গার্মেন্টসে বিপন্ন নারী শ্রমিক

প্রকাশিত: ২:৩৬ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০২০

গার্মেন্টসে বিপন্ন নারী শ্রমিক

নুসরাত হোসেন

গার্মেন্টসের প্রসারে দরিদ্র নারীরা অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছিল । তৃণমূলে হয়েছিল নারীর ক্ষমতায়ন । তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন সচ্ছলতার । কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে তাদের সব স্বপ্ন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেছে । তাদের জন্য প্রণোদনা দরকার ।

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে দারিদ্র্যের হার বাড়বে।১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো এতো প্রকট ভাবে দেখা দেবে । জাতিসংঘের হিসাবে,করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে লকডাউনের মধ্যে বেকারত্বের বিশাল ঢেউয়ে এ বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৮ শতাংশ মানে ৫০ কোটি মানুষ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।

এই ভোগান্তি সবারই হবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হবে তীব্রতর। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে, গত ২৫ বছরের মধ্যে প্রথম আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলে মন্দা দেখা দেবে, যেখানে পুরো মহাদেশ অর্ধেক চাকরি হারাবে। আর দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতে পড়বে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে অনানুষ্ঠানিক খাত, যেখানে প্রায় ২০০ কোটি কর্মীর বেকার সুবিধা বা স্বাস্থ্য সহায়তার কোনো সুযোগ নাই। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, লকডাউনের কারণে বাংলাদেশে শাহিদার মত প্রায় ১০ লাখ তৈরি পোশাক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে।

ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলে গেলেও অর্থনীতির এই যে ধাক্কা তা দীর্ঘতর হবে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষার উন্নয়নে কর্মসূচি নির্ভর, সেসব দেশ নগদ টাকার জন্য তহবিল সঙ্কটে পড়বে।

অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী বাঙালি অধ্যাপক অভিজিৎ ব্যানার্জি বলেন, এই যে নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে টেনে তোলার এবং পরিবারগুলোর লড়াইয়ের গল্প, সেগুলো সহজে ধ্বংসের মুখে পড়বে।

“অনেক মানুষ যারা মই বেয়ে চূড়ায় উঠেছিল, তারা আবার নিচে পড়ে যাবে। শুধু টিকে থাকার জন্য লড়তে থাকা নাজুক অস্তিত্বের এত মানুষ এখন আবার এমন দারিদ্রের মধ্যে পড়বে তা থেকে বের হওয়ার তাদের কোনো উপায় নেই।”

দারিদ্র্য হ্রাসের বৈশ্বিক অর্জন ঝুঁকির মধ্যেই পড়ায় বৈশ্বিক অসমতা ও করণীয় বিষয়ে আমাদের আগের দিনে ফিরে যেতে হবে। ১৯৯০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বা ১৯০ কোটি মানুষ দিনে ১.৯০ ডলারেরও কম আয় করত। ২০১৬ সাল নাগাদ সেসব মানুষের সংখ্যা কমে ৭৩ কোটি ৪০ লাখে নেমে এসেছিল, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। এই উন্নতির পেছনে বড় অবদান ছিল দক্ষিণ এশিয়া ও চীনের অগ্রগতি।

জাতিসংঘের হিসাবে, এশিয়ার সর্বোচ্চ অনেক অর্জনই হয়েছে ভারতে, যেখানে ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২০ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছে। ২০০০ সালের পর বাংলাদেশ তিন কোটি ৩০ লাখ মানুষ বা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশকে দরিদ্র্য থেকে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে সরকার মেয়ে শিশুদের শিক্ষা, বয়স সীমা বৃদ্ধি ও সাক্ষরতার উন্নয়নের ব্যয় করেছে। মহামারির মতো দুর্ভিক্ষ দক্ষিণ এশিয়া থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে; মানুষ রোগ ও ক্ষুধা থেকে অনেকটাই মুক্ত।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সেই অগ্রগতি হয়তো এখন উল্টো পথে মোড় নেবে। বিশ্বজুড়ে মন্দার মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে স্থবির প্রবৃদ্ধি মোকাবিলায় সরকারগুলোকে হয়তো দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির তহবিলে কাটছাঁট করতে হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতে এবং দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলে জাতিসংঘ রেজুলেশন কমিটির লক্ষ্য অধরা স্বপ্নে পরিণত হতে পারে।

মাটি কাটার কাজ করেন আবেদ আলি। নিজের কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে প্রতিদিনই আসেন- যদি কাজ পাওয়া যায়, এই আশায়। কিন্তু খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি
এখন পর্যন্ত ৯০টির বেশি দেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে সহায়তা চেয়েছে। কিন্তু সবাই আক্রান্ত হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চাহিদামত বড় অঙ্কের তহবিল হয়তো যোগানো সম্ভব হবে না।

অভিজিৎ ব্যানার্জি বলেন, বিশাল অংশের মানুষের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়া ঠেকাতে সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে। মার্শাল প্লানের মতো সরকারি ব্যয়ে বিশাল কর্মসূচি নেওয়ার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো সংকটের পরও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল।

তবে মহামারীর কারণে বেকার হয়ে পড়া মানুষের জন্য এখন পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ এবং সহায়তা দেওয়া হচ্ছে তা উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেকাংশেই খুবই দুর্বল অথবা নাই বললেই চলে।

দরিদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩ লক্ষ কোটি ডলার ঘোষণা করেছে, সেখানে আমেরিকার চেয়ে চারগুণ জনসংখ্যা ১৩০ কোটির ভারত ব্যয় করবে মাত্র দুই হাজার ২২৫ কোটি ডলার। আর বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ পাকিস্তান মাত্র ৭৫০ কোটি ডলারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেখানে জাপান ৯৯ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করবে।

অন্যদিকে চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশ পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । এর ফলে ভাইরাস সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাদেরকে বাঁচাতে হলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে ।

নুসরাত হোসেন ঃ সিনিয়র এভিপি , ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড

ছড়িয়ে দিন