সাঁওতাল পরগনার দুমকা জেলা থেকে কাজের লোক আসতো। আমন মৌসুমে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন কুলি কামিন কাজ করতো। এসব মিলিয়ে অন্য রকম এক জীবন। লেখাপড়াও গ্রামেই করেছি। কিন্তু পড়াশোনা বা ছেলেমেয়েদের তৈরি করার ব্যাপারে অভিভাবদের সতর্ক দৃষ্টি সে সময় আমার গ্রাম সমাজে ছিল না। আমি আর আমার ভাই মিলে পাঠশালায় যেতাম। সেখানে যাবার পথে আর কোথায় কোথায় যেতাম সে খোঁজ কেউ নিতো না। হয়তো একদিন পাঠশালায় গেলামই না। কোন কুলগাছে বসে কুল খেতে লেগে গেলাম। গ্রামের পাঠশালা থেকেই প্রাইমারি পাস করলাম। এরপর মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। ১৯৫৪ সালে আমি বোর্ড অব সেকেন্ডারি, এখন যেটা মাধ্যমিক পরীক্ষা সেটা পাস করি। এরপর খুলনার দৌলতপুর কলেজে ভর্তি হই।

তার মানে দেশ ভাগের পর আপনারা তখন পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছেন?
মোটেও সে রকম ব্যাপার নয়। আমার ভগ্নিপতি তখন খুলনার দৌলতপুর কলেজে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে আমার দিদির কাছে আসতে গিয়েই দৌলতপুর কলেজে ভর্তি হওয়া। এর আগে অবশ্য আমার এক দাদাও ঢাকায় চলে এসেছেন। কিন্তু আমাদের পুরো পরিবারের অভিবাসী হয়ে চলে আসাটা অনেক পরের ঘটনা। তাও শুধু আমার বাবার পরিবারের লোকজন। অন্য জ্ঞাতি- গোষ্ঠীরা এখনও  বর্ধমানেই রয়ে গেছেন।

আপনার প্রথম বই কবে বেরোয়?
সিরিয়াসলি লেখালেখি শুরু করি ১৯৬০ সালে। এর আগেও এদিক-ওদিক লিখেছি, সেটা আলাদা কথা। লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে,

প্রথম যে গল্পটি লিখি তার নাম ‘শকুন’। সেটি সমকালে প্রকাশিত হয়েছিল। তারপরে ৬০ থেকে ৬৪ সালে অনেক গল্প লিখেছি। সেগুলো পূর্ব মেঘ, ঢাকার পুবালী, লেখক সংঘের পত্রিকা পরিক্রম প্রভৃতিতে ছাপা হয়। ওই গল্পগুলোকে এক সঙ্গে করে লেখক সংঘ একটি বই বের করে। সেটিই আমার প্রথম গল্পের বই। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত ওই বইটির নাম ছিল ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’। বইটিতে ওই নামে কোন গল্প ছিল না। সব গল্প নির্বাচন করে আমি ওই শিরোনাম বেছে নিয়েছিলাম।

লেখালেখির পাশাপাশি কি আপনার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল?
আমি প্রায় শুরু থেকেই রাজনীতির সঙ্গে মিশে আছি। ছাত্র রাজনীতি করেছি। প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সব সময়ই ছিলাম। আমি এখনও মনে করি রাজনীতি হতে হবে মাটি আর মানুষের পক্ষে। ক্ষমতার জন্য, কুরসির জন্য যে রাজনীতি, তার সঙ্গে আমি কখনই সম্পর্ক রাখিনি। তাদের ক্ষুরে  মাথা কামাইনি। ছাত্র রাজনীতি শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। তবে কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে যুক্ত ও হইনি।

সুনির্দিষ্ট দল না করলেও এ দেশটাকে নিয়ে আপনার রাজনৈতিক ভাবনা নিশ্চয়ই আছে?
-সেটা তো বলে বলে পাগল হয়ে গেলাম। দেশে গণতন্ত্র দরকার। অসাম্প্রদায়িক, সেক্যুলার রাষ্ট্র দরকার। সোজা কথা মানুষের রাষ্ট্র দরকার। গণতন্ত্র বলতে শুধু ৫ বছর পর পর ভোট হওয়া নয়। আমি বুঝিয়েছি সেটাকে অনেক বড় পরিসরে। অস্বীকার করছি না অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে আমি একজন মার্কসবাদী। তবে মার্কসবাদের নামে আমাদের দেশে যারা কতগুলো স্লোগান আওড়ায়, তার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি ব্যাপারটাকে দেখি এভাবে- একটা দেশের সব নাগরিকের মোট কর্মশক্তি সেটাকে কাজে লাগানো হোক অথবা নাই হোক, সেটা এবং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক শক্তি সবকিছু কাজে লাগিয়ে একটা রাষ্ট্রের যা কিছু অর্থবিত্তসম্পদ অর্জিত হয় সেটা যাবে কোথায়? এটাই একটা বড় ফ্যাক্টর। যেখানে সকল নাগরিকের কর্ম ও মানসিক শক্তির সমন্বয়ে রাষ্ট্রের সম্পদ অর্জিত হচ্ছে সেখানে সম্পদের মালিকানায় সব নাগরিকেরই হক আছে। কিন্তু আমরা দেখি রাষ্ট্রের বেশির ভাগ সম্পদ ভোগ করছে অল্প কিছু মানুষ। তাহলে কিভাবে রাষ্ট্র জনগণের হবে। উন্নয়ন যেটুকু হচ্ছে সেটা সমভাবে বন্টন করা হচ্ছে না। দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলতে গিয়ে একবারও ভাবি না দরিদ্র কেন থাকবে। মোট সম্পদ যদি অল্প কিছু লোকের হাতে জড়ো না হতো অথবা জনগণের জন্য সব সম্পদ কেন্দ্রীভূত কর যেত তাহলে দারিদ্র্য বলে কিছু থাকতোই না। আমি গণতন্ত্র বলতে বুঝি মানুষের মুক্তি। সেটা বৈষয়িক ও মানসিক সব ব্যাপারেই। কাজেই তথাকথিত ক্ষমতার রাজনীতিতে আমার যেমন আস্থা নেই তেমনি আমি মনে করি সেখানে আসলে গণতন্ত্রও নেই। গণতন্ত্রের যে সামগ্রিক মুক্তি আমাদের সমাজে তার প্রতিফলন চাই। চিরকাল সে কথাই বলে এসেছি। কিন্তু রাষ্ট্রকে বার বার শোষকের হাতে চলে যেতে দেখছি। সেটা পাকিস্তান আমলে যেমন মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে পাওয়া, বাংলাদেশের মধ্যেও তেমনি।

আপনার স্বপ্নের সেই শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পেতে হলে কি করতে হবে?
-সারা জীবন স্বপ্ন দেখে যাওয়ার কল্পনা বিলাস আমার নেই। এত স্বপ্ন দেখলে তা এই প্রশ্ন জাগবে আমরা জেগে আছি নাকি ঘুমাচ্ছি। স্বপ্ন একবারই দেখবো। তারপরেও করতে হবে কর্ম। একথাই লোকজনকে বুঝিয়ে উঠতে পারি না। আমাদের কাজ হবে এখন পুনরুদ্ধার। মানুষের অর্থ মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছিল কারা ধনিক সম্প্রদায়? বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নাকি সাধারণ মানুষ? মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সর্বশ্রেণীর সাধারণ মানুষ। তাদের হাতেই তো রাষ্ট্রটা তুলে দিতে হবে। পরিস্থিতি তো সে কথা বলছে না। কিন্তু কি করে রাষ্ট্রকে সাধারণ মানুষের করে তোলা যাবে এ ব্যাপারে তো আমার হাতে কোন তৈরি করা কর্মসূচি নেই। এর জন্য সংগঠন দরকার, আন্দোলন সংগ্রাম দরকার। সব ঠিক আছে। এই রাষ্ট্র তৈরি করার মূল কাজটি জনগণের ভেতর থেকেই আসতে হবে। কিন্তু আমরা জনগণকে জাগ্রত করি না। তাদেরকে বলি না তোমাদের অধিকার তোমরা বুঝে নাও। তথাকথিত রাজনীতিবিদদের বলি হচ্ছে আমরা যদি ক্ষমতায় যাই তাহলে তোমাদের সব আকাক্সক্ষা পূরণ করবো। এটা একটা বোগাস কথা। বাস্তবে তারা জনগণ নয়, নিজেদের আকাক্সক্ষাই পূরণ করে। জনগণ জেগেছে কানসাটে, ফুলবাড়িতে। কিন্তু সেটাকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে না গেলে কোন কাজ হবে না।

এদেশে বামপন্থিরা কেন রাজনীতিতে বার বার মার খাচ্ছেন?
-এই আলোচনাটি অত্যন্ত অপ্রীতিকর, তেতো এবং আমার কথা শুনে অনেকে বিরক্তবোধ করবেন। আমাকে কেউ এমনও বলতে পারেন, আপনি তো আর এই রাজনীতিতে নেই। তাহলে কেন এমন মন্তব্য করছেন। কথাটা সত্য। আমি তো করেছি মাস্টারি। আর লেখালেখি করি। বামপন্থি রাজনীতি নিয়ে কথা বলা আমার জন্য সমীচীন নয়। তবে সাদা চোখে আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি এদেশে বাম রাজনীতি আছে, আবার নেইও। কেমন করে হবে। বলার আগে বলতে হবে এই রাজনীতিটা হওয়া দরকার। জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে, এটা আমাদের কর্মসূচি নয়। তোমাদের কর্মসূচি। আমি তো মনে করি জনগণের কাছে গিয়ে তাদেরকে সঠিকভাবে বোঝাতে পারলে তারা অবশ্যই সংগঠিত হবে।

ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে এদেশের বাম রাজনীতিতে যে ভাঙন দেখা দেয় সেটা কি আপনার মনে কোন রেখাপাত করেছিল?
-ভাঙন দেখেছি তো। ভাঙনের বিষয়টা একটা ঘটনা মাত্র। এর তথ্য তো সবাই জানে। আমি শুধু বলতে পারি এই ভাঙন যদি না হতো, একটা জায়গায় স্থির নিবন্ধ থাকতো বাম আন্দোলন। তাহলে হয়তো এশেটা অন্যরকম হতো। তা না হয়ে জনগণের পক্ষে আন্দোলন সংগঠিত না করে বাম দল দ্বিধা, ত্রিধাবিভক্ত হয়ে এক পর্যায়ে শতধা বিভক্ত হয়ে গেল। এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। চারু মজুমদারের অনুসারীরা এখন কে কোথায় ছিটকে পড়েছে। ভুল তো হয়েছেই। সে ভুল আবার তারা স্বীকারও করছে। তাদেরকে তো আমার কিছু বলার নেই। আমি কিন্তু আমার বিচার বুদ্ধি দিয়ে সে সময় বুঝতে পেরেছিলাম ভুল হচ্ছে কোথায় যেন। উগ্রতার ভেতর দিয়ে জনগণকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে হাতে কলমে রাজনৈতিক দল না করার কারণে এ বিষয়ে বড় গলায় কথা বলার অধিকার আমার ছিল না।

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চরিত্র সাধারণ মানুষ কেন তার অর্জিত বিজয় ধরে রাখতে পারলো না?
একটা বড় বাড়িতে ধরে নেই দশ ভাই বাস করেন। এদের মধ্যে প্রতাপশালী এক ভাই যদি বাকি নয় ভাইকে তাড়িয়ে দেয় তাহলে যে অবস্থা হবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া সাধারণ মানুষকে সেই পরিস্থিতিই বরণ করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর যারা ক্ষমতায় গেছেন তারাই উপেক্ষা করেছেন সাধারণ মানুষকে। লক্ষ্য করত হবে একাত্তরে বিজয়ের পর রাষ্ট্র ক্ষমতা কিভাবে জায়গা বদল করেছে, শ্রেণী বদল করেছে এবং কোথায় হচ্ছে তার গন্তব্য। আমরা সাধারণ মানুষরা যে তা বুঝতে পারছি না তাও নয়। আমরা সবকিছুই বুঝি। আমরা শেখ মুজিবের শাসন দেখেছি। তিনি কি করতে চেয়েনে তাও বুঝেছি। জিয়াউর রহমান সাহেব যে প্রক্রিয়ায় সেভাবে ক্ষমতায় এলেন তাও সবাই জানে। তারপর তিনিও চলে গেলেন। এলেন আরেক সামরিক শাসক এরশাদ। আপনি বলতে পারেন নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর তো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল। আসলে ঠিক হলো কি? জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা তলিয়ে গেল। রাষ্ট্র শক্তিটা তাদের বাইরেই রয়ে গেল। এর চাকাটা ঘোরাতে হবে জনগণকেই। আপনা আপনি সেটা হবে না।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৌমিত্র দেব