গুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত: ১১:৫২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২১

গুচ্ছ কবিতা

এইচ বি রিতা

১-
মনে আছে সব
ছাব্বিশ বছরেও বন্ধ হয়নি,

হৃদয়ের রক্তক্ষরণ

মনে আছে সব

সব মনে আছে

যা হয়েছিল, হবার কথা ছিল না যা

ধূসর কুয়াশায় কবর হয়েছিল কার

কার হবার কথা ছিল

মনে আছে সব

সব মনে আছে

বিশাল উঠোনটায় রক্তের জলপ্রপাতে

দুঃখ গড়াগড়ি খেয়েছিল কবে

কে কেঁদেছিল, কে সঙ্গমে বিভোর ছিল

ভুলিনি ঈশ্বরের ছাব্বিশ বছরের নীরবতা

মনে আছে সব

সব মনে আছে।

ঊনত্রিশটি বুলেট ধারণ করেছিল শরীর

ধারালো চাপাতি, তারও অধিকার ছিল

রক্তের মুল্যে খুব হেসেছিল কেউ।

মনে আছে সব

সব মনে আছে।

২-
প্রশ্ন (অণুকাব্য)

*কে মরে, শূন্য হয় কার বুক

যোনী ফাটিয়ে বুক দর্পে

কে খেয়ে যায় মধ্য দুপুর?

*অনাকাঙ্খিত বিদায় বুক ফুটো করে

রক্তনদী ভাসিয়ে নেয় সব

যা ছিল, বাক্সবন্ধি তাদের ঘরে।

*বুক পকেটে শংসাপত্র ক্ষুধায় কাতর

ঊষার প্রান্তরে চাবুক রোদে

কে আঁকে খাতায় ইট-পাথর।

*মানুষের গন্ধ উবে গেছে ‌অনেকদিন

রাজপথে কুকুরের দল উল্লাসে

শোধ করে অধিকার-স্বাধীনতার ঋণ।

*শকুনগুলো অনাধিকারে রাস্তা মাপে

বেশ্যার চোখে শ্রেণিকরণে ভুলে যায়,

নিঃশ্বাস নিতে ‌আজ অক্সিজেন লাগে।

 

৩-
প্রয়োজন

তখন প্রয়োজন ছিলনা নীল আকাশ

শাপলার ঝিল, শিউলি তলায় ভোর

মালতীলতা খোঁপায় বিরহী নারীর,

শুভ্রাকাশে আঁচল উড়িয়ে

সরু কোমরে কারো কামুকতা!

প্রয়োজন ছিলনা নীল খামের প্রেম,

মধ্যরাতের গোঙানি।

অহেতুক রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি ছিল

কেবলই নিরর্থক; বিক্ষিপ্ত ভোগ বিলাস।

তখন প্রয়োজন ছিলনা,

খোলা আকাশের বুকে বিষণ্ণতার আলোড়ন

নির্বাক শোকে ব্যস্ত শহুরে বাতাস,

শূন্যতা ভরাট বুকে; অসংখ্যবার কারো উপস্থিতি।

আজ, এখন

তোমাকে জানার পর,

শব্দের অন্ধকারে একাকীত্বের উৎস জানা গেল

সাহস রেখে বুকে চলতি পথে মনে হলো,

অরণ্যের আড়ালে কেমন বুনো গন্ধ ছিল।

আজ, এখন

বুকের আড়ালের উষ্ণতা বিদ্রোহ ঘোষণা করে

তোমার অদৃশ্য উপস্থিতি, নিঃশ্বাস চেপে ধরে

মুখের কাছে, বুকের কাছে দু’টি আহত চোখ

ভীষণ প্রয়োজন; আজ প্রয়োজন।

৪-

ইশতেহার

এ যাত্রায় বেঁচে গেলে, পৃথিবী দেখবো তোমার চোখে।

কঙ্কালসার মানুষের হাড্ডি খু্ঁড়ে দেখে নিব জন্মের বৃত্তান্ত

মন্দটুকু ছুঁড়ে ফেলেকৃতদাস কুকুরের মত বলে দিব সবটুকু

তুমি-তোমরা যা দিয়েছিলে আমায়;

কোন এক অস্তমিত গোধূলি লগ্নে।

এ যাত্রায় বেঁচে গেলে, অনাদিকালের দহন উপেক্ষা করে

রক্ত, ঘাম, অশ্রু নয়,

মালিভা’র জ্যামিতিক নকশায়

সরল চিত্র এঁকে দিব আকাশের বুকে।

বোতামের আড়ালে রহস্যের সবটুকু

বাতাস শুষে নিবে, স্বাধীনতায়।

এ যাত্রায় বেঁচে গেলে,

প্ল্যাটো দর্শন মাড়িয়ে লিখে যাবো সস্তা কাব্য

যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে অস্তিত্ব রক্ষায় ম্যাটাফিজিকস্ নয়,

ভোরের কুয়াশায় শিশির ঝরা পাতায় দেখে যাবো;

জলকণাদের খুনসুটি।

এ যাত্রায় বেঁচে গেলে, প্রেম হবে!

তুমি, আমি, আমাদের হৃদয়ে চুম্বনে হবে

জটিলতা হতে আত্মার ক্ষত সারিয়ে

স্নিগ্ধ কোমল প্রান্তরের ঘাসে; ভালবাসা বিনিময় হবে।

এ যাত্রায় বেঁচে গেলে, শুধু ভালবাসা-বাসি হবে।

 

৫-
ভঙ্গুর

 

স্বৈরী তাণ্ডব ভেঙ্গে দেয় ঘর,

ভাঙ্গে অধিকার

স্বাধীনতা হরণে কারো বুকের পাড়

শুক্লাদশমী তিথিতেও আবার

দশহরা গঙ্গাস্নানে সমাজ চিবুই পান

চেপে রাখা দশজন্মের মল-মূত্র

ভেসে যায়; নির্ধিদ্বায়

পবিত্রতায় সমাজ তখনো

আগামী শুক্লাদশমীর অপেক্ষায়।

 

 

৬-
কেন নই আমি

গালমন্দ- অভিশাপে
বাড়ছে বুকের ধুকপুক, অ্যাড্রেনালিন উচ্চে
থামছি না, মানছি না
তুমি-তারা
বিদ্যার জোরে দেখছো বিশ্ব বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসে
কেন নই আমি?
কেন তারা-তুমি?
এভাবেই চলছে গোঁজামিল দাপাদাপি
বিদ্যাগ্রহণের বোধটুকু খেয়ে।
খণ্ডানোর জোর নেই যার
নিয়ম অস্বীকার করে কেবল তারাই
বোকার দল বোঝে না
দূর্গম পথে ছুটবার বিদ্যা যার হাতে
সে-ই নেয় প্রাপ্তির প্রথমভাগ।

লেখক পরিচিতিঃএইচ বি রিতা। কবি, কলামিস্ট(উইকলি বাঙালী, নিউইয়র্ক), সাংবাদিক(প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা) ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশ। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক।

তার কিছু  প্রকাশিত বই: ‘মৌনতা’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘কবিতা তুমি ভবিতব্য কষ্টের প্রতিচ্ছবি’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘রক্তাক্ত নীল’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘দুঃখ জলের লহরী’ (কাব্যগ্রন্থ), ‘বিনু’ (উপন্যাস), বার্ডস অফ প্যারাডাইস(কাব্যগ্রন্থ্-সম্মিলিত), জোনাকির ডাকবাক্স(প্রবন্ধ)।”

ছড়িয়ে দিন