গণপরিবহনে নারীর যাতায়াত ব্যবস্থা

প্রকাশিত: ১১:০০ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২১

গণপরিবহনে নারীর যাতায়াত ব্যবস্থা

শেলী সেনগুপ্তা

গণপরিবহন বলতে আমরা বুঝি সাধারণ যাত্রী ও জনসাধারণের জন্য উপলব্ধ একটি পরিবহন ব্যবস্থা যা সুনির্দিষ্ট রুটে, সুনির্দিষ্ট সময়সূচীতে পরিচালিত হয় এবং প্রতি ট্রিপের জন্য ভাড়ানির্ধারণ করা থাকে।

সাধারণভাবে শহরের বাস, যাত্রিবাহী ট্রেন, টেম্পো এর আওতায় পড়ে। গণপরিবহন একটি সেবাধর্মী খাত। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ গণপরিবহনে চলাচল করে। মূল কারণ গণপরিবহনের ভাড়া সর্বসাধারণের আয়ত্বের মধ্যে। এটি সুনির্দিষ্ট রুট ধরে যাতায়াত করে।

সময়ের সাথে নারী এখন ঘরেবাইরে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য অধিকাংশ নারীই গণপরিবাহনের শরণাপন্ন হয়। আজকাল দেখা যায় কর্মঠ নারী শত ব্যস্ততার সাথে পথ চলছে। কাঁধে ব্যাগ, হাতে খাবারের বক্স। এরা পরিবারকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চলতে চলতে ওরা বাসস্টপেজে এসে দাঁড়াচ্ছে। তারপর নির্ধারিত বাহনটি এলেই সবার সাথে তাল রেখে উঠছে। আসন শূন্য পেলে বসছে , নাহলে দাঁড়িয়ে থাকে নিজ গন্তব্যের পোঁছানোর জন্য। তাদের মুখে থাকে কাঠিন্যের নিদর্শন আঁকা থাকে। সবধরণের ঝড় ঝঞ্ঝা পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা সাথে নিয়ে নিয়ে চলছে।

নারী তার পথ চলছে গণপরিবহনের সেবা নিয়ে, কিন্তু আজকাল সেবার সাথে যুক্ত হচ্ছে ভোগান্তি। এগুলোর শিকার হচ্ছে নারীরা। গণপরিবহনে নারীরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা ও সম্মান পায় না। দুঃখজনক হলেও সত্যি গণপরিবহনে একের পর এক শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটছে, কিছু বিচারের আওতায় আসছে, কিছু আসছে না। যারা বিচারের আওতায় আসছে তারা শাস্তি পাচ্ছে, তারপরও শ্লীলতাহানির হার কমছে না। কোন কোন ক্ষেত্রে লোকলজ্জার ভয়ে নারীরা তা প্রকাশ করছে না। তাই দৃষ্টির অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে কোন কোন ঘটনা।

তবে আশার কথা এ বিষয়ে নারীরা সোচ্চার হয়ে উঠেছে। কিছুসংখ্যক সাহসী নারীর পদক্ষেপের জন্য কিছু কিছু ঘটনার সংবাদ জনসমক্ষে আসছে। অপরাধীর জন্য বিচারের ব্যবস্থাও হচ্ছে।

গণপরিবহনে আরেকটি সমস্যা হলো আসন ব্যবস্থা। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিধান করা হয়েছিলো। পরে এটি পরিবর্তিত হয়ে বড় বাসে ৯টি, মিনিবাসে ছয়টি এবং বিআরটিসি বাসে ১৪টি আসন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের হয়।

তাছাড়া ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৭’ এর খসড়ায় বলা হয়েছে ‘গণপরিবহনে নারী,শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে তাদের বসতে না দিয়ে অন্য কেউ ওই আসনে বসলে একমাসের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন’। প্রকৃতপক্ষে এই আইন মানা হচ্ছে না। কোন কোন পুরুষ বীরদর্পে এইসব আসন দখল করে বসে থাকে এবং নানাধরণের মন্তব্যের মাধ্যমে বিব্রত করে। অথচ ঘরে বাইরে কাজ করা নারীদের গণপরিবহনে যাতায়াত করা ছাড়া গতি নেই।

তবে আশার কথা আজকাল কোন কোন রুটে মহিলাবাস চলছে। কিছু মহিলা সে বাসে যাতায়াত করতে পারে। তবে এটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা দরকার। যতদিন পর্যন্ত তা না হচ্ছে ততদিন সবার জন্য নির্ধারিত যে পরিবহন তাতে যাতায়াত করতে হবে।

এক্ষেত্রে যদি ভেজাল খাদ্যবিরোধী মোবাইল কোর্টের মতো বাসের ভেতরও নারী যাত্রীদের সেবা, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিতকরণে নারী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা মোবাইল কোর্ট বসানো যায় তাহলে বাসের পরিবেশ ভালো হবে। পুরুষ যাত্রীরা নারীযাত্রীদের সুযোগসুবিধা দেখবে, নারীরা বসার আসন পাবে, সর্বোপরি বাসের মধ্যে আর কোন নারীর শ্লীলতাহানি হবে না।

তাছাড়া গণপরিবহনে চালক ও সহকারী নিয়োগএর জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। তাদের নিয়োগপত্র দিতে হবে, তাতে বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ থাকবে। তাদের পরিচয়পত্র নিশ্চিত করতে হবে এবং অতীতের কর্মকান্ড যাচাই করে ছবি ও দরকারী সব তথ্য নিয়েই নিয়োগ দিতে হবে, যেন অপরাধ করলে তাদের দ্রুত সনাক্ত করা যায়। তাছাড়া ওদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে যেন তারা যাত্রীদের সাথে সঠিক আচরণ করতে পারে।

তবে এ বিষয়ে সরকারের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান সরকার কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকারী প্রচেষ্টায় আজকাল মহিলাবাস সার্ভিসও চালু হয়েছে।

শুধু সরকারের উপর দায়িত্ব না চাপিয়ে আমরা যারা সমাজের বিভিন্ন অবস্থানে আছি তাদেরও সচেষ্ট হবে। মনে রাখতে হবে এদেশ আমার। আমি এদেশের ষোলকোটি ভাগের এক অংশের গর্বিত অধিকারী। তাই আমার দায়িত্ব আছে দেশকে সুন্দর করা। এটা আমরা পথ চলতে গিয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য সমস্যার সমাধানের মধ্যে দিয়েই করতে পারি।

তাই সরকারের সাথে সাথে আমরাও সোচ্চার হবে নারীর জন্য গণপরিবহন নিরাপদ করতে। সমাজের অর্ধেক অংশ নারী যদি গণপরিবহনে সুরক্ষিত থাকে তাহলে সবাই ভালো থাকবে। আমাদের দেশ প্রকৃতই সোনার দেশে পরিণত হবে।