গাড়ি তৈরির গল্প

প্রকাশিত: ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৫

গাড়ি তৈরির গল্প

‘পড়ালেখা করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’—এমনটাই জানা আমাদের। কিন্তু দেশের বিজ্ঞানমনস্ক একদল শিক্ষার্থী শুধু গাড়ি চড়েন নাই বরং গাড়ি তৈরিও করেন! আর তাঁদের তৈরি গাড়ি পরিবেশ–বান্ধব।
গাড়ি নির্মাতা এই তরুণদের প্রসঙ্গে বলছি। তার আগে ইকো রান প্রসঙ্গে একটু বলা প্রয়োজন। ইকো রান হচ্ছে শিক্ষার্থীদের বানানো জ্বালানি-সাশ্রয়ী গাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতা। স্বল্প জ্বালানি খরচ করে কীভাবে গাড়ির গতি বাড়ানো যায় তা-ই এ প্রতিযোগিতার লক্ষ্য। আর জ্বালানি কম মানে গাড়িটি হবে পরিবেশবান্ধব। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করেছিল ইকো রান বাংলাদেশ ২০১৫ প্রতিযোগিতা। ১৮ ডিসেম্বর প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব হয়ে গেল বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি), আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০টি দল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তিন চাকা, চার চাকা, সর্বোচ্চ জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও সামগ্রিক ভাবে সেরা—এই চার বিভাগে হয়েছিল প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় তিন ও চার চাকার গাড়ি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) দল—রুয়েট ইঞ্জিনিয়াস ও টিম ওয়ান। আর সর্বোচ্চ জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও সামগ্রিক ভাবে সেরা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বরিশালের সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দল বিটিএসসি-২ ও বিটিএসসি–৩।
ইকো রান প্রতিযোগিতার অন্যতম আয়োজক নোরিহিসা মাৎসুমোটো বলেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গাড়ি উৎপাদন শিল্পের জন্য উদ্যমী তরুণ প্রকৌশলীদের গড়ে তুলতে জাইকার এই ইকো রান প্রতিযোগিতা। ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, হিট ইঞ্জিনিয়ারিং, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংসহ যন্ত্রকৌশলের বিভিন্ন বিষয় শিক্ষার্থীরা এর মাধ্যমে হাতেকলমে শিখতে পারেন।’
২৩ জনের অভিযান!
১৬ ডিসেম্বর বিকেল, ক্যাম্পাসে বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা তখন শেষ। রুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ইঞ্জিনিয়াস ও টিম ওয়ান দলের ২৩ সদস্য বেরিয়ে পড়লেন তাঁদের গাড়ি নিয়ে। ইকো রান প্রতিযোগিতা আর এক দিন পর। সে দিনই পরীক্ষা-নিরীক্ষার শেষ সময়। গত দুই দিন সফলভাবে তাঁরা নিজেদের বানানো দুটি গাড়ি চালিয়েছেন। তাই দলের সবাই তখন খোশমেজাজে। কিন্তু বিপত্তি বাধল সন্ধ্যার একটু আগে। ‘টেস্ট ড্রাইভের’ সময় দুর্ঘটনায় পড়ে তাঁদের চার চাকার গাড়িটি। ভেঙে যায় গাড়ির সামনের অংশ। রুয়েট ইঞ্জিনিয়াস দলের সাব্বির আহমেদ বর্ণনা দিচ্ছিলেন সেই সময়ের, ‘ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা সবাই হতভম্ব, বিমূঢ় হয়ে বসে ছিলাম। দলের কেউ কেউ তো কেঁদে ফেলল! তখন ছিল শেষ মুহূর্ত। হাতে সময় নেই। কত কষ্ট করে এই গাড়ি তৈরি করেছি। আমরা নিরুপায় হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু মনোবল হারাইনি। তখনই বেরিয়ে পড়েছিলাম প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির খোঁজে। তারপর রাতভর চলে গাড়ি সারিয়ে তোলার কাজ।’রুয়েট দলের জন্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ছিল রীতিমতো অভিযান। ইকো রান প্রতিযোগিতার খোঁজ তাঁরা পেয়েছিলেন নিবন্ধনের শেষ সময়ে। গাড়ি তৈরির জন্য হাতে সময় পেয়েছেন মাস খানেক। যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ২৩ সদস্যের দলটি।
দল তো হলো, কিন্তু কাজ করতে যে অর্থকড়ির দরকার! সবার চেষ্টায় সেই আর্থিক বাধাও দূর হলো। গাড়ির ইঞ্জিন পাওয়া গেল নিজেদের বিভাগ থেকেই। বাকি যন্ত্রাংশের জন্য আর্থিক জোগান দিতে রাজি হলেন সবাই। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলো।
তিন চাকা বিভাগের ফজলে হোসেন মোহাইমেন বলেন, ‘আমাদের এক সপ্তাহ লেগেছে নকশা করতে। মোটের ওপর গাড়ি তৈরির জন্য আমরা সময় পেয়েছি ২০ দিন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে বইয়ের বাইরে আমরা প্রথম শুরু করলাম গাড়ি তৈরির কাজ।’
তাঁরা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেছেন রাজশাহীর স্টেডিয়াম মার্কেটসহ স্থায়ীয় বাজার থেকে। ক্লাস, টার্ম পরীক্ষা, ল্যাব আর রাতভর গাড়ির কাজ—এই তিনে মিলে তাঁদের কেটেছে ২০ দিন। দিনের বেলায় ক্লাস বা পরীক্ষার ফাঁকে যে যখন ফুসরত পেয়েছেন ছুটে গেছেন ল্যাবে। হাত লাগিয়েছেন গাড়ি তৈরির কাজে। দলের আরেক সদস্য মাহিন বলেন, ‘দিনে ল্যাবে কাজ করলেও রাতভর আমরা কাজ করতাম হলে। কাজে বুঁদ হয়ে কত রাত যে ভোর হয়েছে, টেরই পাইনি। কোথাও আটকে গেলে স্যাররাও সহায়তা করেছেন।’
অবশেষে পরিশ্রম আর কষ্টের সম্মান তাঁরা জেতেন ১৮ ডিসেম্বর। সাড়ে তিন কিলোমিটার পথের প্রতিযোগিতায় রুয়েট ইঞ্জিনিয়াস ও টিম ওয়ান দলের বানানো দুটো গাড়িই চ্যাম্পিয়ন হয়।
জিসানের জয়
চার বছরে বরিশাল আর ঢাকার ধোলাইখালের লোহালক্করের দোকানিদের কাছের মানুষ হয়ে গেছেন জিসান হাওলাদার। ২০১১ সাল থেকে তাঁর প্রিয় জায়গা তো এই দুটোই! বরিশাল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় জাইকা থেকে জিসানদের ২০ জনের একটি দল গড়ে দিয়েছিল। লক্ষ্য গাড়ি তৈরি। সে সময় তাঁদের বানানো গাড়ি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্থান পায়। জিসান বলছিলেন, ‘নকশা বা নির্মাণশৈলীর কারণে আমরা সেরা হতে পারিনি। প্রথম ইকো রান প্রতিযোগিতাতেও আমরা সম্মানজনক সনদ পেয়েছিলাম।’
এই গাড়ি তৈির করেছে রুয়েটের টিম ওয়ান২০ জনের দলে জিসান হাওলাদার ছাড়া আর সবাই হারিয়ে গেছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি জিসান। নিজের চেষ্টায় তাঁর গাড়ির মানোন্নয়ন শুরু করেন। ১ বছর ৪ মাসের চেষ্টায় তিনি গড়ে তোলেন সর্বোচ্চ জ্বালানি-সাশ্রয়ী গাড়ি। জিসান বলছিলেন, ‘আমি অটোমোবাইলে পড়েছি, তাই গাড়ির কাঠামো সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা ছিল। তারপর মনোযোগ দিলাম কীভাবে জ্বালানি-সাশ্রয়ী করা যায়। এখন আমর বানানো গাড়ি ১ লিটারে ১২০ কিলোমিটার পথ চলে।’ তাঁর এই গাড়ি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সর্বোচ্চ জ্বালানি-সাশ্রয়ী গাড়ি বিভাগে। এছাড়া সামগ্রিকভাবে সেরা হয়েছে জিসানের বিটিএসসি–৩ নামে এরকটি গাড়ি।
বরিশাল টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ওয়েল্ডিং বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি কোর্সের শিক্ষার্থী জিসান হাওলাদার স্বপ্ন দেখেন প্রকৌশলী হিসেবে গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠানে কাজ করার।

ছড়িয়ে দিন